,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

এইডসবিরোধী কার্যক্রম সারা বছরই চালিয়ে যেতে হবে

বাংলাদেশে এইচআইভি/এইডসের প্রকোপ কম হলেও সংক্রমণ থেমে নেই। এইডস ঠেকাতে আন্তর্জাতিক অর্থ-সহায়তা কমে যাওয়ায় দেশ এখনো ঝুঁকির মধ্যে আছে। তাই সরকার এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোকে দাতাগোষ্ঠীর ওপর নির্ভর না করে ধারাবাহিকভাবে এইডসবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।

আজ রোববার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সহায়তায় প্রথম আলো আয়োজিত ‘এইচআইভি এইডস সচেতনতা: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকেরা এসব কথা বলেন।
কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ​এই গোলটেবিল বৈঠকে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম।
বৈঠকে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক aids বলেন, এইচআইভি এইডস প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যম এগিয়ে এলে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত খরচ অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘এইচআইভি/এইডস, ক্যানসারসহ এ ধরনের রোগ প্রতিরোধে সরকারের বরাদ্দ কম। আমিও তদবির করব, যাতে আগামী বাজেটে বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়।’ বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন এইডস বিষয়ে জনসচেতনতার জন্য বিজ্ঞাপনসহ যা কিছু তৈরি করেছে, তার কপি মন্ত্রণালয়ে দিলে সরকারি গণমাধ্যমে প্রচারের পাশাপাশি বেসরকারি টেলিভিশনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিনা মূল্যে প্রচারের অনুরোধ করবেন বলেও জানান তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ ধরনের প্রচার শুধু এক দিন করে থেমে থাকলে চলবে না। সারা বছরই তা চালিয়ে যেতে হবে।
গোলটেবিল বৈঠকে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, আশপাশের দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা ভালো—এই কথা মনে করে ঘুমিয়ে থাকলে চলবে না। দেশের পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়নি বলে যে ভয়াবহ হবে না, তা নয়। তাই এইডস প্রতিরোধে সজাগ থাকতে হবে। তিনি অভিবাসী নারীশ্রমিক এবং যৌনকর্মীদের এইডস বিষয়ে সচেতন করার প্রতি গুরুত্ব দেন।
জাতীয় এইডস/এসটিডি কর্মসূচির উপব্যবস্থাপক আনিসুর রহমান বলেন, অভিবাসী শ্রমিক এ রোগের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত হলেও তাদের সচেতন করতে এখন পর্যন্ত সে ধরনের কার্যক্রম হাতে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
গোলটেবিল বৈঠকের শুরুতে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান দেশে এইচআইভি/এইডসের বর্তমান পরিস্থিতি এবং এইডস প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরিতে প্রথম আলোর ভূমিকা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে প্রথম আলোর এ ধরনের কার্যক্রম আরও বৃদ্ধি করা হবে। এ ধরনের কার্যক্রমে সরকারের প্রচার উদ্যোগ এবং সহায়তা বেশি প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন প্রথম আলোর সম্পাদক।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য নজরুল ইসলাম বলেন, কেউ ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ করে থাকলে বা অনিরাপদ পদ্ধতিতে রক্ত দিলে বা নিজের শরীরে রক্ত নিলে, তাকে এইচআইভি পরীক্ষা করাতে হবে।
