,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

চট্টগ্রাম আদালাতে মাতৃত্বের টানে ২ মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ!

নিজস্ব প্রতিবেদক, ২৭ জুলাই, বিডিনিউজ রিভিউজ.কম::চট্টগ্রামের আদালাতে মাতৃত্বের টানে দু’জনেরই বুকফাটা আর্তনাদ। একজন সন্তান হারিয়ে ফিরে পাওয়ার আনন্দে! অন্যজন কাঁদছেন নিজের সন্তানের মতো করেই লালন,পালনকারী শিশুটিকে ফিরিয়ে দিয়ে কোল খালি হওয়ার কষ্টে!

এক বছর এক মাস বয়সী এক কন্যাসন্তানকে ঘিরেই এ কান্না। এ শিশুকে ১০ মাস বয়সেই ঘুমন্ত মায়ের পাশ থেকে চুরি করে নিজের জন্মদাতা মাদকাসক্ত পিতা। মাত্র ২৫ হাজার টাকায় শিশুটিকে বিক্রয় করে নিঃসন্তান এক দম্পতির কাছে। নিজের সন্তানকে বিক্রয়ের জন্য নানা গল্পের অবতারণা করেন তিনি। কিন্তু বিক্রি করেও শেষতক স্ত্রীর হাতেই ধরা পড়তে হলো স্বামীকে। অবশেষে আদালতের নির্দেশে শিশুটি প্রকৃত মায়ের কোলে ফিরে যায়।

বুধবার একটি মানবপাচার মামলার শুনানিশেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহ্নাজ রহমান এ শিশুটিকে তার আসল মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেন।

আসল মা ও পালক মার সাথে কথা বলে জানা যায়, চান্দিনার মো. আসলাম নামের এক ব্যক্তির সাথে কয়েক বছর আগে বিয়ে হয় নুসরাত জাহান (২০) এর সাথে। নুসরাত পোশাক শ্রমিক। আসলাম আগ্রাবাদ এলাকার একটি সিএন্ডএফ ফার্মে চাকুরি করতেন। বিয়ের পর সন্তান গর্ভে এলে নুসরাত জানতে পারেন তাঁর স্বামী মাদকাসক্ত। মাদকাসক্তির কারণেই তার চাকুরি খোয়া যায়। আর্থিক অনটনের মধ্যেও তার নেশা থেমে থাকেনি। নেশার জন্য স্ত্রী নুসরাতের বেতনের টাকা ছিনিয়ে নিতেন। এর মধ্যে এ দম্পতির কোলজুড়ে আসে এক কন্যাসন্তান। তার নাম রাখা হয় হাফসা মারজান। হাফসার জন্মের ৭/৮ মাস পর নুসরাত তার স্বামীকে টাকা দেয়া বন্ধ করে দেন। স্বামী নেশাগ্রস্ত তা নিশ্চিত হওয়ায় তাকে আর টাকা ছোঁয়াবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেন নুসরাত। এদিকে, নেশাগ্রস্ত স্বামীও কম যান না। তিনিও হুমকি দেন নুসরাতকে, ‘প্রয়োজনে তোমার সন্তানকে বিক্রি করে দেব।’ নুসরাত বলেন, আমি ভেবেছিলাম হুমকিটা টাকা আদায়ের জন্য দেয়া হয়েছে। সত্যি সত্যি যে বিক্রি করে দেবে তা স্বপ্নেও ভাবিনি। এ বছর ২৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় হাফসাকে নিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন নুসরাত। ঘুম থেকে জেগে দেখেন পাশে হাফসা নেই। এরপর স্বামী আসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনিও নুসরাতের সাথে কান্নাকাটি শুরু করেন। হন্তদন্ত হয়ে তিনিও দিনের পর দিন খুঁজতে থাকেন হাফসাকে। সহজ–সরল নুসরাতও স্বামীর কথায় বিশ্বাস করেন।

আসলাম ২৫ এপ্রিল হাফসাকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রয় করে দেন নিঃসন্তান দম্পতির কাছে। ওই দম্পতির বিয়ের ৬ বছরেও সন্তান না হওয়ায় পূর্ব পরিচিতের মাধ্যমে আসলামের কাছ থেকে কিনে নেয় হাফসাকে নগরীর ডবলমুরিং থানাধীন দেওয়ানহাট এলাকার বাসিন্দা চাকুরিজীবী মো. সেকান্দর ও রাশেদা আক্তার দম্পতি। জানতে চাইলে রাশেদা আক্তার পূর্বকোণকে জানান, ২৫ এপ্রিল এক পরিচিত লোকের মাধ্যমে আসলাম একটি শিশুকন্যা নিয়ে আসে আমাদের কাছে। আসলাম জানায়, নগরীর মেহেদীবাগ এলাকার একটি ডাস্টবিনে পিতৃমাতৃহীন এ শিশুটিকে তিনি কুড়িয়ে পেয়েছেন। শিশুটিকে লালন–পালন করা বা রাখার মতো তার কোন সুযোগ নেই।’ নিঃসন্তান এ দম্পতির সাথে আসলাম একটি চুক্তিও করেন। ১০ মাস বয়সী এ শিশুর নাম রাখা হয় মোবাশ্বেরা সাদাফ। নিজেদের সন্তানের মতো করেই লালন–পালন হতে থাকে শিশুটি।

