,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

একটি মহল সরকার ও বিচার বিভাগে দূরত্ব তৈরি করার অপচেষ্টায় লিপ্ত:প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ১৫ এপ্রিল, বিডিনিউজ রিভিউজ.কম::প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, গত কিছুদিন আগে  সরকার বিচার বিভাগ সংক্রান্ত তিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেয়ার পূর্বে বিচার বিভাগের অভিভাবক হিসেবে প্রধান বিচারপতিকে কোনো কিছুই অবহিত করা হয়নি। সম্পূর্ণ ভুল তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে সরকার প্রধানের কাছে সত্য গোপন করে সিদ্ধান্তগুলো হাসিল করা হয়েছে। এরকম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবার আগে প্রধান বিচারপতির সাথে আলোচনা করা হলে ভুল বোঝাবুঝি হতো না।

তিনি বলেন, একটি মহল সবসময় সরকার ও বিচার বিভাগের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করার অপচেষ্টায় লিপ্ত আছে। এরকম ভুল বোঝাবুঝির কারণে দেশের সাধারণ জনগণের কাছে ভুল বার্তা যায়।

আজ শনিবার রাজধানীর কাকরাইলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের জন্য ২০ তলা আবাসিক ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ২০ তলা এই আবাসিক ভবন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনের পর মোনাজাত করে তিনি ভবনের বিভিন্ন তলা ঘুরে দেখেন। দেড় একর জায়গায় ১৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭৬টি ফ্লাটের এই ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এই ভবনে জিমনেশিয়াম এবং মিলনায়তনও রয়েছে। অনুষ্ঠানে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ছাড়াও আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিগণ উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, আইন ও বিধি বিধানের অসংগতিকে দূর করে বিচার বিভাগে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী যে কোনো সময় হতে এখন বিচার বিভাগ সবচাইতে সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করছে। বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় মুহূর্তে সবসময় এর উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা, জেল হত্যা মামলাসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত মামলা, সন্ত্রাস নিরোধ, পরিবেশ রক্ষা, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা নিরসনসহ সব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ এর ভূমিকা রেখেছে যা রাষ্ট্রের অন্য কোনো অঙ্গ, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান পালন করেনি। ফলে বিচার বিভাগের সাথে রাষ্ট্রের অন্য অঙ্গের ভুল বোঝাবুঝির কোনো সুযোগ নেই। আমি আশা করবো স্বাধীনতার স্বপক্ষে এ সরকার দেশের আইনের শাসনকে সমুন্নত করতে বিচার বিভাগকে আরও শক্তিশালী ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে সবসময় সহযোগিতা করবে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, আমি প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকে বিচার ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে সাধ্যমত কাজ করছি। বিচার বিভাগের দক্ষতা ও স্বাধীনতার উপর একটি দেশের সভ্যতার চরিত্র পরিস্ফুট হয়ে উঠে। অন্যকথায় বলা যায় যে, কোনো দেশের সরকারের কৃতিত্ব পরিমাপ করার সর্বোত্তম মাপকাঠি হচ্ছে তাঁর বিচার বিভাগের যোগ্যতা ও স্বাধীনতা। রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য নীতির প্রতিফলন হচ্ছে সংবিধানের মূল চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বিচার বিভাগ দেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। প্রত্যেক বিভাগকে দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। কখনও কখনও দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে অপরিহার্যভাবে শীতল সম্পর্কের সৃষ্টি হতে পারে। তবে এ সম্পর্ককে ইতিবাচক দৃষ্টিতে গ্রহণ করলে- প্রত্যেক বিভাগের সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সমগ্র জনগোষ্ঠীর প্রভূত কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সীমিত সম্পদ ও বাজেট সত্ত্বেও আমি দৃঢ়ভাবে দাবী করতে পারি যে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমান বিচার ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল ও জনগণের সর্বোচ্চ আস্থা অর্জন করেছে। রাষ্ট্রের ক্রান্তিলগ্নে বিচার বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত দেশে-বিদেশে নন্দিত হয়েছে। অধিকন্তু গণতন্ত্র সুসংহত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিচার বিভাগ প্রদত্ত স্বাধীন মতামত ও সিদ্ধান্ত দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।

তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট ও ইউএনডিপির সহযোগিতায় সিলেট জেলায় ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে ডিজিটাল এভিডেন্স রেকর্ডিং চালু করার ফলে এ জেলায় দেশের অন্যান্য যে কোনো জেলার থেকে মামলা নিষ্পত্তির হার প্রায় ৩ গুণ বেশি। সুপ্রিম কোর্ট যে কোনো ধরণের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষম। এ কারণে আমরা বিচার বিভাগের ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প হাতে নিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে প্রকল্পটি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আমরা আশা করবো প্রধানমন্ত্রী আপনার হস্তক্ষেপে এ বাধা দূরীভূত হবে এবং দেশের বিচারপ্রার্থী জনগণের কাছে আমরা এর সুফল পৌঁছাতে সক্ষম হবো।

প্রধান বিচারপতি বলেন, আমি ভারত সফরকালে সেদেশের প্রধান বিচারপতি এবং প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশের বিচারকদের প্রশিক্ষণের অনুরোধ করেছিলাম। ওই অনুরোধে ভারত সরকার সাড়া দিয়েছে। আপনার (প্রধানমন্ত্রী) সাম্প্রতিক ভারত সফরকালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল জুডিশিয়াল একাডেমি এর সাথে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের জন্য যে প্রশিক্ষণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে সেজন্য আপনাকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় এ দেশের নিম্ন আদালতের ১৫০০ বিচারক ভারতে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবে।

তিনি বলেন, ভারতসহ সব কমনওয়েলথ্ সদস্যভুক্ত দেশসমূহ বিচার বিভাগীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী, অর্থ মন্ত্রী, জনপ্রশাসন মন্ত্রী এবং প্রাদেশিক মুখ্য মন্ত্রী ও হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ও প্রাদেশিক আইন মন্ত্রীগণের উপস্থিতিতে বিচার বিভাগের সমস্যাসমূহ বিস্তারিত আলোচিত হয় এবং বিচার বিভাগের সমস্যা দূরীকরণে বাস্তবভিত্তিক সমাধান খুঁজে বের করার আন্তরিক প্রয়াস গ্রহণ করা হয়। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর গত দুই বছর সফলভাবে সম্মেলন হয়েছে কিন্তু আমাদের দেশে এ রেওয়াজ চালু হয়নি এবং এতে বিচার বিভাগ ও সরকার একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে নানা অন্তরায় থেকে যায়। আমরা পূর্ববর্তী বছরগুলোর মতো এবারও জাতীয় বিচার বিভাগীয় সম্মেলন আয়োজন করবো। আশা করি- আপনি প্রধানমন্ত্রী আমাদের মাঝে উপস্থিত থেকে আমাদের কথা শুনবেন, বিচার বিভাগের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধানের পথ দেখাবেন এবং দেশের সকল বিচারককে অনুপ্রাণিত করবেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মামলার জট। জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশে বিচারকের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। ভারতে ১০ লক্ষ মানুষের জন্য ১৮ জন বিচারক রয়েছে অথচ বাংলাদেশে মাত্র ১০ জন। তদুপরি এই অল্প সংখ্যক বিচারকের জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুযোগ নাই। বর্তমানে আপীল বিভাগে ৭ জন এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৮৫ জন বিচারক রয়েছেন। হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকগণের মধ্যে ৩ জন বিচারক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন। ৪ জন বিচারক গুরুতর অসুস্থ। ফলে বিভিন্ন সময় বেঞ্চ গঠনের সময় আমাকে হিমশিম খেতে হয়। চলতি বছরে ৭ জন বিচারক অবসর গ্রহণ করবেন। ফলে বেঞ্চ গঠনে জটিলতা আরো প্রকট হবে। এছাড়া ত্রুটিপূর্ণ ও সেকেলে আইনের ফলে মামলার সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিচারকগণ আন্তরিকভাবে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করায় বিগত বছরগুলোর তুলনায় মামলা নিষ্পত্তির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যান হতে দেখা যায় দেশের সকল আদালতে মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা ২০১৩ এবং ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে তিন লক্ষের অধিক বৃদ্ধি হয়েছে।

মতামত...