,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

চট্টগ্রামে জয়িতা’ সম্মাননা পেলেন ৫ অকুতোভয় নারী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ৪মে, বিডিনিউজ রিভিউজ.কম::নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছেন যে নারী! তিনি আজমিরি বেগম। নির্বাচিত হয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতাদের একজন। বড় দুই ভাই এবং পরবর্তীতে শাশুড়ি, দেবর ও স্বামীর হাতে নির্যাতিত হওয়ার পর কৃষি কাজ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

‘আমার চার বছর বয়সে বাবা মারা যান। আমি, মা ও আর এক বড়বোনকে দুই ভাই ঠিকমত খাওন দিতো না। সারাদিন মারধর করতো। বাড়ির কাজ করতে গিয়ে মালিকরা বড় বোনের গায়ে আগুন দেয়। আমাকে জোর করে ১৫ বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দিল। তিনটি কন্যা সন্তান জন্মের পর ১৬ বছর স্বামীর সাথে কাটানোর পর শুরু হলো নির্যাতন। স্বামী, শাশুড়ি ও দেবরের নির্যাতন শুরু হলো। স্বামীকে তালাক দিয়ে আলু কোল্ড স্টোরে কাজ নিলাম। নানাজনে নানা কথা বলতেন। কৃষি কাজ করে বড় মেয়েকে বিয়ে দিলাম। বর্তমানে ৫০ লাখ টাকা মূল্যের ১০ শতক জায়গার মালিক আমি। এখন আলু ক্ষেত ও সবজি চাষ করি।’

এভাবে নিজের জীবনের দুঃসহ স্মৃতি এবং সোনালী সাফল্যের কথা বর্ণনা করেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতাদের একজন আজমিরি বেগম।

জীবন সংগ্রামে সফল নারীদের প্রতীকী নাম ‘জয়িতা’। সব দেশে সব যুগে যারা সংগ্রাম করেছে তারাই জয়িতা।

২০১৬ সালের চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলার ৫৫ জন জয়িতার মধ্য থেকে পাঁচ ক্যাটাগরিতে পাঁচজনকে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উদ্যোগে নগরীর ষোলশহরের এলজিইডি সম্মেলন কক্ষে গতকাল বুধবার সকালে তাদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

এতে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী হিসেবে ‘জয়িতা’ নির্বাচিত হয়েছেন কক্সবাজার সদরের আয়শা সিরাজ, শিক্ষা ও চাকরিতে সাফল্য অর্জনকারী কুমিল্লা দাউদকান্দির মোসা. রহিমা আক্তার, সফল জননী নারী খাগড়াছড়ি উপজেলার মহালছড়ির হ্নলাক্রাপ্রু মারমা, চাঁদপুরের আজমিরি বেগম ও সমাজ উন্নয়নে অবদান রাখা নারী ক্যাটাগরিতে ফেনী সোনাগাজীর অধ্যাপিকা পান্না কায়সার।

পুরস্কার হিসেবে পাঁচজন শ্রেষ্ঠ জয়িতা পেয়েছেন ক্রেস্ট, সনদপত্র এবং দশ হাজার টাকার চেক। পুরস্কার তুলে দেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি।

এ সময় জয়িতাদের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়ে মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, ‘আমার সব বোনেরাই জয়িতা। নারীদের মধ্যে যখন প্রাণশক্তি, আত্মশক্তি ও পরিশ্রম করা ব্রত তৈরি হয়, তখন তার সাফল্য আসবেই। বাধা-বিপত্তি, অত্যাচার, খারাপ আচরণের ভাগাভাগির ভাগটা নারীদের ক্ষেত্রে বেশি জুটে পুরুষের চাইতে। পুরুষ শাসিত সমাজে মেয়ে হয়ে জন্মানোর কারণে বাধা-বিপত্তি ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়। নারীকে সফলতা অর্জন করতে হলে পুরুষের চাইতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার দিয়ে গিয়েছিলেন। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চান এদেশের প্রতিটি নারী দক্ষতা অর্জন করুক। নারী-পুরুষ যখন সমান অধিকার অর্জন করবে, তখন আমাদের দেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে।’

জয়িতার উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে আমি মন্ত্রী, আগামীতে আপনিও মন্ত্রী হতে পারবেন। আপনাদের আমরা সে পথ তৈরি করে দিতে চাই। পুরুষরা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। নারীরা এখনো পিছিয়ে আছে। শিক্ষার অভাব ও দারিদ্র তাদের কঠিন জায়গায় নিয়ে গেছে। তাই বর্তমান সরকার নারী শিক্ষার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। দারিদ্র বিমোচনে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’

তিনি পুরুষদের উদ্দেশে বলেন, ‘নারীরা এগিয়ে গেলে আপনারা পিছিয়ে যাবেন, একথা ভাববেন না। নারী এগিয়ে গেলে পুরুষের অনেক সমস্যার সমাধান হবে। পরিবারে অর্থ উপার্জন হবে। আয় বৃদ্ধি পাবে। নারীদের জন্য আপনাদের হাতটা বাড়িয়ে দেন।’
মেহের আফরোজ বলেন, ‘প্রাইমারিতে শিক্ষায় ৮০ ভাগ পুরস্কার পাচ্ছে মেয়েরা। সরকার তাদের সুযোগ দিয়েছে, তারা সে সুযোগ কাজে লাগিয়েছে। ৪০ লাখ নারী গার্মেন্টসে শ্রমিকের কাজ করছে। কিন্তু আমরা চাই, আগামীতে চারশ নারী গার্মেন্টসের মালিক হবে। তারা অন্যদেরকে চাকরি দেবে।’

তিনি জানান, মন্ত্রণালয় থেকে আড়াইশ কোটি টাকার একটি প্রজেক্ট পাশ হয়েছে, যেখানে সারা বাংলাদেশে গাড়ি চালানো, মোবাইল সার্ভিসিংসহ ১৮টি গ্রেডে নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। যে কাজের কথা নারীরা কখনো ভাবেনি, সেই কাজে তাদেরকে দক্ষ করে তুলবো। মোবাইল ঠিক করার জন্য পুরুষরা নারীর কাছে আসবে। জয়িতা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ঢাকায় একটি ১৪তলা ভবনের ভিত্তি স’াপন করবেন প্রধানমন্ত্রী। চারটি বিভাগে জয়িতাদের জন্য জায়গা পাওয়া গেছে। যেখানে জয়িতাদের তৈরি জিনিস বিক্রির সুযোগ করে দেওয়া হবে। বাংলাদেশে দুই কোটি নারীকে বিভিন্ন কাজে লাগানো হবে। দুই কোটি নারী যখন কাজে হাত লাগাবে, তখন বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে বাধ্য।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. রুহুল আমীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপসি’ত ছিলেন সংসদ সদস্য ওয়াসিকা আয়শা খান, সাবেক সংসদ সদস্য বেগম হাসিনা মান্নান, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহিন আহমেদ, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার শঙ্কর রঞ্জন সাহা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. সামসুল আরেফিন, স’ানীয় সরকার পরিচালক (চট্টগ্রাম) দীপক চক্রবর্তী, এনজিও কর্মী জেসমিন সুলতানা পারু প্রমুখ।

মতামত...