,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ছেলেকে পরীক্ষা কেন্দ্রে পাঠিয়ে স্ত্রীকে জবাই করে হত্যা

আনোয়ারা সংবাদদাতা, ৬ ফেব্রুয়ারী বিডিনিউজ রিভিউজ.কম::আনোয়ারায় পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্বামীর বিরুদ্ধে। সকালে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছেলেকে পরীক্ষা কেন্দ্রে পাঠিয়ে স্ত্রী ঊর্মি দাশকে (৩৫) জবাই ও পেট কেটে হত্যা করে তার স্বামী আশীষ দাশ (৪৫)। ঘটনার পর থেকে আশীষ ও তার মা পলাতক রয়েছেন।

উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের শিলালিয়া গ্রামে রবিবার সকালে এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়রা জানান, সকাল সাড়ে নয়টার দিকে পারিবারিক কলহের জের ধরে স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করেন স্বামী আশীষ। এর আগে সকাল নয়টায় স্বামী-স্ত্রী দু’জনে তাদের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছেলে মিশন দাশকে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য গাড়িতে তুলে দেন। এদিকে নিহত উর্মি দাশের ছোট ভাই বাদী হয়ে ঘাতক ভগ্নিপতি আশীষ ও বোনের শাশুড়ি সুখী দাশের বিরুদ্ধে আনোয়ারা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
আনোয়ারা থানা, স্থানীয় ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, ১৭ বৎসর আগে পটিয়া উপজেলার উত্তর হাইদগাঁও গ্রামের বাসিন্দা নিতাই বিশ্বাসের ১ম কন্যা ঊর্মি দাশের সাথে আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের শিলালিয়া গ্রামের রজনী দাশের বাড়ির মৃত নারায়ণ দাশের বড় ছেলে আশীষ দাশের বিয়ে হয়। বর্তমানে তাদের সংসারে তিন সন্তান রয়েছে। এদের মধ্যে বড় ছেলে এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী, মেয়ে ৯ম শ্রেণিতে এবং ছোট ছেলে ৪র্থ শ্রেণিতে পড়ে। অভাব অনটনের সংসারে বিয়ের পর থেকে নানা কারণে আশীষ ও ঊর্মির মধ্যে পারিবারিক কলহ লেগে থাকতো। এসব বিষয় উভয়ের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-পড়শিরা জানতেন। অনেকেই এসব কলহ মিটমাটের চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হন।

আর্থিক অনটনের কারণে দুই বছর আগে ঊর্মি কালুরঘাট এলাকায় একটি গার্মেন্টসে চাকরি নেন। সেখানে ভাড়া বাসায় তিন ছেলে-মেয়ে নিয়ে থাকতেন। অন্যদিকে স্বামী আশীষ শহরে ব্যানার-সাইনবোর্ড লেখার কাজ করতেন। থাকতেন আলাদা বাসায়। মাঝে মধ্যে ছেলে মেয়েদের খবর নিতে স্ত্রীর কালুরঘাটের বাসায় গেলেও ২/১ দিন থেকে চলে আসতেন। আশীষ চাইতেন না তার স্ত্রী গার্মেন্টেসে চাকরি করুক। তবে আশীষের সংসারে অভাব ও ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে গার্মেন্টসে চাকরি নেন ঊর্মি।

জানা যায়, রবিবার সকালে আশীষ গ্রামের বাড়িতে তার স্ত্রীকে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দা দিয়ে গলা ও পেট কেটে হত্যা করেন। হত্যার পর ঊর্মির নিথর দেহ ঘরের মেজে পড়ে ছিল। পুরো ঘরে ছিল রক্তের দাগ। ঘরে কিছু বই ও আসবাবপত্র ছড়ানো ছিটানো দেখা যায়। পুলিশের ধারণা হত্যাকাণ্ডের আগে দু’জনের মধ্যে বেশ ধস্তাধস্তি হয়েছে। ঘটনার সময় আশীষের ঘরে তার মা সুখী দাশও (৬৫) ছিলেন। ছোট ভাইয়ের স্ত্রী রিংকু দাশ এসময় বাইরে ছিলেন বলে জানা যায়।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আশীষের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী রিংকু দাশ জানান, সকালে ঘটনার সময় আমি পার্শ্ববর্তী বিয়ে বাড়িতে যাই। সাড়ে ৯টার দিকে আমার মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর জন্য ঘরে এসে দেখি আশীষ রক্তাক্ত অবস্থায় দৌড়ে চলে যাচ্ছেন। আমি মনে করেছিলাম আশীষকে তার স্ত্রী মেরেছে। কিন্তু ঘরে গিয়ে দেখি ঊর্মির রক্তমাখা শরীর পড়ে আছে। আমি ঘটনাটি সবাইকে জানালে এলাকাবাসী পুলিশকে খবর দেয়। এরপর পুলিশ আসে। দুপুর ১২টার দিকে ঊর্মির মৃত্যুর খবর পেয়ে শহর থেকে ছুটে আসেন ঊর্মির মেয়ে পূজা, ছেলে দেবনাথ, বোন শমী বিশ্বাস, কুমকুম বিশ্বাস, মা মিনতী বিশ্বাস ও ছোট ভাই শ্রীধাম বিশ্বাসসহ আত্মীয়-স্বজনেরা। এসময় তাদের কান্না ও আত্মচিৎকারে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠে।

