,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

চট্টগ্রামে ক্ষমতাসীন দলের কোন্দলই উন্নয়নের অন্তরায়

নিউজ ডেস্ক, বিডিনিউজ রিভিউজ.কম::দেশের প্রধান বাণিজ্য নগরী চট্টগ্রাম। হালে এটা দুর্ভোগের নগরীতে পরিণত হয়েছে। দিনে দিনে তা হয়ে পড়েছে বসবাসের অযোগ্য। আগ্রাবাদ এক্সেস রোড বা সিডিএ এভেনিউর দিকে তাকালে বেশ বুঝা যায় এ নগরীর কি হাল হয়েছে তা। ভাঙ্গাচোরা রাস্তা, ফুটপাত, জলজট এবং যানজট নিত্যসঙ্গী নগরবাসীর। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের অনৈক্য, পারষ্পরিক রেষারেষি, কোন্দল এখানকার উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায় বলে মনে করছেন নগরীর সাধারণ মানুষ। তাদের মতে, নগরীর উন্নয়নের বিষয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি সাবেক সিটি মেয়র আলহাজ এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, সাংসদ ডা. আফছারুল আমীন ও এম আবদুল লতিফ এবং সিটি মেয়র আ জ ম নাছিরউদ্দিন ও সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের মধ্যে চরমভাবে বিরাজমান ‘ইগো প্রবলেম।’ এদের ঐক্য ও সমন্বয় তৈরি না হলে নগরবাসীর দুর্ভোগ থেকে পরিত্রাণ মিলবে না ।
অবস্থাটা কি? ৬০ লাখ নগরবাসীর যাবতীয় সমস্যা দেখভাল করার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে সিটি কর্পোরেশন। উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে সেই সঙ্গে নিয়োজিত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ( সিডিএ )। সিটি মেয়র আ জ ম নাছির মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আর কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালাম সিডিএর চেয়ারম্যান। তিনি ৮ বছরের বেশি সময় ধরে নিয়োজিত এই দায়িত্বে। ষষ্ঠবারের মত তিনি এই দায়িত্বে নিয়োগ পেয়েছেন গত এপ্রিলে। দু’বছরে ৬টি প্রকল্পে ৬,৬৯১ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে সিডিএ। আর এসময়ে সিটি কর্পোরেশন পেয়েছে মাত্র ৭৫১ কোটি টাকা। অথচ নগরবাসীর সরাসরি উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করে সিটি কর্পোরেশন। নগরীর প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের কাছে প্রকল্প পাঠিয়েছিল সিটি কর্পোরেশন। ফিজিবিলিটি স্টাডি করে তার ভিত্তিতে প্রকল্প পাঠানো হয়। আবার চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ( সিডিএ ) ও প্রকল্প পাঠায় একই সমস্যা নিয়ে। তবে, কোনরূপ ফিজিবিলিটি স্টাডি না করেই তাদের এই প্রকল্প। সিডিএ’র প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছে। অথচ কোন ফিজিবিলিটি স্টাডি ছাড়াই এদের প্রকল্প। গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ শুরু থেকে ফ্লাইওভার নির্মাণের বিপক্ষে। সিডিএ যেসব প্রকল্প গ্রহণ করছে সেগুলোতে সাধারণ মানুষ তেমন উপকৃত হচ্ছে না বলে তিনি মনে করেন। ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে একটি সেমিনারে বাক বিত–ায় জড়ান তিনি ও ডা. আফছারুল আমীন ফ্লাইওভারের পক্ষ বিপক্ষ নিয়ে। ডা. আফছারুল মন্ত্রীর দিকে তেড়ে যান। একসময় মহিউদ্দিন চৌধুরী ও ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এই দুই প্রবীণ নেতা মিলে সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের বিরোধিতা করেছিলেন। এখন এই দুই নেতা মিলে বর্তমান মেয়রের বিরোধিতা করছেন। প্রথম দিকে তারা সিডিএ’র ফ্লাইওভার নির্মাণের ঘোর বিরোধী ছিলেন। নগরীর ফুটপাথ হকারমুক্ত করার জন্য উদ্যোগ নেয় সিটি কর্পোরেশন। ডোর টু ডোর আবর্জনা সংগ্রহেরও কর্মসূচি রয়েছে সিটি কর্পোরেশনের। এ দু’টি নিয়ে বিষোদগার করেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ। সিটি কর্পোরেশনের বর্ধিত হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে মামলা দায়ের করেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। অবশ্য বর্ধিত হোল্ডিং ট্যাক্স সরকারকেও অজনপ্রিয় করে তুলেছে। নগরবাসী চরম বিক্ষুব্ধ বর্ধিত হোল্ডিং ট্যাক্সে।
