,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

চট্টগ্রামে রসায়নিক দুর্ঘটনাঃ কর্ণফুলী টানেলের নিরাপত্তা সুসংহত করার প্রশ্ন!

ammonia gassনিউজ ডেস্ক, বিডিনিউজ রিভিউজঃ কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে আনোয়ারা উপজেলার রাঙ্গাদিয়া এলাকায় মাত্র এক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে রয়েছে সাড়ে ২৭ হাজার টন অ্যামোনিয়া ধারণ ক্ষমতার চারটি ট্যাংক। সোমবার বিস্ফোরিত ট্যাংকটিতে অ্যামোনিয়া গ্যাসের পরিমাণ ছিল মাত্র দুইশ’ টন। এই অ্যামোনিয়া নিঃসরণে পরিবেশ-জীব বৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতির যে চিত্র আসছে তাতে যে কোন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিরাপত্তা সুসংহত করার বিষয়ে এখনই নানা চিন্তা শুরু হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত ছোট জায়গায় সাড়ে ২৭ হাজার টন অ্যামোনিয়া রাখার ট্যাংক সম্ভবত বিশ্বের আর কোথাও নেই। তারা এও বলছেন, অ্যামোনিয়া ট্যাংক থাকাটাই বিপদের কারণ বলা যাবে না, বড় কথা হচ্ছে সেগুলো কিভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে।

ammonia gass visporanসোমবার ২২ আগস্ট ডিএপি সার কারখানায় দুর্ঘটনার পর মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অ্যামোনিয়া ট্যাংকের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।

আনোয়ারার রাঙ্গাদিয়া এলাকায় বিসিআইসির মালিকানাধীন ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেটের (ডিএপি) পাশেই রয়েছে বহুজাতিক মালিকানার কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো), তার পাশে বিসিআইসির মালিকানার আরেক সার কারখানা চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)। সার উৎপাদনে কাফকোতে ২০ হাজার টন অ্যামোনিয়া গ্যাস ধারণ ক্ষমতার একটি, সিইউএফএলে ৫ হাজার টন ধারণ ক্ষমতার একটি ও ডিএপিতে ২ হাজার টনের একটি ও ৫শ’ টনের আরেকটি ট্যাংক আছে। এর মধ্যে ডিএপির পাঁচশ’ টন ধারণ ক্ষমতার ট্যাংকটি সোমবার বিস্ফোরিত হয়।

সার কারখানা পরিচালনার প্রকৌশলীরা জানান, সাধারণত কারখানাগুলোতে অ্যামোনিয়া স্টোরেজ ট্যাংকের পুরুত্ব্ব হয় ১৬-১৮ মিলিমিটার। সোমবার বিস্ফোরিত চীনা প্রযুক্তিতে তৈরি ডিএপির ট্যাংকটির পুরুত্ব ছিল মাত্র আট মিলিমিটার। তবে সিইউএফএল ও কাফকোর বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন তাদের ট্যাংক নিয়ম মেনেই যথাযথ পুরুত্বে বানানো। যা ভূমিকম্প, প্রাকৃতিক দুর্যোগেও দাড়িয়ে থাকার ক্ষমতা রাখে। তারপরও সোমবারের দুর্ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছেন প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা। কাফকো, সিইউএফএল, ডিএপি ছাড়াও নদীর ওপারের টিএসপি সার কারখানার মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) পদমর্যাদার চার কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি হতে যাচ্ছে । এই কমিটি সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশ, বাতাস ও পানিতে নি:সরিত অ্যামোনিয়া গ্যাসের পরিমাণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে বড় কোন বিপদে পড়তে না হয় সেজন্য করণীয় নির্ধারণে কাজ করবে।

কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী রাঙ্গাদিয়ার এমন এলাকায় সার কারখানাগুলো রয়েছে, যার পাশ দিয়েই তৈরি হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম কর্ণফুলী টানেল। আগামী অক্টোবরে ভিত্তি স্থাপিত হবে চীনের অর্থায়নে নির্মিত এই টানেলের। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন এই টানেল নির্মাণে সিইউএফএল গেট ও অপর পাড়ের ১৫ নম্বর ঘাট পয়েন্টে নদীর তলদেশে বসবে প্রশস্ত টিউব। তাতে নদীর ৩৫ মিটার নীচে নির্মিত হবে সাড়ে ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল। সেই সঙ্গে থাকবে ৬ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক। এই টানেলের অ্যালাইনমেন্ট হবে এয়ারপোর্ট থেকে কর্ণফুলী নদীর দুই কিলোমিটার ভাটির দিকে। টানেলের প্রবেশপথ হবে নেভি কলেজের কাছে এবং বহির্গমন পথ হবে সার কারখানার কাছে। টানেল নির্মাণ করা হবে ‘শিল্ড ড্রাইভেন মেথড’ পদ্ধতিতে। বিশাল এই কর্মযজ্ঞে সাড়ে ২৭ হাজার টন ধারণ ক্ষমতার অ্যামোনিয়া ট্যাংকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে কীভাবে? এ প্রশ্নে কাফকোর চিফ অপারেশন অফিসার (সিওও) আজিজুর রহমান চৌধুরী আজাদীকে বলেন, টানেল নির্মাণে সংযুক্ত বিশেষজ্ঞদের কাছেও আমরা জানতে চেয়েছি টানেল নির্মাণ কাজে ‘ভাইব্রেট’ (কম্পন) কতটুকু হতে পারে? এখনও জবাব আসেনি। জবাব পেলে সে অনুযাযী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে কাফকোতে ২০ হাজার টন অ্যামোনিয়া ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন ট্যাংক রয়েছে। বেশ কিছুদিন কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকায় ট্যাংকে মজুদ অনেক কমে এসেছে। তারপরও যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমরা সবসময় সতর্ক। ডিএপি দুর্ঘটনায়ও কাফকোর নিরাপত্তা টিম উদ্ধার অভিযান ও চিকিৎসা কার্যক্রমে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে।

সিইউএফএলের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) গোলাম মর্তুজা জানান, টানেলের একটি মুখ সম্ভবত সিইউএফএলের পাশ দিয়ে যাবে। টানেলের প্রাক সমীক্ষায় টানেল বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সিইউএফএলের বিশেষজ্ঞরাও যৌথভাবে কাজ করেছেন। সরকার যা করবে ভেবেচিন্তে করবে, এতে ঝুঁকি বা চিন্তার কারণ নেই। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে যে কোন ধরনের অনাকাঙিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে অ্যামোনিয়া ট্যাংক নিয়ে আমরা অনেক বেশি সতর্ক। বৃহস্পতিবারও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছি। সিইউএফএলের ৫ হাজার টন ধারণ ক্ষমতার ট্যাংকে বর্তমানে ২ হাজার টনের মত অ্যামোনিয়া আছে। ট্যাংকের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে, লোকবলও বাড়ানো হয়েছে।
ডিএপি’র মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) আলমগীর কবির বলেন, কর্ণফুলী তীরের চার সার কারখানার মহাব্যবস্থাপকদের নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি হচ্ছে। পরিবেশের ক্ষতি ও সার্বিক নিরাপত্তা বিষয়ে এই কমিটি কাজ করবে। ভবিষ্যতে যে কোন ধরনের বিপদ এড়াতে স্থায়ী সমাধানের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ১০ সদস্যের বিসিআইসির কমিটি কাজ করছে।

ডিএপি থেকে নি:সরিত অ্যামোনিয়া গ্যাসে পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি স্পষ্ট হলে তার আর্থিক হিসাব এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তাছাড়া দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে তা খতিয়ে দেখতে কাজ করছে বিসিআইসির টিম। শুধুমাত্র মৎস্য খাতে ক্ষতির একটি সরকারি হিসাব পাওয়া গেছে। উপজেলা মৎস্য বিভাগের মাঠ কর্মকর্তা জাহেদ আহমদ আজাদীকে জানান, মৎস্য খাতে এ পর্যন্ত ১ কোটি ২৭ লক্ষ ২০ হাজার টাকা ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৯২ দশমিক ৭১ একর আয়তনের ৬ পুকুর ও ৫ মৎস্যখামারে অ্যামোনিয়া গ্যাস মিশ্রিত পানি ঢুকে পড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫৫ জন চাষী। মারা গেছে ৩৫.৮০ মেট্রিক টন মাছ। এর মধ্যে ৬.৬০ টন চিংড়ি, ২৯.২০টন রুই জাতীয় মাছ রয়েছে।

মাছের এই ক্ষতির বাইরে বেশ কয়েকটি গরু মারা গেছে ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। আনোয়ারা উপজেলা চেযারম্যান তৌহিদুল হক চৌধুরী বলেন, স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যজীবী, কৃষক, পশুর খামারিসহ অন্যদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণের দাবি জানাচ্ছি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনকালে বুধবার শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুও বলেছেন, বিসিআইসি অতীতে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য সহযোগিতা করেছে। হিসাব নেয়া হচ্ছে। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে সাধ্যমত চেষ্টা করা হবে।

মতামত...