নিহতের বড় ছেলে মিশন দাশ (১৫) আজাদীকে জানায়, গত বছরের অক্টোবর মাসে শহরের মায়ের বাসা ছেড়ে আমি এসএসসি পরীক্ষা উপলক্ষে গ্রামের বাড়িতে চলে আসি। এখানে ঠাকুর মার (সুখী দাশ) সাথে থাকি। তখন বাবা ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেন। গত ২ ফেব্রুয়ারি আমার এসএসসি পরীক্ষা শুরু হলে বুধবার আমার মা ঊর্মি পরীক্ষা উপলক্ষে ১ সপ্তাহ ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে আসেন। তার আগে থেকে বাবা বাড়ি ছিলেন। গত শনিবার রাতের খাওয়া নিয়ে মায়ের সাথে বাবার সামান্য কথা কাটাকাটি হয়। এ রকম ঝগড়া মা-বাবার মধ্যে প্রায়ই হতো। রাতে খেয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়ি। সকাল সাড়ে ৮টায় আমি পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতিকালে বাবা ঘুম থেকে উঠে আমাকে গাড়িতে তুলে দেন। আমি হাইলধরে পরীক্ষা দিতে চলে যাই। পরীক্ষা শেষে বাড়ি এসে শুনি বাবা মাকে খুন করে পালিয়ে গেছেন। আমার ঠাকুর মা সুখী দাশেরও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। ছেলে মিশন আরো জানায়, বাবা কখনো চাইতেন না মা গার্মেন্টেসে চাকরি করুক। আমাদের ঘরে অভাব ছিল। তাই হয়তো মা চাকরি নিয়েছিলেন। কিন্তু বাবা সব সময় মাকে খারাপ ভাবতেন, মাকে নিয়ে অনেক বিশ্রী কথা বলতেন। কিন্তু আমাদের কিছুই করার ছিল না। আমি বাবাকে বুঝাতাম। এসব কথা আমি শুনতে না চাইলেও বাবা সব সময় আমার কান ভারি করতেন। বাবা কখনো মাকে ভালো জানতেন না।

নিহতের ছোট বোন কুমকুম বিশ্বাস জানান, আমার বড় বোন ঊর্মির কষ্ট দেখে আমরা সইতে পারছিলাম না। তাই আমার সাথে ভাড়া বাসায় বোন ও তার ছেলেমেয়েদের রেখেছিলাম। বিয়ের পর থেকে আমার বোনের সাথে আশীষ নির্মম ব্যবহার করতো। ঠিকমতো ভরণ পোষণ দিতে পারতো না। বাধ্য হয়ে বোন চাকরি নিয়েছিল। ছেলের পরীক্ষা উপলক্ষে এক সপ্তাহ ছুটি নিয়ে বাড়ি গেলে আশীষ নানা অজুহাতে ঝগড়া লাগিয়ে নির্মমভাবে খুন করে। এমন ঘটনা ঘটবে কেউ ভাবতে পারিনি।
আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দুলাল মাহমুদ জানান, দীর্ঘদিন স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য, পারিবারিক কলহ ও সন্দেহ-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব থেকে এ খুনের ঘটনা ঘটেছে বলে মনে হয়। এটি খুবই মর্মান্তিক। পুলিশ পুরো ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছে এবং তার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চালাছে। ঘাতক স্বামী ও শাশুড়িকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। এরা আটক হলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচন হবে। এ ঘটনায় গতকাল বিকেলে স্বামী ও শাশুড়ির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রেকর্ড হয়েছে।

মতামত...