,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

চট্টগ্রাম দেশে কৃষিখাতের নেতৃত্বে হারাচ্ছে

508
নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা,১৬, জানুয়ারি (বিডি নিউজ রিভিউজ ডটকম):বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম দেশে কৃষির নেতৃত্বে হারাচ্ছে। উৎপাদন ও ব্যয়ের সাথে বাজারমূল্যের সমন্বয় করতে না পেরে কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও  গ্রামীণ কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বাডেছে। সে অনুযায়ী কৃষি  উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে না। কৃষিনির্ভর এলাকাগুলোতে গড়ে ওঠা ইটভাটার কারণে ফসলি জমি নষ্ট ও উৎপাদন হ্রাস এবং পুরুষদের অতিমাত্রায় প্রবাসের প্রতি ঝুঁকে পড়ার কারণে এ অঞ্চলের কৃষিকাজ অবহেলিত হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি নগরায়ন ও ক্ষুদ্র শিল্পের প্রভাবে এখানে কৃষিকাজের প্রতি মানুষ দিনদিন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে পুরুষরা বিভিন্ন মজুরিভিত্তিক পেশায় জড়িত হওয়ার সুবাদে কৃষির নেতৃত্বে চলে এসেছে গ্রামীণ নারীরা। পুরুষের অনুপস্থিতিতে সংসারের বাড়তি আয়ের জন্য কৃষিকাজে কেউ কেউ জড়িয়ে পড়লেও অনেকে জীবনযাত্রার পরিবর্তিত মানের খাতিরে কৃষিকাজকে আস্থাবলে ফেলছেন। এক্ষেত্রে ধান চাষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রামে আমন ও বোরো ধানের চাষ উৎপাদন কমেছে প্রায় ১৮০ হেক্টর থেকে ২০০ হেক্টর করে। তবে আমনের চেয়ে বোরোর প্রতি বেশি আস্থা হারিয়েছেন কৃষকরা। সেক্ষেত্রে ধানের পরিবর্তে সবজি ও ফল চাষের প্রতি ঝুঁকছেন কৃষকরা।

508 সাম্প্রতিক কিছু পরিসংখ্যান বলছে, পুরুষের অনুপস্থিতিতে কৃষিক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ অভাবনীয় গতিতে বেড়ে চলেছে। এসব পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বর্তমানে দেশের প্রায় ৭৭ শতাংশ গ্রামীণ নারী কৃষি সংক্রান্ত কাজে জড়িত। কৃষিখাতে নারীর অবদান প্রায় ৬৬ শতাংশ। মোট নারী শ্রমশক্তির ৬৮ শতাংশই কৃষি, মৎস্য ও বনায়নের সাথে সম্পৃক্ত। গত এক দশকে কৃষি, মৎস্য,পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন ও বনায়ন প্রভৃতি কৃষিকাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১১৬ শতাংশ। বিপরীতে কৃষিতে পুরুষ শ্রমিকের অংশগ্রহণ কমেছে ১০.৪ শতাংশ। দেশের দুই কোটি ৫৬ লাখ কৃষি শ্রমিকের মধ্যে এক কোটি পাঁচ লাখ নারী শ্রমিক। এমনকি প্রতিবছর কৃষিতে নারী শ্রমিক বাড়ছে প্রায় এক শতাংশ হারে। এছাড়া দেশের জিডিপিতে নারীর ২০ শতাংশ অবদান রয়েছে। অথচ সেই অনুপাতে গ্রামীণ পর্যায়ে তেমন নারী উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে না। চট্টগ্রামের মতো কৃষিপ্রধান অঞ্চলে এ অবস্থা আরো ভয়াবহ। কৃষির সাথে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে কৃষি ও পল্লী ঋণের সুফল পাচ্ছে না প্রান্তিক চাষি ও নারী উদ্যোক্তারা। আবার নারী উদ্যোক্তাদের অনেকে শুরুটা কৃষির মাধ্যমে করলেও পরবর্তীতে কৃষির সাথে আর সম্পৃক্ত থাকছেন না। কৃষির মাধ্যমে সফলতা নিয়ে শঙ্কার পাশাপাশি এক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতেও অনাগ্রহবোধ করছেন তারা। ফলে কৃষিক্ষেত্রে নারী উদ্যোক্তা হারানোর পাশাপাশি এ অঞ্চলের কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।

