,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

চট্টগ্রামে ৫ মেঘা প্রজেক্টে অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচনের অপেক্ষা: আসছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিং পিং

karnofuli-tunnel-620x330বিশেষ সংবাদদাতা, বিডিনিউজ রিভিউজঃ বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান নিয়ামক শক্তি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিং পিং দীর্ঘ ৩০ বছর পর বাংলাদেশ সফরে আসছেন। আগামী ১৪ অক্টোবর দুদিনের জন্য বাংলাদেশ সফরে আসবেন তিনি। এর আগে ১৯৮৬ সালে চীনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লি শিয়াননিয়ান বাংলাদেশ সফর করেন। শি জিং পিং এর এই সফর দু‘দেশের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি বাংলাদেশ তথা চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ১০০ সদস্যের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলও বাংলাদেশ সফরে আসছেন। বাংলাদেশ এ সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বসহ দেখছে কারণ এ সময়ে কয়েক বিলিয়ন ডলারের কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা আছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক পাঁচটি মেগা প্রকল্পও রয়েছে।

চীনের কাছ থেকে বড় বড় প্রকল্পে বহুমুখী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চায় বাংলাদেশ। এজন্য সরকার ইতোমধ্যে ২৫টি বড় প্রকল্প বাছাই করেছে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীকে কেন্দ্র করে চীনের বড় ধরনের বিনিয়োগ আকর্ষণে আগ্রহী বাংলাদেশ। চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক ৫টি বড় প্রকল্পের মধ্যে কর্ণফুলী নদীর ওপর একটি টানেল নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই টানেলের পাশে একটি স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার প্রকল্পও রয়েছে। কর্ণফুলী নদীর তীরে চীনের বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলও গড়ে তোলা হবে। এখানে চীনের বিনিয়োগকারীরা বড় শিল্প গড়ে তুলতে পারবেন। চট্টগ্রামের সঙ্গে ঢাকার আরও একটি এক্সপ্রেস রেল লাইন নির্মাণের একটি প্রকল্পও হাতে নিচ্ছে সরকার। এর মাধ্যমে দ্রুত গতির ট্রেন চালানো হবে। এতে ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রামের যাতায়াতের দূরত্ব আরও কমে যাবে। এছাড়া রয়েছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৩০০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভ সড়ক ও উপকূল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প। এই প্রকল্পের কক্সবাজার থেকে শাপলাপুর পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। বাকিটুকু নির্মাণের প্রকল্প চলমান রয়েছে।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী তীরবর্তী এলাকায় (টানেলের কাছাকাছি) বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য চীনা বিনিয়োগকে বলা হচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা বৃহৎ বিদেশি আর্থিক প্রণোদনা। সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজটি চীনকে দেওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে এটি নির্মাণে আগ্রহ দেখিয়েছে ভারত। চট্টগ্রামের এসব মেগা প্রকল্প এখন চীনা প্রেসিডেন্টের অপেক্ষায়।

এর বাইরে আরও থাকছে আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রিপেইড মিটার প্রকল্প, মংলা বন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্প, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির উন্নয়ন, ঢাকা-সিলেট হাইওয়ে ফোর লেনে উন্নীতকরণ। এসব বিষয়গুলো দু’দেশের বাণিজ্য আলোচনার সময় তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, চীনা প্রেসিডেন্টের সফরকালে ২৫টি উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি ১৩টি চুক্তি ও সমঝোতা সইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা। চীনকে পাঠানো তালিকার মধ্যে কমপক্ষে দুটি বাণিজ্যিক চুক্তি এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এ প্রকল্প দুটি হলো ‘ডেভেলপমেন্ট অব ন্যাশনাল আইসিটি ইনফ্রা নেটওয়ার্ক ফর বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ফেজ-৩ এবং কনস্ট্রাকশন অব টানেল আন্ডার দ্য রিভার কর্ণফুলী।’ কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিতব্য দেশের প্রথম এ টানেলটি যৌথভাবে উদ্বোধন করবেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও চীনা প্রেসিডেন্ট। কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের পাশাপাশি একই দিন উদ্বোধন হবে আরেক স্বপ্নের প্রকল্প ‘চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’। জি টু জি পদ্ধতিতে আনোয়ারায় ৭৭৪ একর জমিতে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে ১৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে চায় চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। এতে ৩৭১ শিল্প-কারখানায় কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে ৫৩ হাজারের বেশি মানুষের। এই দুই প্রকল্পের মাধ্যমে আনোয়ারা-কর্ণফুলী এলাকা ঘিরে শিল্পায়নের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। টানেল ও বিশেষ শিল্পাঞ্চল পাল্টে দেবে পুরো এলাকার চেহারা। টানেল উদ্বোধনের দৃশ্য টেলিভিশনের মাধ্যমে সরাসরি দেখার সুযোগ পাবে দুই দেশের সাধারণ মানুষ। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি দুই দেশের সাধারণ জনগণের কাছেই একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে। যা দীর্ঘ মেয়াদে দুই দেশের জনগণকে আরও বন্ধুসুলভ করে তুলবে।

