,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

আমেরিকান নাগরিক পরিচয় দানকারী সানজিদা ভয়ংকর প্রতারক!

বিশেষ সংবাদদাতা, ৩ এপ্রিল, বিডিনিউজ রিভিউজ.কম:: চট্টগ্রামে  আমেরিকান নাগরিক পরিচয়ে পিতার বিরুদ্ধে পাসর্পোট, ভিসা, গ্রীণকার্ড, আইডি কার্ড ও সিকিউরিটি কার্ড আটকে রাখার অভিযোগকারী সেই সানজিদা চৌধুরী ‘প্রতারক চক্রের সদস্য’? এ চক্রের প্রশিক্ষিত সদস্যরা সারাদেশে ছড়িয়ে রয়েছে বলে অভিযোগে প্রকাশ।

সেই সানজিদা চৌধুরী খোদ পিতা এম এ মোতালিবের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম আদালতে মামলা দায়ের করার পর অনুসন্ধানে এ ধরনের তথ্যই বেরিয়ে এসেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিনব কায়দায় তার প্রতারণার  খবর প্রকাশ হয়ে পড়ছে।

চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে জমা দেয়া তার পিতার জবাবে সানজিদার ব্যাপারে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে এসেছে। পঙ্গু এ মেয়েটির টার্গেটে থাকে নিরাপত্তা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন অফিসার, সংবাদকর্মী, আইনজীবী ও ব্যবসায়ী। ছোট বেলায় পিতার সাথে ২ মাসের জন্য জীবনে মাত্র একবার আমেরিকায় যাওয়া এ নারী সেখানকার পুলিশের কাছে তার পিতা ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছিলেন। চট্টগ্রামে এসে তার পিতার বিরুদ্ধে এবং বরিশালের বাউফলে মোহাম্মদ নজরুল নামে একজনের বিরুদ্ধে স্বামী পরিচয় দিয়ে মামলা করেছে । তার পিতার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকাসহ দেশের আরো কয়েকটি স্থানে ঠিক এ ধরনের কাণ্ড করে শেষতক উঠে কোন আত্মীয় স্বজনের বাসায় কিংবা সেল্টার হোমে।

সানজিদারমামলার প্রেক্ষিতে তার পিতা এম এ মোতালেব কর্তৃক মহানগর হাকিম মোহাম্মদ আল ইমরান খান এর আদালতে জবাব দাখিল করা হয়েছে গত ২৭ মার্চ। এরপর ওই আদালতের তরফে ঘটনার চুলচেরা তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য পুলিশের প্রতি আদেশ দিয়েছেন বিচারক।

এম এ মোতালেবের দাখিল করা জবাবে বলেছেন, সানজিদা মানসিক রোগী। ৭/৮ বছর বয়স থেকে আমরা বুঝতে পেরেছি। এর জন্য লাগাতার চিকিৎসা চলে। কিন্তু এর মধ্যে সে কিছুদিন পরপর হঠাৎ গায়েব হয়ে যেত। ঢাকা চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় গ্রহণ করত। এরপর আমি গিয়ে জিম্মা নিয়ে আসতাম। জবাবে এম এ মোতালেব বলেন, ইতোমধ্যে দেশে বিদেশে সে অনেক ঘটনার জন্ম দিয়েছে। ২০১০ সালের ঘটনা। তাকে বাসায় রেখে বাইরে যাই। পরে আমার কাছে ফোন আসে বাসায় আগুন লেগেছে। এসে দেখা যায়- সানজিদা ওই বাসার একটি কামরায় আগুন দিয়েছে। এতে জানালার পর্দা ও বিছানায় আগুন ধরে যায়। ওই অবস্থা থেকে তাকে নিয়ে রাখলাম সীতাকুন্ডের কুমিরাস্থ একবন্ধুর (হাফেজ মোহাম্মদ ইউনুস) বাসায়। কুমিরা মহিলা আবাসিক স্কুলে তাকে ভর্তি করিয়ে দেয়া হল। সেখান থেকে ৮ম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষার আগেই পালিয়ে যায়। কিছুদিন পর বায়েজীদ থানার ওসি ফোন করে থানায় আসতে বলেন। থানায় গিয়ে জানতে পারলাম সানজিদা এক সেনাবাহিনীর অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন। তদন্তে দেখা যায়- যে অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে ওই নামে ক্যান্টনমেন্টে কোন অফিসারই নেই। এরপর তাকে আবারো কুমিরার সেই স্কুলের হোস্টেলে পাঠানো হল। পথের মধ্যেই সে টেক্সী চালককে ম্যানেজ করে পালিয়ে যায়। এক সপ্তাহ পর তার অস্তিত্ব আবিস্কার করা হয় মিরপুর কিশোরী উন্নয়ন সংস্থায়। সেখান থেকে ঢাকার ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত হয়ে আমি আবার তাকে জিম্মায় নিলাম। এরপর তার মামাতো ভাই মোবারকের উত্তরার বাসায় রাখার ব্যবস্থা করা হল।