বর্তমানে গ্রামীণ নারীরা এখন সাধারণ কৃষি কাজের বাইরে নানা ধরনের উদ্ভাবনীমূলক কর্মেও যুক্ত হচ্ছেন। তারা এখন বিনা পারিশ্রমিকের কৃষিকর্মী থেকে উদ্যোক্তায় পরিণত হতে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় তাদের প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন। এমতাবস্থায় পুঁজি ও পর্যাপ্ত কৃষি ঋণ প্রাপ্তি ব্যাহত হওয়ায় কৃষিতে নারী উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। অন্যদিকে কেবল মূলধন থাকলেই তা যে কোন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করাকে নিরাপদ মনে করছেন না নারী উদ্যোক্তারা। এ প্রসঙ্গে আনোয়ারা উপজেলার সফল নারী উদ্যোক্তা নূরীয়া ইয়াসমিন আজাদীকে জানান, ‘শুরুটা আমি কৃষি তথা পোল্ট্রি ফার্ম দিয়ে করেছিলাম। কৃষিতে আসলে নির্ভরতা খুঁজে পাই না। সেখানে নারীরা পুরুষদের কেবল সহযোগী হয়েই থাকতে হয়। স্বতন্ত্রভাবে কিছু করার সুযোগ মিলে না। তাই এসব ঝুঁকি না নিয়ে আমি নকশী কাঁথার প্রতি মনযোগী হয়েছি। বর্তমানে আমার আগ্রাবাদে দু’টি শো-রুম রয়েছে।’ গ্রামীণ কৃষিতে নারী উদ্যোক্তা তৈরি না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানে উৎপাদন খরচ,বাজারজাতকরণ ও ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তিতে কোন নিশ্চয়তা নেই। তার উপর পুঁজি ও ঋণ প্রাপ্তি একটা বড় ফ্যাক্টর। যা গ্রামের তুলনায় নগরে পেতে অনেকখানি সহজ। তাছাড়া এখানে চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি থেকে বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা উদ্যমী নারীদের জন্য সহযোগিতাও পাওয়া যায়।

চট্টগ্রামের কয়েকটি উপজেলার কৃষি কর্মকর্তাদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, উৎপাদনের পরিমাণ ও খরচের সাথে সমন্বয় করতে না পেরে অনেক কৃষক ধান চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। গত পাঁচ বছরে এসব উপজেলায় গড়ে ২০০ হেক্টর থেকে ২২০ হেক্টর করে জমিতে ধান চাষ কমিয়ে দিয়েছেন কৃষকরা। তবে এসব কৃষিজমিতে মৌসুমি সবজি, ফল, মাছ চাষ ও পোল্ট্রি ফার্ম করে সফলতার মুখ দেখছেন তারা। এ প্রসঙ্গে হাটহাজারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল্লাহ ওয়াহেদ আজাদীকে বলেন, ২০১১-১২ মৌসুমে এখানে ১১ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে আমন এবং ৫ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ করা হতো। কিন্তু এবার আমনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ হাজার হেক্টর এবং বোরোর লক্ষ্যমাত্রা ৫ হাজার হেক্টর। অর্থাৎ আমনে প্রায় একশো এবং বোরোতে অন্তত ২০০ থেকে ২৫০ হেক্টর জমিতে ধানের চাষাবাদ হ্রাস পেয়েছে। কৃষকরা এখন খরপোষের চিন্তা করে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আনা যায় না এমন ভাবনা থেকে এখানে সবজি চাষ ও বনজ-ফলদ গাছ লাগানোর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। চলতি বছর শুধুমাত্র সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০০ হেক্টর বলেও জানান তিনি। সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খাজানুর রহমান বলেন,এই অঞ্চলটি মূলত ব্যবসায়ী এলাকা। তাই এখানে চাষাবাদে তেমন আগ্রহী লোকের সংখ্যা কম। আর এখানকার অধিকাংশ কৃষকই বর্গাচাষী। তিনি বলেন, গত চার বছর আগেও বোরোতে এখানে ৮ হাজার হেক্টরে চাষাবাদ হতো। যা বর্তমানে ৬ হাজার ৫০০ হেক্টরে নেমে গেছে। অন্যদিকে গেলো বছরে আমনের চাষাবাদ হয়েছে ১২ হাজার ১৫০ হেক্টর এবং বোরোতে ৬ হাজার ৫০০ হেক্টর। অথচ চলতি মৌসুমে আমনে চাষাবাদের আওতা ১১ হাজার ৬৮০ হেক্টর আর বোরোর জন্য ৬ হাজার ৩২৫ হেক্টর। অন্যদিকে গতবছর সবজি চাষ হয়েছিলো ১ হাজার ১০০ হেক্টরে আর এবার হয়েছে ১ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে। শুধুমাত্র চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলের হাটহাজারী কিংবা দক্ষিণাঞ্চলের সাতকানিয়া উপজেলা নয় ধান চাষের এমন চিত্র রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, ফটিকছড়ি, বাঁশখালী, আনোয়ারাসহ অধিকাংশ উপজেলায়।