নজরুল ইসলাম বলেন, এক হিসাবে দেখা যায়, ৯১ শতাংশ নারী তাঁর স্বামীর মাধ্যমে এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাই পুরুষ বা স্বামীদের সচেতনতার জন্য বিশেষ কার্যক্রম নিতে হবে। রোগী, রোগীর পরিবার ও ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা তৈরির ভাষা যাতে যথার্থ হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে। এখন পর্যন্ত দেশে এইচআইভি/এইডস রোগীবান্ধব হাসপাতাল গড়ে না ওঠাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স বিটপী দাশ চৌধুরী প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধে যেসব কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে, তা তুলে ধরেন। তিনি রোগীর সঙ্গে যে ধরনের বৈষম্য করা হয়, তা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেন।
এইচআইভি আক্রান্তদের নিয়ে কাজ করা আশার আলো সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক হাবিবা আক্তার বলেন, একজন আক্রান্ত ব্যক্তিই প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু ওই ব্যক্তিকে চিকিৎসার আওতায় আনতে না পারলে এ কাজ করা সম্ভব হবে না। এইচআইভি আক্রান্ত একজন পুরুষের মাধ্যমে তাঁর স্ত্রী আক্রান্ত হন। তাই মনে রাখতে হবে, সমস্যাটি শুধু আক্রান্ত ব্যক্তির একার নয়, তা পরিবারের এবং রাষ্ট্রের​ও।
ইউএন এইডস বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজিক ইনফরমেশন অ্যাডভাইজার সায়মা খান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, দেশে এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা আট হাজার ৯০০ জনেরও বেশি। এদের মধ্যে সাড়ে তিন হাজার ব্যক্তির কথা জানা সম্ভব হয়েছে। অথচ এদের মধ্যে মাত্র এক হাজার ৩০০ জন প্রয়োজনীয় থেরাপি পাচ্ছে।
সায়মা খান দেশের যেসব জেলায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী বেশি সে ধরনের ২৩টি জেলায় বরাদ্দ বাড়ানোসহ বিশেষ নজর দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অনেকেই ভাবছে দেশের ঝুঁকি কমে আসছে। তবে মনে রাখতে হবে ঝুঁকি কমা মাত্র শুরু হয়েছে। একে টেকসই করতে হলে থেমে গেলে চলবে না।
আসক্তি পুনর্বাসন নিবাস আপনগাঁও এর নির্বাহী পরিচালক ব্রাদার রোনাল্ড ড্রাহোজাল বলেন, সবার সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তিনি সচেতনতামূলক কার্যক্রমে মাদকাসক্ত যুব সমাজ এবং পথশিশুদের দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) সেন্টার ফর এইচআইভি/এইডসের বিজ্ঞানী এবং দ্য গ্লোবাল ফান্ড আরসিসি প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালক শরফুল ইসলাম খান বলেন, যৌনমিলনের সময় কনডম ব্যবহার না করলে এইচআইভি/এইডসের ঝুঁকি বেড়ে যায়, তা প্রায় সবার জানা। কিন্তু সে হারে কনডমের ব্যবহার বাড়েনি। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নেও ততটা নজর দেওয়া সম্ভব হয়নি।
কেয়ার বাংলাদেশের পরিচালক (স্বাস্থ্য) জাহাঙ্গীর হোসেইন বলেন, দাতা সংস্থার সহায়তা কমে যাচ্ছে বলে হতাশ হলে চলবে না। আমরা আমাদের সমস্যা সম্পর্কে জানি। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী কারা তা চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে।
সেভ দ্য চিলড্রেনের এইচআইভি/এইডস প্রোগ্রামের চিফ অব পার্টি লিমা রহমান রোগটি প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরিতে প্রথম আলোর বন্ধুসভার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রথম আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান।
জাতীয় এইডস/এসটিডি কর্মসূচির পরামর্শক আখতারুজ্জামান বলেন, এইচআইভি/ এইডস খাতে যে বরাদ্দ আছে তাও অনেক সময় খরচ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ দিকটিতেও নজর দিতে হবে।
বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির পরিচালক (প্রোগ্রাম) ফসিউল আহসান বলেন, এইচআইভি আক্রান্তদের চিহ্নিত করার তাদের চিকিৎসার আওতায় আনা কঠিন হয়ে যায়। সেই রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে পাঠানো হয়। কেউ নিজে দায়িত্ব নিতে চায় না। বিভিন্ন কর্মসূচিতে পারিবারিক কাউন্সেলিং এবং আক্রান্তদের পুষ্টির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।

মতামত...