,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

এক যুগেও শেষ হয়নি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচার

agust 21 hasinaনিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ রিভিউজঃ  ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচার এক যুগেও শেষ হয়নি। বিচার শেষ করে রায়ের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছেন দেশবাসি । আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক শনিবার সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এ মামলার বিচার শেষ পর্যায়ে আছে। আমি আশা করি, আগামী কিছুদিনের মধ্যে রায় হবে।’

agust21aaবিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় আহত হন তত্কালীন বিরোধীদলীয় নেতা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কয়েক শ নেতা-কর্মী। নিহত হন আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন। আহতদের মধ্যে অনেকেই আজও শরীরে গ্রেনেডের স্প্লিন্টার নিয়ে দুঃসহ জীবন যাপন করছেন।

a (10)গত ১১ আগস্ট আইন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় আইনমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এই মামলার বিচার কাজ শেষ হবে। রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেছেন, ‘এখন পর্যন্ত ২২৩ জনের সাক্ষ্য সম্পন্ন হয়েছে। ২২৪তম সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জেরা চলছে। আগামী সোম ও মঙ্গলবার এ মামলার শুনানির দিন ধার্য আছে। মামলাটি নিষ্পত্তি হতে আরো কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।’ তবে তিনি নিষ্পত্তির সুনির্দিষ্ট সময় বলতে পারেননি।

এই মামলায় মোট সাক্ষী আছেন ৪৯১ জন। এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন ২২৩ জন। এখনো অর্ধেকের বেশি সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ বাকি রয়েছে। এই গতিতে চললে আরো ১২ বছরেও এ মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়। তবে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, আর দুজনের সাক্ষ্যের পর সাক্ষীপর্বের ইতি টানা হবে। আইন বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেছেন, সাক্ষীর আধিক্যের কারণে এ মামলাটি নিষ্পত্তি হতে দেরি হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, মামলার সাক্ষীর সংখ্যা তদন্ত কর্মকর্তা নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু মামলা প্রমাণের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে যে কয়জন সাক্ষী নেওয়া প্রয়োজন তত জনেরই সাক্ষ্য নেওয়া হবে। আশা করছি আর খুব বেশি সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।

আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ হওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীর সাক্ষ্য সম্পন্নের ওপর। মামলাটিতে সাক্ষীর পাশাপাশি আসামির সংখ্যাও অনেক। রাষ্ট্রপক্ষ প্রতি সপ্তাহে দুজন সাক্ষীর সাক্ষ্য দেয়াচ্ছে। আমরা সাক্ষীর সাক্ষ্য পর্যালোচনা করার সময়ও পাচ্ছি না। ফৌজদারি মামলায় এত তাড়াহুড়া চলে না।

আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী বলেন, মামলার বিচার কার্যক্রম কবে শেষ হবে সেটি নির্ভর করছে রাষ্ট্রপক্ষের ওপর। কারণ সাক্ষী তালিকায় প্রায় ৫শ সাক্ষী রয়েছে। এর মধ্যে অতিরিক্ত তালিকা দিয়ে আরো ১০ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বিচারকে বিলম্বিত করা হয়েছে।

এই ভয়াবহ হামলার ঘটনায় ওইদিন নগরীর মতিঝিল থানায় দুটি মামলা দায়ের করে পুলিশ। একটি বিস্ফোরক আইনে, অন্যটি হত্যার ঘটনায়। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে তত্কালীন সরকার। ওই কমিশন সরকারের কাছে ১৬২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশনের সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ সন্দেহাতীতভাবে ইঙ্গিত করে, এই হামলার পেছনে একটি শক্তিশালী বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত ছিল। তত্কালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ কমিশনের এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে।

হামলার ঘটনার দশ মাসের মাথায় ২০০৫ সালের ৯ জুন নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার বীরকোট গ্রামের বাড়ি থেকে জজ মিয়া নামের এক যুবককে সিআইডি আটক করে। ১৭ দিন রিমান্ডে রেখে জজ মিয়ার কাছ থেকে সিআইডি ‘সাজানো’ জবানবন্দি নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ এ ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রভাবিত করার জন্য সরকারকে দায়ী করে। এভাবে চলার পর ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে ক্ষমতা নেয় সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ওই সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনার ফের তদন্ত শুরু হয়। তদন্ত শেষে সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল কবির ২০০৮ সালের ১১ জুন হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে আদালতে দুটি অভিযোগপত্র জমা দেন। তাতে হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি) নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ও বিএনপি সরকারের সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়। পিন্টু ছাড়া বাকি সবাই হুজির সদস্য ছিল।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, আবদুস সালাম পিন্টুর সহযোগিতায় হুজির জঙ্গিরা শেখ হাসিনাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে ওই হামলা চালিয়েছিল। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর ট্রাইব্যুনালে শুরু হয় মামলার বিচার কার্যক্রম। নেওয়া হয় রাষ্ট্রপক্ষের ৬১ জনের সাক্ষ্য।

২০০৯ সালের অক্টোবরে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট। ওই সরকার আদালতের অনুমতি নিয়ে মামলাটির অধিকতর তদন্ত শুরু করে। ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করেন দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির আব্দুল কাহহার আকন্দ। এই তদন্তে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, লুত্ফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরীসহ আরও ৩০ জনকে আসামি করা হয়। ফলে দুটি অভিযোগপত্র মিলে মোট আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২ -তে। সাক্ষী করা হয় ৪৯১ জনকে। ২০১২ সালের ১৮ মার্চ হত্যা মামলায় ৫২ জনের বিরুদ্ধে এবং বিস্ফোরক মামলায় ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১। আসামিদের মধ্যে পুলিশের সাবেক ছয় কর্মকর্তা, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে সাইফুল ইসলাম ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফুর রহমান জামিনে আছেন। বাবর, পিন্টুসহ ২৫ জন আসামি কারাগারে আছেন। তারেক রহমানসহ ১৮ জনকে পলাতক দেখিয়ে তাদের অনুপস্থিতিতে চলছে বিচার কার্যক্রম। তবে এই মামলার অন্যতম আসামি আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সরকার। ফলে সর্বশেষ এই মামলার আসামি সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১-তে। এদিকে চলতি মাসে ২২৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন করেছে ট্রাইব্যুনাল।

সাক্ষ্য দিয়েছেন প্রথম চার্জশিট দাখিলকারী তদন্ত কর্মকর্তা ফজলুল কবির। সাক্ষ্য শেষে তার জেরা চলছে। প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তার সাক্ষ্য ও জেরা শেষ হলে দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকর্তার সাক্ষ্য গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর আরো দু’একজনের সাক্ষ্য নিয়ে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ পর্ব ইতিটানা হবে। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে যুক্তিতর্কের জন্য দিন ধার্য করবেন আদালত। যুক্তিতর্ক শেষ হলেই বিচারক রায়ের দিন ঘোষণা করবেন।

মতামত...