জানা যায়, সাম্প্রতিক কোন পরিসংখ্যান না থাকলেও ২০১৩ সাল পর্যন্ত এক হিসাবে সারাদেশে মোট নারী উদ্যোক্তা রয়েছে ৪১ হাজার ৬৯৫ জন।শুধু ২০১৩ সালে নারী উদ্যোক্তা বেড়েছে ৩ হাজার ৩১৭ জন। এ উদ্যোক্তাদের মাঝে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণ বিতরণ করেছে ৩৯৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। প্রসঙ্গত, কৃষক ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য ও পুষ্টি ঘাটতি মেটানোর জন্য সরকার কৃষি খাতে ব্যাপক ভর্তুকি এবং ঋণ সুবিধা দিচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জন্য কৃষি ও পল্লী ঋণ খাতে মোট ১৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ঋণ বরাদ্দ করা হয়েছে। গবাদি-পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন,মাছচাষ, পানের বরজ তৈরি, গরু মোটাতাজাকরণ ইত্যাদি নানা খাতে এই ঋণ বিতরণের কথা রয়েছে। কিন্তু পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে গ্রামীণ নারীদের কৃষি ঋণ বিতরণ বেশ জটিল হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনার মুখোমুখি করছে জামানত ইস্যু। এই জামানত নিতে গিয়ে নানামুখী সমস্যায় পড়ছেন কৃষকরা। ভূমি অফিস থেকে জমি খারিজ করতে সময় এবং অবৈধ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন প্রান্তিক কৃষকরা। চট্টগ্রামে নারী উদ্যোক্তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ ইতোমধ্যে নারীদের কাজের ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে সামাজিক বাধা অনেকটাই দূর হয়েছে। বর্তমানে কৃষিকাজের পাশাপাশি বুটিকস হাউস, বিউটি পার্লার, নকশী কাঁথাসহ বিভিন্ন প্রতিনিধিত্বমূলক কাজে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। এমনকি চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহায়তায় নারীরা এখন রপ্তানিকারক পণ্য তৈরিতে মনযোগী হচ্ছেন। তবে এক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার পাশাপাশি ঋণ সুবিধা প্রাপ্তি সহজীকরণ করা হলে আরো এগিয়ে যাবে এমনটাই প্রত্যাশা করছেন চট্টগ্রাম নারী উদ্যোক্তারা।

গ্রামীণ পর্যায়ের মানুষকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে জানাতে ভ্রাম্যমাণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করতে যাচ্ছে সরকার। গ্রামের শিক্ষার্থীসহ যুবকদের বিশেষায়িত বাসের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তির প্রশিক্ষণ দেবে আইসিটি বিভাগ। বিশেষায়িত ছয়টি বাস আগামী মার্চে গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে প্রশিক্ষণের কাজ শুরু করবে।

মতামত...