,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

চট্টগ্রামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধে মনিটরিং শুরু: বাওয়ায় ভর্তি ১০ ও মেরন সানে টিসি ৫ হাজার টাকা

নিউজ ডেস্ক, ২০ বিডিনিউজ রিভিউজ.কম:: দেশে শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের হলেও শিক্ষা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে তেমন কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলেই তারা ফি এর নামে নিজেদের ইচ্ছা মতো চাঁদা আদায় করে যাচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে অনেক সময় অভিযোগ কারিদের বাচ্চাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

চট্টগ্রাম মহানগরীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাড়তি ভর্তি ফিসহ অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধ করতে গঠিত মনিটরিং টিম মাঠে নেমেছে।

জানাগেছে, চট্টগ্রাম  মহানগরীর অভিজাত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল চিটাগাং গ্রামার স্কুলে (সিজিএস) ভর্তি ফি বাবদ আদায় করা হচ্ছে ৬৩ হাজার টাকা। প্রতি মাসের বেতন হিসেবে আদায় করা হচ্ছে শ্রেণিভেদে ১৬ হাজার টাকা থেকে ১৯ হাজার টাকা। এসব অর্থ নিয়ম মেনে আদায় করা হচ্ছে বলে স্কুল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে। তবে মনিটরিং টিম বলেছে, তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা বোর্ডে রিপোর্ট প্রদান করবে। বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া এই কার্যক্রমের আওতায় নগরীর ৯৮ টি স্কুলের সার্বিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম অনুসন্ধান করা হবে। প্রথম দিনে নগরীর পৃথক পৃথক এলাকার ১২টি স্কুলে পরিদর্শন কার্যক্রম চালিয়েছে টিমগুলো।

বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ভর্তি ফি এবং মাসিক বেতন, টিসি নেয়ার ফিসহ বিভিন্ন ফি আদায়ে কোন ধরনের নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা করে না বলে অভিযোগ রয়েছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এই ব্যাপারে আয়োজিত সভা থেকে  প্রশাসনের পাঁচজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচটি মনিটরিং টিম গঠন করা হয়। বিভিন্ন স্কুলে সরজমিনে গিয়ে ভর্তি ফিসহ অন্যান্য ফি আদায়ের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের জন্য উক্ত পাঁচটি টিমকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা এবং ক্যাবের প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। নগরীর ৯৮টি স্কুলের তালিকা করে উক্ত পাঁচটি টিম পর্যায়ক্রমে পরিদর্শনে যাবে। মনিটরিং টিম স্কুলগুলো ভর্তি ফি কত নিচ্ছে, মাসিক বেতন কত, বার্ষিক উন্নয়ন চার্জসহ আনুষাঙ্গিক খাতে আর কী কী নামে ছাত্র ছাত্রীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে তার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করবে।আদায়কৃত অর্থ সরকারি নিয়ম কানুনের মধ্যে রয়েছে নাকি বাড়তি আদায় করা হচ্ছে তা নির্ণয় করে কমিটি রিপোর্ট প্রদান করবে। কেবল স্কুল কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য নয়, একই সাথে ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকদের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কোন স্কুল মিথ্যা তথ্য দিলে বা কোন তথ্য গোপন করলে ওই স্কুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয় এবং বোর্ডে অনুরোধ জানানো হবে।

জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুল রহমানের নেতৃত্বে গঠিত একটি টিম  চিটাগাং গ্রামার স্কুল (সিজিএস) এবং বাংলাদেশ মহিলা সমিতি (বাওয়া) স্কুল পরিদর্শন করে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাব্বির রহমান সানির নেতৃত্বে গঠিত টিম ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এন্ড কলেজ পরিদর্শন করে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শারমিন আকতারের নেতৃত্বে গঠিত টিম আগ্রাবাদের হাতেখড়ি স্কুল এন্ড কলেজ, আগ্রাবাদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, শহীদনগর সিটি বালিকা বিদ্যালয়, প্রবর্তক স্কুল এন্ড কলেজ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনি উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শন করে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত টিম পাহাড়তলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং মীর্জা আহমেদ ইস্পাহানী উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শন করে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শেখ নুরুল আলমের নেতৃত্বে অপর টিম কর্ণফুলী পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ এবং মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজ পরিদর্শন করে।
এই ১২টি স্কুলের মধ্যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত টিম নগরীর সার্সন রোডস্থ চিটাগাং গ্রামার স্কুলে (সিজিএস) গিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের ভর্তি ফি, পুনঃভর্তি ফি, সেশন ফি, উন্নয়ন ফি এবং স্কুল পরিবর্তন (টিসি) ফি বিষয়ে জানতে চায়। তদন্ত টিমের দলের চাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণিতে কি পরিমাণ ফি নেয়া হয় তার একটি তালিকা করে দেয় সিজিএস কর্তৃপক্ষ। এ সময় সিজিএসর অধ্যক্ষ মাহিন খানসহ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে তদারকি দলের নেতৃত্বদানকারী তাহমিলুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘অতিরিক্ত ভর্তি ফিসহ অন্যান্য ফির বিষয়ে তদারকির যে সিদ্ধান্ত জেলা প্রশাসন নিয়েছে তার ভিত্তিতেই আমরা কাজ করছি। নগরীকে পাঁচটি জোনে ভাগ করে মোট ৯৮টি স্কুলে এ তদারকির কাজ শুরু হয়েছে। এখানে (সিজিএস) কি ধরনের ফি তারা নেয় সেটা আমরা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছি।’ ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর বলেন, সিজিএস স্কুল কর্তৃপক্ষ মাত্র ৬৩ হাজার টাকা ভর্তি ফি এবং শ্রেণি ভেদে ১৬ থেকে ১৯ হাজার টাকা মাসিক বেতন নেয় বলে জানিয়েছে। সরকারি নীতিমালা অনুসারে ব্রিটিশ কারিকুলামে পরিচালিত বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এই ফি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ সেটা মিলিয়ে দেখার পাশাপাশি পরবর্তীতে অভিভাবকদের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হবে বলে জানান ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘কোনো অসামঞ্জস্য এবং তথ্য লুকানোর প্রমাণ পেলে শিক্ষাবোর্ডকে বলব এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে।’ এ বিষয়ে সিজিএস স্কুলের অডিট ব্যবস্থাপক আজিজুর রহমান উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভর্তি ফি ও বেতন নির্ধারণ করে স্কুল ম্যানেজিং কমিটি। সরকারি গেজেট অনুসারে এর এখতিয়ারও কমিটির আছে।’ ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমানের নেতৃত্বাধীন মনিটরিং টিমের সদস্য ছিলেন থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার কাজী মোহাম্মদ সাজ্জাদুল হক, জেলা শিক্ষা অফিসের সহকারী পরিদর্শক সাব্বির আহমেদ এবং ক্যাব সদরঘাট থানার সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌস।

সিজিএস স্কুলে পরিদর্শনের সময় ন্যাশনাল কারিকুলামের অধীনে পরিচালিত কোনো স্কুলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভর্তি ফি নেওয়ার বিধান রয়েছে বলে জানান জেলা শিক্ষা অফিসের সহকারী পরিদর্শক সাব্বির আহমেদ। তিনি বলেন, ‘ব্রিটিশ কারিকুলামের ক্ষেত্রে এই ফি কতটা হতে পারে, এ বিষয়ে সরকারি নীতিমালা কী-তা খোঁজ নিয়ে জানাতে পারব।’ ব্রিটিশ কারিকুলামে পরিচালিত হলেও বেতন-ফি বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন ক্যাব প্রতিনিধি জান্নাতুল ফেরদৌস। সিজিএস স্কুল থেকে তদারক দলটি নগরীর ওয়াসা মোড় সংলগ্ন বাংলাদেশ মহিলা সমিতি উচ্চ বিদ্যালয় (বাওয়া) ও কলেজ পরিদর্শনে যায়।

বাওয়া স্কুলের প্রবেশ পথে কয়েকজন অভিভাবক ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তদারকি দলকে জানায়, প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে ১০ হাজার ৩০০ টাকা ফি নেওয়া হয়।

পুলিশ লাইন উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে জানায়, এবছর সাড়ে চার হাজার টাকা ভর্তি ফি দিয়ে তাকে ভর্তি হতে হয়েছে।

এক অভিভাবক জানান, পাঁচ হাজার ২০০ টাকা করে ভর্তি ফি দিয়ে তিনি তার দুই সন্তানকে পুলিশ লাইন উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছেন। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমান বাওয়া স্কুলের ভেতরে যান। বাওয়া স্কুলের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) আনোয়ারা বেগম তদারকি দলকে ষষ্ঠ থেকে দশম পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণির ভর্তি ফিসহ অন্যান্য ফি আদায়ের তালিকা ও রসিদ দেন।

ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমান ফি আদায়ের ওই তালিকা ও রসিদের তথ্য থেকে সাংবাদিকদের জানান, প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে স্কুলটিতে এক মাসের বেতনসহ ১০ হাজার ৩০০ টাকা ভর্তি ফি নেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘কেউ টিসি নিয়ে চলে যেতে চাইলে ভর্তি ফি ও পুরো মাসের বেতন দিতে হয় ।

চট্টগ্রাম  মহানগরীর চকবাজারে মেরন সান স্কুলে টিসি বাবদ পাঁচ হাজার টাকা আদায় করা হয়।  জেলা প্রশাসনের পাঁচটি টিম নগরীর অন্যান্য যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছে ।মনিটরিং কমিটি আগামী রোববার আবারো তালিকাভুক্ত স্কুলগুলো পরিদর্শনে যাবে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সামসুল আরেফীন বলেন, আমরা এক সপ্তাহের মধ্যে নগরীর ৯৮টি স্কুলের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করার জন্য মনিটরিং টিমগুলোকে বলেছি। তবে যত দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্ভব আমরা সব তথ্য সংগ্রহ করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবো। তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকদের জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগে সহায়তা করারও আহ্বান জানান।

মতামত...