,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

কক্সবাজার মাতারবাড়ি বিদ্যুৎপ্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রম ফের অনিশ্চয়তায় মুখে

a (10)আবদুর রাজ্জাক,কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি,বিডিনিউজ রিভিউজঃ কক্সবাজারের মহেশখালীর প্রস্তাবিত মাতারবাড়ির বিদ্যুৎপ্র্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রম আবার অনিশ্চয়তায় মুখে পড়েছে। এ প্রকল্পের কাজ শুরু করেও কেন যেন শুরু করা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে অগ্রাধিকার পাওয়া এ প্রকল্পের দরপত্র জমা দেওয়ার নির্ধারিত তারিখ ছিল গত ২৪ জুলাই। কিন্তু ১ জুলাই ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার ঘটনায় দুই পুলিশ কর্মকর্তা, সাত জাপানি নাগরিকসহ দেশি-বিদেশি মোট ২২ নাগরিকের হত্যাকান্ডের ঘটনার পর মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দরপত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া এক মাসের জন্য পিছিয়ে আগামী ২৪ আগস্ট নির্ধারণ করা হয় । কিন্তু নির্ধারিত তারিখেও এই প্রকল্পের দরপত্র জমা দেওয়ার কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রকাশ। এ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে কার্যক্রম স্থগিত নয়, এই প্রকল্পের দরপত্র জমা দেওয়ার কার্যক্রমের সময় আরও দুই মাসের জন্য পেছানো হয়েছে।
এব্যাপারে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিপিজিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল কাশেম জানান, মূলত গুলশান হামলার পর নিরাপত্তা জনিত কারণেই জাপানের উন্নয়ন সংস্থা (জাইকা)র অনেক সহযোগী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে সাময়িক অনুপস্থিত রয়েছে এবং অনেকের সঙ্গে করা চুক্তিপত্র বাতিল করে আবার নতুন করে চুক্তিপত্র করতে হচ্ছে। তাই, কিছুটা সময় প্রয়োজন বলে তারা আমাদের জানানোর পর আমরা তা মেনে নিয়েছি। আগামী ২৪ অক্টোবর এ প্রকল্পের দরপত্র জমা নেওয়ার কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হবে বলে তিনি জানান।
উল্লেখ্য, গত বছরের আগস্টে মহেশখালীর মাতারবাড়ি এলাকায় এক হাজার দুইশ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ৩৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করে সরকার, যা হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের প্রকল্প। এই প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা আমদানি করা হবে। আমদানিকৃত কয়লা ওঠা-নামানোর জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গেই একটি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের বিষয়টিও প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পের কার্যপত্রে বলা হয়েছে, জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকা এই প্রকল্পে ২৯ হাজার কোটি টাকা দেবে। ইতোমধ্যে, মাতারবাড়ি প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করেছে সরকার।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি একনেকে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পের কার্যপত্রে বলা হয়েছে, প্রকল্পের জন্য মোট ৩৬ হাজার কোটি টাকার মধ্যে জাপানের উন্নয়ন সংস্থা (জাইকা) এই প্রকল্পে ২৯ হাজার কোটি টাকা দেবে। বাকি টাকার মধ্যে ৪ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা সরকারের তহবিল থেকে বরাদ্দ করা হবে এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থা- কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল) দেবে ২ হাজার ১১৯ কোটি টাকার জোগান। বাংলাদেশে বর্তমানে উৎপাদিত প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ৭০ শতাংশই আসে গ্যাস থেকে। কয়লা থেকে আসে মাত্র ৩ শতাংশেরও কম। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগুচ্ছে যার মধ্যে অর্ধেক আসবে কয়লা থেকে। প্রকল্পের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ‘আলট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি’ ব্যবহার করা হবে, যাতে কেন্দ্রের কর্মদক্ষতা হবে ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ। বাংলাদেশের বর্তমানে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর গড় কর্মদক্ষতা ৩৪ শতাংশের বেশি নয়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জাপানের অর্থায়নে কক্সবাজারে এক হাজার দুইশ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণে আগ্রহ দেখিয়ে প্রস্তাব জমা দিয়েছে জাপানের দুটি কোম্পানি। জাপানের সুমিতোমো করপোরেশন ও মারুবেনি করপোরেশন নামের দুটি প্রতিষ্ঠান এ প্রকল্পের জন্য প্রস্তাব জমা দিয়েছে, যা এখনও যাচাই করা হয়নি।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল) ২০১১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করে। এর প্রধান উদ্যোগ হলো চট্টগ্রামের কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি এবং ধলঘাটা ইউনিয়নে একটি এক হাজার দুইশ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা।
মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প
প্রকল্পের পরিবেশ প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করা হয় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে। মাতারবাড়ি এক হাজার দুইশ মেগাওয়াট প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জাইকার মধ্যে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ২০১৪ সালের জুন মাসে। প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি অনুযায়ী মোট ব্যয় হবে ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। প্রকল্পের জন্য কয়লা আমদানি, কয়লা স্টোরেজ, জেটি ও কয়লা হ্যান্ডলিং সুবিধা, পাওয়ার প্ন্যান্ট, শহর উন্নয়ন, পল্লী বিদ্যুতায়ন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং সড়ক যোগাযোগ নির্মাণ কাজ এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত।
মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক প্রকল্পে আল্ট্রা-সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি সংযোজনের জন্য প্ল্যান্টের নেট দক্ষতা ৪৪ শতাংশ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থাৎ কম পরিমাণে কয়লা খরচ ও কার্বন-ডাই-অক্সাসাইড নির্গমন। এই প্ল্যান্টের উচ্চমানের যন্ত্রপাতি ও উপকরণ ব্যবহার করার ফলে প্রচলিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় সর্বনিম্ন বায়ুদূষণ, কম কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গমন, দুই পর্যায়ের কম কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস দহনকারী বার্নার সংস্থান করা হবে। কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস উৎপাদন কমাতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে সি-ওয়াটার টাইপ ডি-সালফারাইজেশন প্ল্যাটে স্থাপন করা হবে।
ফ্ল্যাই-অ্যাশ উৎপাদন কমাতে বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে আন্তর্জাতিক নিয়ম ও প্রবিধান অনুযায়ী ইলেকট্রোস্ট্যাটিক প্রেসিপিটেটর ব্যবহার করা হবে। সর্বসাকুল্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিধি প্রবিধান এবং মান অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।
নসরুল হামিদ বলেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি কমানো হবে। মানবসম্পদের বিকাশ হবে। নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং আধুনিক প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে। প্ল্যান্টটি বেইজ লোডে পরিচালিত হবে এবং মাতারবাড়িতে আমদানিকৃত কয়লা ব্যবহারে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করা হলে বিদ্যুতের ঘাটতি এবং দেশের বিশেষ করে দক্ষিণ অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা যাবে। এটি সারাদেশে নির্ভরযোগ্য ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে বিশেষ অবদান রাখবে বলেও জানান জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী।

মতামত...