,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

কক্সবাজারে রেল লাইনের ৩শ কোটি টাকা আত্মসাতের পরিকল্পনা নস্যাৎ গ্রেপ্তার ৩

কক্সবাজার সংবাদদাতা, বিডিনিউজ রিভিউজ.কম: কক্সবাজার রেল লাইনের জন্য সদরে জমি অধিগ্রহণকৃত বরাদ্দের সাড়ে আটশত কোটি টাকার মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছিল একটি প্রতারক চক্র। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কিছু কর্মচারি, এডভোকেট, জজ কোর্টের পেশকার, ভূমি অফিসের নাম ব্যবহারকারী কিছু দালাল, প্রশাসনের তদবিরকারী কিছু পরিচয়ধারী ধান্ধাবাজ সাংবাদিক ও শহরের কয়েকজন অর্থশালী এই চক্রে সরাসরি জড়িত রয়েছে। বর্তমান সরকারের উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা তৈরি ও রেল লাইনের অধিগ্রহণকৃত জমির টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য চক্রটি ভুয়া খতিয়ান, চেয়ারম্যান সনদ, ওয়ারিশ সনদ, জাতীয়তা সনদ, সীল ও স্বাক্ষর জালে জড়িত রয়েছে প্রত্যক্ষভাবে।

মঙ্গলবার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে পুলিশ ও ঝিলংজা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অভিযান চালিয়ে এই চক্রের তিন সদস্যকে আটক করে। আর জব্দ করা হয়েছে ছয় বস্তা ভুয়া নাম জারির সৃজিত খতিয়ান ও বিভিন্ন সনদ। আটকরা হলেন, সদর উপজেলা পিএমখালী ইউনিয়নের দক্ষিণ নয়া পাড়া এলাকার মকবুল আহমদের ছেলে তৌহিদুল ইসলাম, একই ইউনিয়নের মাইজ পাড়া এলাকার আবুল কাশেমের ছেলে নুরুল আবছার ও লিংকরোডস্থ ছাদুর পাড়া এলাকার ছৈয়দুল হক।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নোমান হোসেন বলেন, গত সোমবার রাত ১টার দিকে পুলিশ ও ঝিলংজার চেয়ারম্যান টিপু সোলতানকে সাথে নিয়ে কক্সবাজার বাস টার্মিনাল এলাকায় ‘এম আর বড়–য়া (সুমন)’ নামে একটি দোকানে অভিযান চালায়। অভিযানে এই দোকানের একটি ফাইল থেকে কিছু ভুয়া ওয়ারিশ সনদ জব্দ করা হয়েছে। এই ফাইলের সূত্র ধরে বাস টার্মিনালস্থ পূর্ব লারপাড়া এলাকার জনৈক বাবুলের ভাড়াবাসা থেকে তৌহিদুল ইসলামকে আটক করা হয়। এসময় তার রুম থেকে দুই বস্তা ভুয়া খতিয়ান ও ওয়ারিশ সনদ জব্দ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান ও প্রশাসনের সীল এবং স্বাক্ষর জাল করে খতিয়ান ও ওয়ারিশ সনদ গুলো তৈরি করা হয়। এরপর তৌহিদুলের প্রাথমিক স্বীকারোক্তি মোতাবেক আটক করা হয় নুরুল আবছার ও ছৈয়দুল হককে।

আটকরা প্রাথমিক স্বীকারোক্তিতে প্রশাসনকে জানিয়েছে তারা শুধু খতিয়ান ও ওয়ারিশ সনদ বহনকারী। তাদের এই চক্রের অন্যতম গডফাদার হলো- শহরের উত্তর রুমালিয়ারছড়া এলাকার আবুল ফজলের ছেলে শামসুল হুদা ও শহিদুল হুদা। এই গডফাদারের নেতৃত্বে রয়েছে, ঝিলংজা জানারঘোনা এলাকার এনামুল হকের ছেলে আমিন উল্লাহ, জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার মাসুদ পারভেজ নামে একব্যক্তি, জজ কোর্টের পেশকার মুফিজ ও শহিদ উল্লাহ, সদর ভূমি অফিসের ওমেদার নামদারী দালাল শহিদ, জয়নাল ও জানারঘোনা এলাকার মৃত জামাল হোসেনের ছেলে সাত্তার। এদিকে আটক তৌহিদুল ইসলামের বোনের জামাই হল দালাল সাত্তার। প্রশাসনের কাছে এসব স্বীকারোক্তি দেয়ার পর পুনরায় অভিযান চালিয়ে সাত্তারের বাড়ি থেকে দুই বস্তা ও আমিন উল্লাহর বাড়ি থেকে দুই বস্তা ভূয়া খতিয়ান জব্দ করা হয়েছে। আটক প্রতারণ চক্রের সদস্যরা আরো জানিয়েছে, এসব ভুয়া কাজ থেকে রক্ষা পেতে চক্রের প্রধান শাসমুল হুদা এতোমধ্যে প্রশাসনের নামে মিথ্যা অভিযোগও দায়ের করেছে। কলাতলীতে ভুয়া খতিয়ান তৈরি করে সরকারি জমিও দখলে নিয়েছে।