সূত্র জানায়, আনোয়ারার চীনা শিল্পাঞ্চলটিতে চীনের শতভাগ বিনিয়োগ থাকবে। সেখানে সরকারের ৩০ শতাংশ আর চীনা বিনিয়োগকারীদের ৭০ শতাংশ অংশীদারিত্ব থাকবে। এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে তৈরি পোশাক, রাসায়নিক, ফার্মাসিউটিক্যালস, টেলিযোগাযোগ, কৃষিনির্ভর শিল্প কারখানা, যন্ত্রপাতি, ইলেক্ট্রনিকস, টেলিভিশন, মনিটর,চিকিৎসা ও অপারেশনের যন্ত্র, প্লাস্টিক, আইটি ও আইটি সম্পর্কিত কারখানা গড়ে উঠবে। জানা যায়, এই প্রকল্পে ২৯১ একর খাসজমি ইতিমধ্যে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষকে (বেজা) হস্তান্তর করেছে জেলা প্রশাসন। আরও ৪৮৪ একর জমি অধিগ্রহণের কাজও প্রায় শেষ। অধিগ্রহণের জন্য ৪২০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

বেজা সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৩৯ কিলোমিটার, শহর থেকে ২৮ কিলোমিটার এবং শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকে ৪৬ কিলোমিটার দূরত্বে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল। জাহাজ নির্মাণ শিল্প, ইলেকট্রিক, ফার্নেস ও সিমেন্ট শিল্পকে প্রাধান্য দিয়ে এ বিশেষ অথনৈতিক অঞ্চলটি গড়ে তোলা হবে। এই অর্থনৈতিক জোনের কাজ ২০১৭ থেকে শুরু হয়ে শেষ হবে ২০২০ সালে। আনোয়ারায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে গড়ে তোলা হবে ৩৭১টি শিল্প-কারখানা। এরমধ্যে ২৫০টিই জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য বরাদ্দ থাকবে। অবকাঠামো উন্নয়নসহ প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করার জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। গত বছর জুনে চীন সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামে এই বিশেষ অর্থনেতিক ও শিল্প অঞ্চল স্থাপনের প্রস্তাব দেন। পরে এ বিষয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়।

চীনের প্রেসিডেন্টের এই সফরে দুদেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনারও চেষ্টা করবে সরকার। বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো সে লক্ষ্যে কাজ করবে। ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১০ কোটি ডলার। ওই বছরে বাংলাদেশ চীন থেকে আমদানি করে ১৩ কোটি ডলারের পণ্য। বিপরীতে বাংলাদেশ চীনে রফতানি করে মাত্র ৩ কোটি ডলারের পণ্য। গত আট বছরে বাণিজ্য ঘাটতি কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৯ কোটি ডলার। ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে গত ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত এই ৮ বছরে এই ঘাটতি হয়েছে। ওই সময়ে প্রতি বছরই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ও চীন একে অপরের অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। প্রতি বছর কয়েক লাখ চীনা নাগরিক বাণিজ্যিক ও এনজিও সংক্রান্ত কাজে বাংলাদেশে আসে। আবার বাংলাদেশ থেকেও এ সংখ্যা ব্যাপক গতিতে বাড়ছে। চীনা প্রেসিডেন্টের সফরে ২৫টি প্রকল্পে বড় অংকের অর্থায়নের ঘোষণা আসবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ। যার সুফল সরাসরি দেশের জনগণ পাবে। সম্ভাব্য চুক্তিসমূহ স্বাক্ষরিত হলে অর্থনৈতিক কারণেও দুই দেশের জনগণের মধ্যে লেনদেন আরও কয়েকগুণ বাড়বে। যাকে জনগণের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এছাড়া চট্টগ্রামে চীনা সংস্কৃতি কেন্দ্র নির্মাণেরও সম্ভাবনা আছে। যা দুই দেশের সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অন্যতম মাধ্যম হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মতামত...