,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

ইজিবাইকে অচল হয়ে পড়ছে বহু নারীর জীবন

aনিজস্ব প্রতিবেদক, বিডি নিউজ রিভিউজ ডটকমঃ ঢাকা, সাভারের পক্ষাঘাতগ্রস্ত পুনর্বাসন কেন্দ্রের মহিলা ওয়ার্ডের একটি কক্ষে কাছাকাছি তিনটি বিছানায় শুয়ে রয়েছে তিনটি অল্পবয়স্কা মেয়ে। এদেরেই একজন ১২ বছরের রুমি।

রুমি বলছিল, মা আর ভাইবোনের সঙ্গে নানাবাড়িতে যাচ্ছিলাম। অটোরিকশায় উঠে ড্রাইভারের পেছনের সিটে বসি। কিন্তু তার পেছনেই একটু জায়গা ফাঁকা ছিল। সেখান থেকে আমার ওড়না ভেতরে চলে যায়, কিন্তু আমি টের পাই নাই। গাড়ি চলতে শুরু করার পরই মটরের সাথে পেঁচিয়ে আমার গলায় থাকা ওড়নায় আমি পড়ে যাই। এরপরই আমি অচেতন হয়ে যাই। এখন আমি আমার গলার নিচে আর নাড়াতে পারি না।

এরা সবাই ভিন্ন ভিন্ন জেলা থেকে এলেও, অনেকটা একইভাবে ইজি বাইক নামে পরিচিত ব্যাটারিচালিত গাড়িগুলোর আহত হয়ে এখানে এসেছেন। এদের একজন ১০ বছরের আয়শা, আরেকজন বছর কুড়ির সুমনা।

তাদের তিনজনেরই গলার নীচ থেকে অবশ হয়ে গেছে। এই ওয়ার্ডে আরো একজন ছিলেন, কিন্তু মেরুদণ্ডের অপারেশনের জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

এখন তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন এখানকার কর্মীরা।

easy baikএ ধরণের আহত রোগীদের সাধারণত তিন থেকে ছয়মাস চিকিৎসা নিতে হয়। তারপরেও তাদের অনেককে সারাজীবন এই দুর্ঘটনার ক্ষত বয়ে বেড়াতে হবে।

ফিজিওথেরাপিস্ট শামিমা আকতার বলছেন, সিআরপিতে আসার সময় যাদের শরীরে কিছুটা সাড়া থাকে, শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে, তারা হয়তো শেষপর্যন্ত নিচ শেষপর্যন্ত নিজেরাই চলাফেরা করতে পারেন। কিন্তু যাদের অচেতন অবস্থায় আনা হয়, এরকম রোগীদের শেষপর্যন্ত বেশিরভাগ সময়েই হুইলচেয়ারে বাড়ি ফিরতে হয়।

দেশের পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান, সিআরপি একটি গবেষণায় দেখতে পেয়েছে যে, গত দেড় বছরে ইজি বাইকের মটরে ওড়না পেঁচিয়ে গুরুতরভাবে আহত হয়ে তাদের কাছে অনেক রোগী আসছে যাদের সবাই মেয়ে।

কোনরকম নিবন্ধন ছাড়াই এসব যান গ্রামীণ এলাকায় চলাচল করে যার নিরাপত্তা বিষয়টি রয়ে গেছে উপেক্ষিত। চিকিৎসকরা বলছেন, এরকম আহত অনেক রোগী আর কখনোই পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেনা।

সিআরপির ফিজিওথেরাপিস্ট এবং গবেষক কাজী ইমদাদুল হক বলছেন, দেড় বছর আগে থেকে মহিলা ওয়ার্ডে অনেকটা একই ধরণের রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ফলে প্রথম এই সমস্যাটি তাদের নজরে আসে। এরপর তারা গবেষণা করে দেখতে পান, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এ রকম রোগীরা আসছে, যারা প্রায় সবাই অল্পবয়স্কা মেয়ে।

 তিনি বলছেন, ইজি বাইকের চালকের আসনের ঠিক পেছনেই যাত্রীদের বসার দুইটি আসন থাকে। কিন্তু এই দুই আসনের মাঝে ছোট একটি ফাকা, যার ঠিক নীচেই মটরটি থাকে। এই আসনগুলোয় কোন মেয়ে বসলে তার ওড়না, চাদর ফাকা দিয়ে নীচে নেমে মটরে পেঁচিয়ে যায়। এক মুহূর্ত আগেও হয়তো সে গল্প করছিল, পরের মুহূর্তেই সে আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেল। এর ভয়াবহতা অনেক বেশি।

তিনি জানালেন, এ পর্যন্ত সিআরপিতে এরকম ত্রিশ জন রোগী এসেছে। কিন্তু বাস্তবে এই সংখ্যা আরো বেশি হবে বলেই তাদের ধারণা। কারণ প্রত্যন্ত এলাকাগুলোয় কেউ মারা গেলে সেটার হয়তো খবরও হয়না। ছোটখাটো আহতরাও ঢাকা বা সিআরপিতে আসেনা।

বাংলাদেশে গত কয়েকবছর ধরে ইজি বাইক নামের ব্যাটারিচালিত তিনচাকার যানগুলোর চলাচল শুরু হয়েছে। চীন থেকে আমদানি করা এসব যান মূলত বড় শহরগুলোর বাইরে চলাচল করলেও, সরকারি কোন দপ্তরই এসব যানের নিবন্ধন বা চলাচলের তদারকি করে না। ফলে এ ধরণের যানের নিরাপত্তার বিষয়টি রয়ে গেছে উপেক্ষিত।

চালক ও যাত্রীদের অনেকেই জানালেন, এই ফাঁকায় ওড়না, শাড়ি বা চাদর পেঁচিয়ে আহত হবার মতো ঘটনার কথা তারা জানেন।

বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের পরিচালক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন বলছেন, হয়তো এটিকে এখনি নীরব ঘাতক বলা না গেলেও, এটি এখন একটি বিশাল সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবহন খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির নামে অনেকটা ছেড়ে দেয়া হয়েছে যাতে যেকেউ ইচ্ছে করলেই ইজি বাইকের মতো বাহনগুলোকে রাস্তায় নিয়ে আসছে। কিন্তু এসব যান যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা মেনে তৈরি করা হয়নি। যার ফলে যাত্রীরা সেখানে নিরাপদ না। বিভিন্নভাবে তারা সেখানে আহত হচ্ছে।

গবেষকরা বলছেন, এ ধরণের দুর্ঘটনা এড়াতে সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সহায়ক হতে পারে। তবে বেআইনি এসব যানের বিষয়ে এখনি পদক্ষেপ না নিলে এরকম আহতের সংখ্যা আরো বাড়বে বলেই তাদের আশংকা।

সূত্র: বিবিসি

 

মতামত...