সদর থানার ওসি রনজিত কুমার বডুয়া  বলেন, ভুয়া খতিয়ান, চেয়ারম্যান সনদ ও ওয়ারিশ সনদ জাল করার অভিযোগ পেয়ে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিনজনকে আটক করেছে। এতে জড়িত সাত্তার ও আমিন উল্লাহ নামে দুই ব্যক্তির বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু তারা পালিয়ে যায়। পরে এই দুজনের বাড়ি থেকে চার বস্তা ভূয়া খতিয়ান জব্দ করা হয়েছে। এবিষয়ে ঝিলংজা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান টিপু সোলতান বাদি হয়ে তিনজনের নাম উল্লেখ করে মঙ্গলবার বিকালে জালিয়াতি মামলা দায়ের করেন। মামলায় অজ্ঞাত জনদের আসামি করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত সবাইকে আটক করা হবে বলে নিশ্চিত করেছেন ওসি রনজিত।

সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাজিম উদ্দীন বলেন, জাল ও ভূয়া খতিয়ানে ভূমি অফিসের কেউ জড়িত রয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মূলত একটি দালাল চক্র দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে যাচ্ছে খতিয়ান নিয়ে। এই চক্রের তিন সদস্যকেও আটক করা হয়েছে। এমনটি এই প্রতারক চক্রের গডফাদার উত্তর রুমালিয়ারছড়া এলাকার শামসুল হুদা বলে জানা গেছে।

নাজিম উদ্দীন বলেন, শামসুল হুদা নামে এই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে একটি ভুয়া খতিয়ান তৈরি করে কলাতলী বাইপাস সড়কের পাশে বিশাল একটি পাহাড়সহ সরকারি জমি দখল করে খোরশেদ নামে একব্যক্তিকে বিক্রি করেন। সেখানে পাহাড় কেটে স্থাপনাও নির্মাণ করা হয়। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে গত চারদিন আগে সেখানে অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু এই প্রতারক চক্রের সদস্যরা ভুয়া খতিয়ান গুলো আসল খতিয়ান বলে প্রশাসনের নামে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে। এমনকি ভুয়া খতিয়ানের মাধ্যমে সরকারি জায়গা হাতিয়ে নেয়ার কৌশল হিসেবে প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করতে বিভিন্নভাবে ভুয়া সংবাদ পরিবেশে করতে সহযোগিতা করে এই জালিয়াতি চক্রের সদস্যরা।

কক্সবাজার ঝিলংজা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান টিপু সোলতান বলেন- সরকার রামু-কক্সবাজার-ঘুমধুম রেল প্রকল্পের জন্য সদরে ১ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করেছে। অধিগ্রহণভূক্ত জমির সাড়ে আট শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করতে এই সিন্ডিকেট গড়ে উঠে। তাদের টার্গেট ছিল প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তত ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া। সেজন্য রাতারাতি খতিয়ান সৃজন করতে খতিয়ান প্রতি ব্যয় করেছে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। এমনকি আমার সীল ও স্বাক্ষর জাল করে তারা তৈরি করেছে চেয়ারম্যান সনদ ও ওয়ারিশ সনদও। তৎমধ্যে ৩১৩টি ওয়ারিশ সনদ জব্দ করা হয়েছে।
ভূক্তভোগি আব্দুল হামিদ নামে এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, চক্রটি ভুয়া দলিল তৈরি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করেছিল। তারা ঝিলংজা এলাকার শহিদুল ইসলাম বাহাদুর, রহমত উল্লাহ, আব্দু রহিম, আব্দুল হাকিম গং, মৃত গোলাম হোসেনের ওয়ারিশ গং, মৃত বদিউল আলমের ওয়ারিশ গং এর জমির খতিয়ান ভুয়া তৈরি করে অধিগ্রহণের টাকা হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিল। বিভিন্ন ব্যক্তির প্রায় ৩০০ কোটি টাকার মূল্যের জমির টার্গেট ছিল এই প্রতারণা চক্রের।

এচক্রের কয়েকজনকে আটকের পরপরেই চক্রের অন্যরা আত্মগোপনে চলে গেছে। মূলত সরকারের উন্নয়নকে ব্যাঘাত করার জন্য চক্রটি এই অপতৎপরতা চালাচ্ছে। এমনকি এতোমধ্যে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন ও সফল অভিযানও তারা বিভিন্নভাবে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। ভুয়া খতিয়ানের দখল করা কোনো সরকারি জমি প্রশাসন উচ্ছেদ করলেই চক্রটি কিছু ধান্ধাবাজ পরিচয়ধারী সাংবাদিকদের মাধ্যমে স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকায় মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করে সরকারের মানক্ষুণ করে যাচ্ছে বলে অভিযোগও রয়েছে প্রশাসনের কাছে। এমনকি পরিচয়ধারী সাংবাদিকরা সরকার সমর্থক  উল্লেখ করে সরকারি উন্নয়ন কাজে ব্যাঘাত করে যাচ্ছে বলেও প্রশাসন ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে জানা যায়।

কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নোমান হোসেন পূর্বকোণকে বলেন- এমন ভয়াবহ চক্রের তিন সদস্যকে আটক করা হয়েছে। বাকি সদস্যদের যেকোনোভাবে আইনের আওতায় আনা হবে। মূলত তারা সরকারের উন্নয়ন বাঁধাগ্রস্থ করার জন্য তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে গতকাল মঙ্গলবার থেকে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির লোকজন যাচাই বাছাই করেই কক্সবাজার সদরে রেলের অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণ দিবে আসল জমির লোকজনকে। প্রয়োজনে বাড়িতে গিয়েই জমির চেক বুঝিয়ে দেয়া হবে।

মতামত...