আদালতে উপস্থাপন করা তথ্য প্রমাণে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বরের ঘটনা উল্লেখ করে একই বছরের ৪ অক্টোবর কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা ঠুকে দেন সানজিদা। মামলায় বাদীনী হিসেবে তার নাম দিয়েছিলেন নুসাইবা সাহার চৌধুরী। আর পিতার নাম মৃত লে. কর্নেল আবদুল্লাহ আল ওয়াহিদ। বাস্তবে তার পিতার নাম এম এ মোতালেব। মামলাটি থেকে কোন রকমে বের করে আনার পর নগরীর একটি মহিলা সেন্টারে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

এরই মধ্যে ২০১৭ সালের ১৩ মার্চ সানজিদা আমার বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার একটি মামলা দায়ের করে মহানগর হাকিম আদালতে। আদালতের বিচারক আমার কাছ থেকে এ নিয়ে জবাব তলব করেন।

এম এ মোতালেব বলেন, সানজিদা আমার মেয়ে। সেই আমেরিকান নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিলেও আসলে মাত্র ২ মাসের জন্য সে আমেরিকা গিয়েছিল। এরপর আর কোনদিন যায়নি। তাও টুরিস্ট ভিসায়। ১৯৯৩ সালের ২৬ এপ্রিল তার মা মারা যান নগরীর হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতালে। অথচ আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় সেই উল্লেখ করেছে ২০০৫ সালে তার মা আমেরিকায় মারা গেছে। সেই থেকে তিনি আর বিয়ে করেননি। অথচ মেয়ের মামলার আর্জিতে বলা হয়েছিল আমি (মোতালেব) বরিশালের এক মেয়েকে বিয়ে করেছি।

আদালতে পিতার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার এজাহারে তার বয়স উল্লেখ করা হয়েছে ২০ বছর। কিন্তু তার জম্ম ১৯৭৭ সালের ১৩ এপ্রিল। সেই হিসেবে তার বয়স ৪০ বছর।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২ বছর আগে কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা উল্লেখিত মামলায় বাদীনী হিসেবে বয়স লেখা রয়েছে ২৪ বছর। অর্থাৎ ২ বছর পর তার বয়স কমে গেল ৪ বছর!

মামলার আর্জিতে সানজিদা বলেছিল, তার পিতা আবদুল মোতালিব বর্তমানে রহমান নগর এলাকাস্থ সানজিদা ভিলায় বসবাস করেন। সানজিদার মা আমেরিকান। সানজিদা মাত্র সাতমাস বয়সে সেলিব্রাল পলসি রোগে আক্রান্ত হয়ে পঙ্গু হয়ে যান। কারো সাহায্য ছাড়া তিনি চলতে পারেন না। তার দুই ভাইয়ের একজন আমেরিকায় পুলিশ বিভাগে চাকুরি করেন। আরেকজন ইঞ্জিনিয়ার। অনুসন্ধানে উল্লেখিত বিষয়ের একটিতেও সত্যতা পাওয়া যায়নি।

সানজিদা তার মায়ের সূত্রে প্রাপ্ত ৪টি বিল্ডিংয়ের (ঢাকায় ৩টি ও চট্টগ্রামে ১টি) মালিক। মেয়েটি বাংলাদেশে আসার পর থেকে উল্লেখিত সম্পত্তি লিখে দেয়ার জন্য তার পিতা চাপ প্রয়োগের পাশাপাশি তাকে নির্যাতনও করার কথা উল্লেখ ছিল আদালতে দায়ের করা মামলার এজাহারে।

