,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

এটিএমে ডিজিটাল পকেটমার চক্রে হাইপ্রোফাইল কনেকশান

মীর মুহাম্মদ নাছিরউদ্দিন সিকদার,বিডি নিউজ রিভিউজ ডটকমঃ ঢাকায় কয়েকটি ব্যাংকের এটিএমে  ডিজিটাল পকেটমার  চক্রের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে  গোয়েন্দা কর্মকর্তারা রীতিমতো বিস্মিত। ডিজিটাল পকেটমার প্রধান হোতা থমাস পিটারের  সাথে সরকারের ভিআইপি  হাইপ্রোফাইল লোকজনের কানেকশান ও তাদের সাথে বেশ কিছু সেলফি দেখে  গোয়েন্দাদের চক্ষু ছানাবড়া দেখে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াত খোদ থমাস পিটারও কপট হেসেছে।

ডিজিটাল পকেটমারি বা ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি করে থমাস পিটারের মাসে আয় ছিল ৪ কোটি টাকার বেশি আর অর্ধকোটি টাকা খরচ করে মাসে দু-একটি পার্টি দিতেন পাঁচ তারকা হোটেলে । দু’লাখ টাকা ভাড়ায়  আলিশান ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতো সে । বিভিন্ন দেশে থাকা তার আগের স্ত্রীদের কাছে হুন্ডিতে টাকা পাঠানোর দায়িত্বটাও ঠিকঠাক পালন করতো।এ দেশে দু’হাতে দেদারসে টাকা বিলাতেন । চরাই নতুন টাকার বান্ডিলের গন্ধ নেয়া তার অভ্যাস আবার পাশের জনকেও এই ঘ্রাণ শুঁকাতে পছন্দ করতো সে ।

গোয়েন্দা পুলিশের হাতে রিমান্ডে ডিজিটাল পকেটমার প্রধান হোতা থমাস পিটার এভাবে অকপটে অনেক কিছুই  স্বীকার করেছেন। প্রথমদিকে তেমন একটা মুখ না খুললেও এখন তিনি অনেকটা স্বপ্রণোদিত হয়ে নানা বিস্ময়কর তথ্য দিচ্ছেন জানা গেছে।

রিমান্ডের তৃতীয় দিনে পিটারের দেয়া কিছু টেকনিক্যাল তথ্য মিলিয়ে দেখতে কয়েকটি ব্যাংকের আইটি বিশেষজ্ঞদের পিটারের মুখোমুখি করা হয়। সেখান থেকেও বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ সব চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেখা গেছে, উত্তরার একটি রেস্টহাউসের পস মেশিন ব্যবহার করে তিনি সাড়ে ৩ কোটি টাকা উঠিয়ে নিয়েছেন।

জানা গেছে , প্রথমদিকে পিটার কিছুটা চুপচাপ ছিলেন। উত্তর দিতেন ভেবেচিন্তে। অবশ্য কাল থেকে অনেক কিছুই খোলাসা করতে শুরু করেছেন। যেমন পাসওয়ার্ড দিয়ে লক করা তার মোবাইল ফোনের ফটো ফাইল থেকে তিনি এমন কিছু সেলফি ছবি দেখান, যা চোখে দেখলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে! কিন্তু না!  সরকার এবং সমাজের বহু হাইপ্রোফাইল ব্যক্তির একাধিক সেলফি ছবিই  প্রমাণ করে দেয় সে এদেশে কত বড় মাপের চেইন মেইনটেইন করতেন। এসব হাইপ্রোফাইলের সঙ্গে বাংলাদেশী যেসব প্রভাবশালী লোকজন পিটারের মধ্যে বিশেষ যোগসূত্রতা করে দিয়েছেন তাদের কেউ কেউ এতটাই প্রভাবশালী যে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতেও বিব্রতবোধ করছেন। পিটার গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অনেকটা গর্ব করে জানায়, ‘দেখ আমি কোনো থার্ডক্লাস লোক নয়। এই দেখ তোমাদের এখানে কত পাওয়ারফুল লোকজনের সঙ্গে আমার ওঠাবসা  আছে তার প্রমান তাদের সঙ্গে তোলা আমার ছবি দেখ!

জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে সে  তার প্রধান সহযোগী হিসেবে লন্ডনে বসবাসকারী একজন বাংলাদেশী ব্যবসায়ী ফরিদ নাবির নাম-পরিচয় জানান । পিটার জানান,  তার ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতিসহ আদম ব্যবসার অনেক কাজে নাবিরই তার অন্যতম সহযোগী। লন্ডনের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সম্প্রতি নাবির বাংলাদেশ ঘুরেও গেছেন। এ সময় তার সঙ্গে আমার বিশেষ বৈঠকও হয়েছে।এভাবে তিনি ঢাকায় আছেন এমন আরও বেশ কয়েকজন বাংলাদেশীর নাম-পরিচয় জানিয়েছে। পিটার জানিয়েছেন, তার পুরনো ইউক্রেনের  সুন্দরী বান্ধবীদের উপহার দিয়ে প্রভাবশালীদের দ্রুত বশে আনতে।  বাংলাদেশ থেকে অনেককে তিনি ইউরোপে পাঠানোর জন্য প্রথমে ইউক্রেনে নিয়ে গেছেন। কিভাবে কাদের মাধ্যমে কত টাকায় তাদের নিয়ে গেছেন তার বর্ণনা দিয়ে বাংলাদেশের অনেক প্রভাবশালীর গোমর ফাঁস করেছে পিটার । গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে সে জানান, শুধু ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি করেই তার মাসে আয় হতো ৪ কোটি টাকার বেশী । উত্তরার কমফোর্ট ইন রেস্টহাউসের পস মেশিন জালিয়াতি করে তুলে নিয়েছে সাড়ে ৩ কোটি টাকা। এভাবে সে অনেক জালিয়াতির বর্ণনা দিয়েছেন। বলেছেন, ‘তোমাদের এখানকার অনেক প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা তার জানা নেই। তার স্থানীয় সহযোগীদের অনেকে তার কাছে পস মেশিন পর্যন্ত নিয়ে আসত।’ তিনি আরও জানিয়েছেন, ‘দেখ এসব জালিয়াতি করে সব টাকা আমি নিইনি। তোমাদের এখানকার লোকজনও প্রচুর টাকা নিয়েছে। নামিদামি লোকজন ছাড়াও কয়েকটি ব্যাংক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও জালিয়াতের তালিকায় রয়েছে।

 

পিটার আরও জানিয়েছেন, তিনি গুলশানে যে আলিশান ফ্ল্যাটে স্ত্রী মেরিনাকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন তার মাসিক খরচ ছিল ২ লাখ  টাকার বেশি । এ দেশে আসার সময় তার কাছে কিছুই ছিল না। আর সে সব সময় নতুন টাকার ঘ্রাণ নিতে বেশি পছন্দ করতেন। এটি তার ছোটবেলার অভ্যাস। হয়তো এই নেশায় তাকে এমন পথে নামিয়েছে। সে সব সময় নিজের কাছে কয়েকটি নতুন টাকার বান্ডিল রাখতো । নিজে যেমন ঘ্রাণ নিতো , তেমনি আশপাশে থাকা পরিচিতদের ঘ্রাণ শুঁকাতেন। গুলশান হলিডে প্ল্যানেটের কর্মচারীদেরও তিনি নতুন টাকার ঘ্রাণ নিতে বলতেন। তবে একদিন পার হয়ে গেলেই ওই বান্ডিল পরিবর্তন করতা সে । আবার  সব সময় নিজের কাছে পিটার দামি আগ্নেয়াস্ত্র রাখতে পছন্দ করে সে । কিন্তু ঢাকায় এসে তিনি সে সুযোগ পাচ্ছিলেন না। প্রভাবশালী লোকজনের মাধ্যমে তিনি প্রথমে একটি লাইসেন্স করা পিস্তল সংগ্রহ করার চেষ্টা করে। এরপর অবৈধ অস্ত্র। কিন্তু এসবে স্বস্তি না পেয়ে শেষমেশ তিনি একেবারে অর্জিনাল অস্ত্রের আদলে বিদেশ থেকে উন্নতমানের দামি সেভেন টু বোর মডেলের খেলনা পিস্তল নিয়ে আসে। কয়েক মাস ধরে যেটি সব সময় তার ব্যবহৃত দামি প্রাইভেট কারের মধ্যে রাখতেন। তার গাড়িতে কাউকে উঠানোর পর তিনি প্রথমেই ওই পিস্তল নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করতেন। কিন্তু কারও বোঝার উপায় ছিল না যে, ওটি আসলেই  খেলনা পিস্তল!  ডিবির একটি টিম গেলরাতে গুলশানের ভাড়া ফ্ল্যাটের গ্যারেজে রাখা তার গাড়ি থেকে খেলনা পিস্তল ও কারতি  জব্ধ করে ডিবি অফিসে আনা হয়।তার লাগেজ তল্লাশি করে রাশিয়ার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে একটি ভিজিটিং কার্ড পাওয়া যায়,তাতে পিটারের নাম ও পরিচয় লেখা আছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, তারা ঘটনার শেকড়ের অনুসন্ধানে বেশি নজর দিতে চান। এজন্য পিটারের কাছ থেকে পাওয়া আরও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য এখন প্রকাশ করতে চান না। এ পর্যন্ত যেসব তথ্য পেয়েছেন তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছেন। পরে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেবেন। প্রয়োজনে আরও জিজ্ঞাসাবাদের স্বার্থে পিটারকে ফের রিমান্ডে আনার জন্য আবেদন করা হবে।

প্রসঙ্গত, এটিএম জালিয়াতির  ঘটনায় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এ মাসের মাঝামাঝি সময়ে গুলশান থেকে  জালিয়াত চক্রের প্রধান পিটারকে আটক করে আদালতে হাজির করে তাকে ৬ দিনের রিমান্ডে নেয়া  হয়।দেশের মানুষ আশা করে , এচক্রের সকল জালিয়াত যেন সমুলে বিনাশ করা হয়।

 

 

বি এন আর।০০১৬০০২০০২৬/০০১৬৩/ এন

মতামত...