বিভিন্ন সময় রাশেদা দম্পতির কাছে টাকা চাইতে শুরু করেন আসলাম। স্বল্প আয়ের এ দম্পতি একপর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে আসলামকে তাড়া করে। এদিকে, টাকা না পাওয়ার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে সন্তান বিক্রির বিষয়টি স্ত্রীর কাছে স্বীকার করেন আসলাম। এরপর নুসরাত হালিশহর আই ব্লকের বাসা থেকে ছুটে যান রাশেদাদের বাসায়। নুসরাত খুঁজে পান তার যক্ষের ধনকে। এবার দুই মায়ের মধ্যে শুরু হয় টানা–হেঁচড়া। সন্তানকে ফিরে না পেয়ে হালিশহর থানার শরণাপন্ন হন নুসরাত। মানবপাচার দমন আইনের ১০(২) ও ৮(২) ধারায় অভিযোগ এনে নিজের স্বামীসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পুলিশ আসলাম ও রাশেদার ভাই শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করে মঙ্গলবার আদালতে চালান দেন। আর গতকাল বুধবার শিশুটিকে উদ্ধার করেন। গতকাল রাশেদা, তার ভাই, তার স্বামীসহ বাকি ৪ জনকে আদালতে হাজির করেন।

আদালত দু’পক্ষের বক্তব্য শুনেন। রাশেদা স্বীকার করেন তারা শিশুটিকে ২৫ হাজার টাকায় কিনে নিয়েছেন। তারা জানতেন না এ শিশুর বাবাই শিশুটিকে বিক্রি করে দিয়েছেন।

আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে পোশাককর্মী নুসরাত বলেন, রাশেদার বিরুদ্ধে এখন আমার কোন অভিযোগ নেই। তিনি না জেনেই মা হওয়ার আশায় আমার সন্তানকে কিনে নিয়েছেন। তার কষ্টও আমি বুঝি। তিনি জামিনে গেলে আমার কোন আপত্তি নেই। বাকিরাও জামিনে গেলে আমার আপত্তি নেই। আমার অভিযোগ আমার স্বামীর বিরুদ্ধে। কিন্তু আমি আমার সন্তানকে ফিরে পেতে চাই। ওড়না দিয়ে চোখের জল মোছেন আর বলে যান।
আদালত নুসরাতের জিম্মায় ৪ অভিযুক্তের জামিন মঞ্জুর করেন। আর হাফসাকে আসল মা নুসরাতের জিম্মায় দেয়ার নির্দেশ দেন।
বাদিপক্ষের আইনজীবী তৌহিদুর রহমান খান পূর্বকোণকে বলেন, যারা এ শিশুটিকে কিনে নিয়েছিল তাদের কোনরূপ খারাপ মোটিভ ছিল না। তারা জানতো না এভাবে শিশু কিনে নেয় অপরাধ।

অভিযুক্তপক্ষের আইনজীবী পারভেজ আহাম্মদ খান চৌধুরী জানান, ৪ জনকে বাদির জিম্মায় আদালত জামিন দিয়েছেন। আর শিশুটিকে আমরা ফেরত দিয়েছি।

পুলিশ রাশেদাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করে। তার কোলে হাফসা। রাশেদা কাঁদছেন আর এক বছর একমাস বয়সী শিশুটি মায়ের চোখের জল মুছে দেয়। বিচারক এজলাসে উঠার আগে আদালত কক্ষের বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন দুই মা। দু’জনের চোখেই জল। আসল মা বারবার চেষ্টা করছিলেন হাফসাকে কোলে নেয়ার। কিন্তু এ তিনমাসেই নুসরাতকে ভুলে হয়ে গেছে হাফসা। নুসরাত যতই তাকে কোলে নিতে চান, হাফসা ততই আগলে ধরে পালক মা রাশেদাকে।

এ দৃশ্যে আদালত এলাকার প্রত্যক্ষদর্শী অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। অনেককে বলতে শোনা যায়, শিশুটি ভাগ্যবান। তার দুইজন মা।

মতামত...