,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

এসএসসি পরীক্ষাকেন্দ্রে অসুস্থ হয়ে পরীক্ষার্থী মৃত্যু

বিশেষ সংবাদদাতা, ৭ ফেব্রুয়ারী বিডিনিউজ রিভিউজ.কম:: ‘পড়ালেখা শিখে নিজের ও পরিবারের ইচ্ছানুযায়ী ব্যাংকার হওয়ার কথা ছিল তার। সে অনুযায়ী ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ নিয়ে পড়ালেখা শুরু করে রায়হান। মনোযোগ দিয়ে পড়ত জীবনের সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য। তার বড় ভাই সৌদিপ্রবাসী আমার বড় ছেলে তাকে বিভিন্ন সময় পড়ালেখার জন্য উৎসাহ দেয়ার পাশাপাশি আর্থিক যোগানও দিতো। আমার চেষ্টা ছিল বড় ছেলেতো বেশি পড়ালেখা করতে পারেনি, অন্ততঃ তাকে হলেও পড়ালেখা শিখিয়ে ব্যাংকার বানাবো। শিক্ষিত হয়ে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবে, স্থান করে নেবে সমাজে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা সে সুযোগ না দিয়ে আমার বুকের ধনকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে গেল। এখন আমি কাকে নিয়ে বাঁচব ? আমার আশা এখন কে পূরণ করবে’ ?

কথাগুলো বলছিলেন সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের কান্তরবাড়ি নিবাসী পার্বত্য জেলা বান্দরবানের ডাক বিভাগে চাকরিরত পিয়ন মো. সাঁচি মিয়া। তিনি কেঁওচিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী, গত রবিবার সন্ধ্যায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পরপারে চলে যাওয়া মো. রায়হানুল ইসলামের বাবা। মৃত রায়হানের মা-বাবা, একভাই ও পাঁচ বোন রয়েছে। রায়হানের ছোট একবোন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে।

জানা যায়, রায়হান প্রায় ২০ দিন আগে প্রথম বুকে ব্যথা অনুভব করে। ডাক্তারের চিকিৎসায় কয়েকদিন সে সুস্থ বোধ করে। রায়হানের সাথে কেঁওচিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী তার সহপাঠী মো. নাজমুল ও মো. জহির জানায়, সে ২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি ফেরে। গত রবিবার ছিল বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা। পরীক্ষার দিন সকালে হঠাৎ বুকে ব্যথা উঠলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে রায়হান। পরিবারের সদস্যরা তাকে চিকিৎসার জন্য কেরানীহাট শাহ্ আমানত হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালের চিকিৎসায় সে কিছুটা সুস্থ বোধ করলে পরীক্ষা দেয়ার জন্য বাজালিয়ার শেরে বাংলা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে যায়। পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে একবার বমি করে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার ১০ মিনিট আগে সে পর পর দু’বার বমি করে আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে তার ভগ্নিপতি পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে তাকে আবারো শাহ্ আমানত হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে সন্ধ্যায় অবস্থার অবনতি ঘটায় কেরানীহাট আশ-শেফা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তার রায়হানকে মৃত ঘোষণা করেন।

রায়হানের আরেক বন্ধু মো. মাঈনউদ্দিন জানায়, গত ২৭ জানুয়ারি আমাদের স্কুলে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান ছিল। রায়হান আমাকে বলে, এসএসসি পাশ করার পর তাকে যেন আমি সাতকানিয়া সরকারি কলেজে ভর্তি করে দিই। কারণ তার বড় ভাই সৌদি আরবে থাকে। তাকে সাহায্য করার মত বাড়িতে তেমন কেউ নেই। আমি তখন তাকে পাশ করার পর কলেজে ভর্তির ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছিলাম। কারণ তাকে ব্যাংকার হতে হবে।

সোমবার সকালে রায়হানের বাড়ি কেঁওচিয়ার কান্তরবাড়ি এলাকায় সরেজমিনে পরিদর্শনে গেলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়। রায়হানের মৃতদেহ টিনের চালা বেড়ার ঘরে উত্তর-দক্ষিণ করে শুইয়ে রাখা হয়েছে। তার ডাকপিয়ন বাবা ঘরে ঢুকার সরু রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে ছেলের জন্য বিলাপ ধরে বুক চাপড়িয়ে কাঁদছেন। ঘরের উঠানে তার বোনেরা মাটি চাপড়িয়ে বিলাপ করছেন। মৃতদেহ যখন জানাজার নামাজ পড়ার জন্য ঘর থেকে বের করা হচ্ছিল, তখন তার বোন, মা-বাবা ও আত্মীয় স্বজনদের গগণ বিদারী কান্নায় ওই এলাকার আকাশ বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠে। জানাজাশেষে গতকাল (সোমবার) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে রায়হানকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

কেঁওচিয়া উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সদস্য সাংবাদিক এস.এম রানা বলেন, রায়হান ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের একজন মেধাবী ও বিনয়ী ছাত্র ছিল। গত রবিবার সন্ধ্যায় সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। তার মৃত্যুতে বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদ, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও ছাত্র-ছাত্রীদের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করছি।

মতামত...