বহদ্দারহাটে ফ্লাইওভার দুর্ঘটনার পর সিডিএ চেয়ারম্যান ছালামের ফাঁসি দাবি করেছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী । বর্তমানে মহিউদ্দিন চৌধুরী এসব নিয়ে কোন নেতিবাচক কথা বলেন না। অপরদিকে মন্ত্রী মোশাররফ আরো বড় ফ্লাইওভার তথা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের অনুমোদন দিয়েছেন। গণপূর্ত মন্ত্রণালয় পাঁচলাইশে উদ্যান নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। তাতে বাধা দিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। ডিসি হিলে উদ্যান করতে চাইলে সেখানে বাধা দিয়েছিলেন জেলা প্রশাসন। একইভাবে আগ্রাবাদে পার্ক করার উদ্যোগেও আপত্তি করে সিটি কর্পোরেশন। মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রাম–১১ আসনের সাংসদ এম আবদুল লতিফের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃতির অভিযোগ তুলে লালদীঘি মাঠে বলেছিলেন যে ‘কেউ যদি লতিফকে মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করে এবং তাতে যদি তিনি মারা যান, তাহলে আমাকে হুকুমদাতা হিসেবে হত্যা মামলায় এক নম্বর আসামি করা যাবে।’ গত ১০ এপ্রিল লালদীঘি মাঠে এক সমাবেশে তিনি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে খুনি আখ্যা দিয়েছিলেন। পরদিন সংবাদ সম্মেলন করে আবারও আ জ ম নাছির উদ্দীন একাধিক খুন করেছেন বলে দাবি করেন মহিউদ্দিন। পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলররা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রয়াত স্ত্রী শাহেদা মহিউদ্দিন হত্যার বিচার দাবি করেন।
এবারে হজে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের ডেকে মত বিনিময়কালে মহিউদ্দিন চৌধুরী উল্লেখ করেন যে ‘কথাবার্তায় মনে হয় নাছির রাষ্ট্রপতির চেয়েও বড়।’ হজ থেকে ফেরার পর নিজদলের নেতাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন বলে তিনি ঘোষণা দেন। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের এ ধরনের অনৈক্য, পারষ্পরিক রেষারেষি, কোন্দলের জেরে এভাবে চট্টগ্রামের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সিটি কর্পোরেশন পাচ্ছে না নগরীর জন্য কাক্সিক্ষত বরাদ্দ। রাস্তা–ফুটপাত উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, খালা–নালা খনন ও জবরদখলমুক্ত–করণ হচ্ছে না। আর নগরবাসী পদে পদে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি : চেম্বার সভাপতি
চিটাগাং চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম–এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ প্রসঙ্গে বললেন, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী এই দূরবস্থা অনাকাক্সিক্ষত। প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সমন্বয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। সড়ক দূরবস্থার কারণে অর্থনৈতিক কর্মকা– বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিনিয়োগ বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এ অঞ্চলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আগ্রহ হারাচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। সিটি কর্পোরেশনকে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যথাযথ বরাদ্দ প্রদান করা প্রয়োজন। গত ৩০ জুলাই ২০১৭ ইং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ২০১৭–২০১৮ অর্থবছরের জন্য ২ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে যার মধ্যে উন্নয়ন খাতে ১২শত ২৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ বাজেট মূলত সরকারের অনুদান নির্ভর। অন্যদিকে সিটি কর্পোরেশনের বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজনিয়তা রয়েছে তা না হলে কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবে না। এ ব্যাপারে সিটি কর্পোরেশনের মেয়রকে সরকারের সাথে আলোচনা করে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সিটি কর্পোরেশনের বরাদ্দ বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। তাছাড়া জনপ্রতিনিধিদের চট্টগ্রামকে এ সমস্যা হতে বাঁচাতে কার্যকরী উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন । নগরীর জনপ্রতিনিধিদেরকে এ ধরণের কাজের সাথে সম্পৃক্ত হতে হবে এবং সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ ক্ষেত্রে কাংক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব হবে বলে মনে করেন চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম। বি এন আর, ১৪ অক্টোবর ২০১৭। – দৈনিক পূর্বকোণ এর প্রতিবেদন।

মতামত...