তথ্য অনুসন্ধানে এ ধরনের বিল্ডিংয়ের অস্তিত্ব ঢাকা ও চট্টগ্রামের কোথাও নেই।

সানজিদার পিতা মোতালিব বলেন, এ ধরনের অভ্যাস তার ছোট বেলা থেকেই। সেই এ ধরনের কান্ড ঘটাতে কিভাবে অভ্যস্ত হল বুঝতে পারছি না।

তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ওই নারী পটুয়াখালীর বাউফলে অবস্থান করছেন বলে সেখানকার মিডিয়া কর্মী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশ নিশ্চিত করেছেন। চট্টগ্রামের মতো একই কায়দায় তার পঙ্গুত্ব, সৌন্দর্য ও ইংরেজীতে অনর্গল কথা বলার মোহনীয় শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এক জনপ্রতিনিধির বাসায় আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে নিজেকে চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের আত্মীয় পরিচয় দিয়েছেন। একইসাথে তার পিতা আমেরিকায় পুলিশে চাকরি করেন বলে জানিয়ে স্বামী নজরুলের খোঁজে বাউফল এসেছে বলে জানিয়েছে।

অথচ এ নজরুলও চট্টগ্রামে তার সাথে থেকে বিভিন্ন সাংবাদিক, আইনজীবী ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সাহায্য হিসেবে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে সটকে পড়েছে বলে প্রকাশ।

সর্বশেষ স্বামী স্ত্রী পরিচয়দানকারী সানজিদা ও সিএনজি টেক্সী ড্রাইভার নজরুল গত ২৭ মার্চ চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে সত্য বেরিয়ে যাওয়ার ভয়ে আদালত থেকে পালিয়ে যায়। এরপরের দিন ২৮ মার্চ চলে যায় পটুয়াখালি থেকে আরো ৫৫ কিলোমিটার দুরে বাউফলে।২০ লাখ টাকা নিয়ে তার স্বামী নজরুল নিরুদ্দেশ বলে জানিয়ে সেখানেও সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা নিয়েছে।

ঘটনার বিবরন অনুযায়ী, সানজিদা গত মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আসে। সাথে ছিল টেক্সী ড্রাইভার নজরুল (স্বামী পরিচয়দানকারী)। অনেকটা ধরাধরি করে তাকে দুইতলায় তুলতে দেখা যায় নজরুলকে। এখানে এসে সানজিদা তার পিতার বিরুদ্ধে তার পাসপোর্টসহ ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ এনে সংবাদকর্মীদের সহযোগিতা চান। এক্ষেত্রে উল্লেখিত পাসপোর্ট ও অন্যান্য জিনিসপত্র উদ্ধার করতে সে আইনের সহায়তা চাইলে সরল বিশ্বাসে এডভোকেট তুতুল বাহার বিনা খরচে তাকে আইনগত সহায়তা প্রদান করেন। এরপর সানজিদার প্রতি পদক্ষেপে নজর রাখেন। আসল সত্য বুঝে উঠার দিনই ২৭ মার্চ সটকে পড়ে সানজিদা ও নজরুল। পালিয়ে যায় পটুয়াখালীর বাউফলে। এখানে গিয়ে আরেক কাহিনীর অবতারনা করেছে বলে সেখানকার থানা পুলিশ নিশ্চিত করেছে।

নজরুলও ওই চক্রের সদস্য। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তা না হলে একদিনের মাথায় চট্টগ্রাম থেকে বাউফল কিভাবে যাওয়া সম্ভব?
তার বাবা বলেন, সানজিদা নিজে নিজেও অনেকটা চলতে পারে। কিন্তু দেখায় সে চলতে ফিরতে অক্ষম। এটা দেখিয়ে মানুষের সহানুভুতি আদায় করে নেয়। পরে টাকা খুঁজে বসে। একই কায়দায় আমেরিকায়ও (দুই মাস অবস্থানকালীন) আমার ও আমার ছেলের বিরুদ্ধে এফবিআই এর কাছে হ্যারাসমেন্টের অভিযোগ দিয়েছিল। পরে তাকে দ্রুত দেশে নিয়ে আসি।

 – আজাদী’র প্রতিবেদন।

মতামত...