,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

চট্টগ্রামে ভয়াবহ ক্যানসার ঝুঁকিতে শিশুরা ১মাসেই ৬০২ জন হাসপাতালে

বিশেষ সংবাদদাতা, বিডিনিউজ রিভিউজঃ চট্টগ্রামে ক্যানসার আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাত্র ৮ মাসে ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ২২৯ জন। এরমধ্যে শিশু সার্জারি বিভাগে সলিড টিউমারে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ৬৭ জন এবং হেমাটোলজি ও অঙ্কলজি বিভাগে ব্লাড ক্যানসারসহ অন্যান্য ক্যানসার আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ১৬২ জন। এদের মধ্যে এ যাবৎ অন্তত ৪৫ জন শিশু মারা গেছে।

বুধবার পর্যন্ত চমেকের এ দুটি বিভাগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি আছে আরো ১৯ শিশু। তবে চমেক হাসপাতালে ভর্তির এ সংখ্যার বাইরে আরো অনেক শিশু ক্যানসার ঝুঁকিতে আছে বলে চিকিৎসকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে শিশুদের পাশাপাশি চট্টগ্রামে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের মাঝেও ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। শুধু গত জুলাই মাসে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে চমেক হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৬০২ জন। প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৪/৫ জন করে ক্যানসার আক্রান্ত রোগী ভর্তি হচ্ছেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগ ও শিশু হেমাটোলজি এ্যান্ড অঙ্কলজি বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। চিকিৎসকরা বলছেন, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞের অভাবে চট্টগ্রামে শিশু ক্যানসারে চিকিৎসা সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপিকা তাহমিনা বানু বলেন, চট্টগ্রামে ক্যানসার আক্রান্ত রোগী ও শিশুর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। শিশুরা যতটা না জন্মের পর ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে তার চেয়ে বেশি কিন্তু জন্মগতভাবেই। তার অন্যতম কারণ গর্ভবতী মায়েরা ক্যানসারের জীবাণু বহন করছেন। সেজন্য মায়েদের দূষিত খাবার, অত্যাধিক ফাস্টফুড গ্রহণ, লাইফস্টাইল পরিবর্তন, মানসিক দুশ্চিন্তা, পরিবেশ-প্রতিবেশগত সমস্যাকে দায়ী করেন তিনি। শিশুদের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়া কীভাবে বোঝা যাবে এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. তাহমিনা বলেন, হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া, সর্বদা জ্বর থাকা, শরীরের কোথায় ব্যথা তা শনাক্ত করতে না পারাসহ নানাবিধ অস্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তন শিশুদের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ।

 চমেক সূত্রে পাওয়া শিশুদের ক্যানসার আক্রান্তের পরিসংখ্যান তুলে ধরে চট্টগ্রামে ক্যানসারের ভয়াবহতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডা. তাসনীম আরা বলেন, বাংলাদেশে ফুড আইটেমের কারণে মানুষ অধিকাংশ রোগের শিকার হচ্ছেন। আমাদের দেশে ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করার সুযোগ খুবই অপ্রতুল। তিনি বলেন, দেশে রোগীদের শরীরে কোন ধরণের ক্যানসার হচ্ছে তার কোন গবেষণা নেই। মলিক্যুলার লেভেলে ক্যানসার রোগ তেমন ডায়াগনোসিস করা সম্ভব হয়নি। ডা. তাসনীম আরা বলেন, বিশ্বে প্রতিদিন ৪ জন শিশু ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। আর প্রতিবছর ১৫ বছরের কম বয়সী ১১ হাজার ৬০০ শিশু ক্যানসারের ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২৩ মিলিয়ন ক্যানসার রোগী আছে। আর প্রতি ৯ জনে ১ জন বর্তমানে ক্যানসার ঝুঁকিতে রয়েছে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি ৩ জনে ১ জন ক্যানসারে আক্রান্ত হবে। সুতরাং শিশুদের মধ্যে ক্যানসার সচেতনতা বাড়ানোর এখনই উপযুক্ত সময় বলে দাবি করেন তিনি। অন্যদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হলেও ক্যানসর চিকিৎসায় তেমন কোন কার্যকর অগ্রগতি নেই। আর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও ক্যানসার বিষয়ে দক্ষ বিশেষজ্ঞ না থাকায় মানসম্মত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন চট্টগ্রামবাসী। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জালাল উদ্দিন আজাদীকে বলেন, চমেকে ক্যানসার মোটামুটি শনাক্ত করা গেলেও চিকিৎসা খুবই সীমিত। আমাদের হাসপাতালে দক্ষ চিকিৎসকের অভাব নেই তবে ক্যানসার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, ক্যানসার চিকিৎসায় তিন ধরণের পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। অপারেশন, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি। চমেকে অপারেশন ও কেমোথেরাপি স্বল্প পরিসরে হলেও ক্যানসারের সবচেয়ে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি হয় মূলত রেডিওথেরাপির মাধ্যমে। সেটি করতে গেলে কোবাল-৬০ টেলিথেরাপি নামে একটি মেশিনের দরকার। যা চমেক হাসপাতালে নেই। শীঘ্রই সেটি কেনার ব্যাপারে জোর চেষ্টা চলছে বলে জানান চমেক পরিচালক।
উল্লেখ্য, প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসকে শিশু ক্যানসার সচেতনতার মাস হিসেবে পালন করা হয়।

চমেক হাসপাতালের শিশু সার্জারি (পেডিয়াট্রিক) বিভাগে জনসচেতনতামূলক সেমিনারে বুধবার ক্যানসারের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের লজ এ্যাঞ্জেলসের সিডারস-সিনাই মেডিকেল সেন্টারের সার্জারি বিভাগের ফেলো এবং ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. তাসনীম আরা। এতে অন্যান্যদের মধ্যে চমেকের শিশু হেমাটোলজি ও অঙ্কলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নাছির উদ্দিন মাহমুদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মলিক্যুলার ও বায়োকেমেস্ট্রি বিভাগের শিক্ষক আবু সাদাত মোহাম্মদ নোমান ও ডা. শাকেরা আকতার উপস্থিত ছিলেন।

মতামত...