,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

চট্টগ্রামের নক্ষত্র মহিউদ্দিন চৌধুরীর চির বিদায়

নাছির মীর, বিডিনিউজ রিভিউজ.কম::চট্টগ্রামের উজ্জল নক্ষত্র মহিউদ্দিন চৌধুরীর চির বিদায় সারাদেশের মানুষের মনে দোলা দিয়েছে।  মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় সৈনিক, গণমানুষের নেতা চট্টল দরদী মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে চট্টগ্রামের নক্ষত্রের বিদায় হলো। সকাল থেকে রাত অবদি যিনি মানুষের  দাবি আদায়ে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন তার জীবনাবাসনের মাধ্যমে চট্টগ্রামের মানুষের দাবি আদায়ের সেই কণ্ঠ স্তিমিত হয়ে গেল বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। তিনি সরকারি দলে থাকেন কিংবা বিরোধী দলে থাকেন না কেন, তার ভাবনায় আসা জনগণ ও দেশের স্বার্থে নেমে পড়তেন মাঠে ময়দানে। তাই তো আওয়ামী লীগের প্রথম সরকারের সময় তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের মোহনায় ষ্টিভিডোরিং সার্ভিস অব আমেরিকা (এসএমএ) কর্তৃক বন্দর নির্মাণের সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। বন্দরের ২২টি শ্রমিক সংগঠনকে নিয়ে তিনি আন্দোলন গড়ে তোলায় শেষ পর্যন্ত তাদের পিছু হটতে হয়েছে।

এমনকি বর্তমান সময়েও তিনি এক মাস পূর্বে অসুস্থতার আগের দিন পর্যন্ত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ঘোষিত হোল্ডিং ট্যাক্সের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।

বিরোধী দলে থাকাকালীন তিনি চট্টগ্রাম শাহ্ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ব্যবস্থাপনা বিদেশি একটি এয়ারলাইন্সকে ছেড়ে দেয়ার বিরোধিতা করেছেন সামাজিক অনাচার ও মূল্যবোধের কথা চিন্তা করে। জনগণের স্বার্থে সড়ক সম্প্রসারণসহ অনেক কাজের ক্ষেত্রে আইনি মারপ্যাঁচের কাছে নত হননি। আবার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিজ চিন্তা ও কর্পোরেশনকে আর্থিক স্বাবলম্বী করতে সরকারি সিদ্ধান্ত না নিয়েও প্রকল্প গ্রহণে পিছপা হননি। এ নিয়ে বিগত ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময় তাকে জেলে যাওয়া থেকে শুরু করে অনেক মামলার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

অত্যন্ত সম্মোহনী শক্তির অধিকারী মহিউদ্দিন চৌধুরী সহজেই যে কাউকে আপন করে নিতে পারতেন। তার আতিথেয়তা থেকে কেউ বঞ্চিত হতে পারতো না। চশমা হিলের তার বাড়িতে দেখা করতে গিয়ে না খেয়ে ফিরতে পারতেন না কেউ।

রাউজানের গহিরা গ্রামে জন্মগ্রহণকার মহিউদ্দিন চৌধুরীকে রেল বিভাগে পিতার চাকরির সুবাদে চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে নোয়াখালীতেও শিশুকাল অতিবাহিত করতে হয়েছে। খুবই ডানপিটে মহিউদ্দিন চৌধুরী বাবা-মায়ের কাছে কালু নামে পরিচিত ছিলেন। ছোটবেলা থেকে প্রতিবাদী ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। সামাজিক ত্যাগ তিতিক্ষা, মানুষের অসহায়ত্ব ও কষ্ট তাকে নাড়া দিত। তাই তো ’৬৭ সালে চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন নেয়ার পরও তিনি নিজের জীবনকে জড়িয়ে ফেলেছেন মানুষের দাবি আদায়ের সংগ্রামে। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হয়েছিলেন। একাধিকবার কারাবরণসহ হুলিয়া নিয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করেছেন। তিনি পত্রিকার হকার, চা-দোকানদার, রেডিও মেকানিকের কাজ করেছেন জীবনের চলার পথের কঠিন বাস্তবতায়। চশমা হিলের বাসা থেকে নগরীর নিউ মার্কেট সংলগ্ন ঐতিহাসিক আলোচিত গ্র্যান্ড হোটেল ও দারুল ফজল মার্কেটের আওয়ামী লীগের কার্যালয় ঘিরে ছিল তার প্রধান বিচরণকেন্দ্র।

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ১৯৪৪ সালের ১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি নগরীতে নৌ কমান্ডের অধীনে আটক হয়ে নির্যাতিত হয়েছেন। একই সাথে ’৭১ এর ২ মার্চ তারই নেতৃত্বে পাকিস্তানের পতাকা পোড়ানো হয়েছিল লালদীঘিতে। এক পর্যায়ে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি হয়ে আগরতলা ক্যাম্প পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর ’৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর সপরিবার হত্যার পর তাকে চলে যেতে হয়েছে কলকাতায়। সেখানে অনেক কষ্টে জীবন পার করতে হয়েছে তাকে।

মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র হয়েছেন ১৯৯৪ সালে। পরপর তিনবার মেয়র নির্বাচিত হয়ে হ্যাট্রিক করেছেন। প্রায় ১৬ বছর ধরে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন মেয়রের দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে স্বাস্থ্য-শিক্ষা ও আদর্শ নগরী হিসেবে গড়ে তোলার যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

মতামত...