,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

চট্টগ্রাম নগরীতে টিউশন মিডিয়ার অভিনব প্রতারণা!

নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ রিভিউজঃ  চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জাহাঙ্গীর আলম জিইসি মোড় এলাকায় একটি মেসে থাকেন। ফেইসবুকের সূত্র ধরে একটি টিউশন মিডিয়ার মাধ্যমে তিনি বহদ্দারহাট এলাকায় ৩ হাজার টাকা বেতনের একটি টিউশনি পান। চুক্তি অনুসারে টিউশনিতে যোগদানের আগে ওই টিউশন মিডিয়াটিকে প্রথম মাসের বেতনের ৬০ ভাগ অর্থাৎ ১৮০০ টাকা অগ্রিম দিয়ে দেন জাহাঙ্গীর। তার ধারণা ছিল প্রথম মাসের বেতন থেকে তা উঠে যাবে। প্রথম দিন টিউশনিতে গিয়ে শিক্ষার্থী ও পরিবারটির সাথে পরিচিত হয়ে আসলেন জাহাঙ্গীর। মেসে আসার পর রাতে টিউশনি থেকে ফোন করে জাহাঙ্গীরকে জানানো হল তাদের গৃহশিক্ষক লাগবে না!
জাহাঙ্গীরের মাথায় যেন বাজ পড়ল। সাথে সাথে টিউশন মিডিয়ার ভাইটিকে ফোন করলেন। কিন্তু সেখান থেকে ফোন ধরে না। জাহাঙ্গীর বুঝতে পারলেন তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

শুধু জাহাঙ্গীর নন, তার মত এভাবে প্রতিনিয়ত টিউশন বা টিটার্স মিডিয়ার অভিনব প্রতারণার শিকার হচ্ছেন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়-য়া মধ্যবিত্ত পরিবারের টিউশনি প্রত্যাশী শিক্ষার্থীরা। সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে গেছে এসব মিডিয়ার প্রতারণার মাত্রা। এসব মিডিয়া টিউশনি দেওয়ার নামে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন, দেয়ালে, বিদ্যুতের খুঁটিতে পোস্টারিং করে। পরে টিউশন প্রার্থীদের কাছ থেকে সদস্য ফি’র নামে টাকা নিয়ে সটকে পড়ে। নগরীতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী হাত খরচ ও পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য টিউশনি করে থাকেন।
নগরীর চকবাজার, আগ্রাবাদ, হালিশহর, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, ষোলশহর, খুলশী, পাহাড়তলী, জিইসি মোড়, দুই নম্বর গেট, বহদ্দারহাট, নিউমার্কেটসহ কয়েকটি এলাকায় অসংখ্য টিউশন মিডিয়া গড়ে উঠেছে।

নগরীর প্রতিটি অলিগলিতেই দেয়ালে, বিদ্যুতের খুঁটিতে ‘শিক্ষক দিচ্ছি-নিচ্ছি’ নামের পোস্টার হরহামেশাই চোখে পড়ে। তবে বর্তমানে এসব মিডিয়া টার্গেট করেছে ফেইসবুক ব্যবহারকারীদেরকে। ফেসবুকে ফেইজ বা গ্রুপ খুলে তারা শিক্ষার্থীদেরকে প্রলোভনে ফেলে। ফেইসবুকেই রয়েছে ২৫-৩০টি টিউশন মিডিয়া গ্রুপ।

ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমি কেমন পড়াই সেটা না জেনে তারা কিভাবে আমাকে বিদায় করে দেয়? এক মাস পড়ালে কথা ছিল। এক দিনে তো বোঝা যায় না, টিচার ভালো কি-না? এটা তো টিউশন মিডিয়ারই কারসাজি। তারা আমার মতো অনেক শিক্ষার্থীকে প্রতারিত করছে। অনেক কষ্টে ১৮০০ টাকা যোগাড় করেছিলাম। অভিভাবকদেরকে ম্যানেজ করে তারা এসব প্রতারণা করতে পারছে। আরেজনের কাছ থেকে কমিশন নিয়ে তাকে একই টিউশনি দিয়ে দিচ্ছে। টিউশন মিডিয়ার ভাইয়েরা অভিভাবকদেরকে বলেন, আপনার সন্তানের জন্য আরও ভালো একজন শিক্ষক পেয়েছি। উনাকে বিদায় করে দেন। অভিভাবকরাও কোন যাচাই-বাছাই না করে শিক্ষদের বিদায় করে দেন।

জাহাঙ্গীর আরো জানান, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়-য়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আছেন। তারা পড়ালেখার খরচ চালাতে টিউশনির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু টিউশন মিডিয়াগুলো সেই সুযোগটা শেষ করে দিচ্ছে। বাধ্য হয়ে টিউশন মিডিয়া থেকে টিউশনি নিতে হয়।

জাহাঙ্গীর বলেন, ‘এসব মিডিয়ার লোকজন রাজনীতির সাথে জড়িত। তাদের অনেক ক্ষমতা। অনেক টিউশন মিডিয়ার নাম, ঠিকানা, অফিস নেই। টিউশনি প্রত্যাশী শিক্ষার্থী বাড়ার সাথে সাথে তাদের সিস্টেমও পরিবর্তন করে ফেলেছে এসব মিডিয়া। আগে টিউশনির বেতন পাওয়ার পর বেতনের ৬০ ভাগ তাদেরকে দিতে হত। কিন্তু এখন বেতন পাওয়ার আগেই তাদেরকে ৬০ ভাগ টাকা দিয়ে দিতে হয়। টিউশন মিডিয়া না থাকলে আমরা আরও বেশি টিউশনি পেতাম। তারা সব দখল করে ফেলেছে।’
অনেক শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, এসব টিউশন মিডিয়াতে ২০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা জমা দিয়ে সদস্য ফরম পূরণ করতে হয়। টিউশনি পাওয়ার পর প্রথম মাসের ৬০ ভাগ টাকা তাদের টিউশনিতে যোগ দেওয়ার আগে দিয়ে দিতে হবে।
জানা গেছে, নগরীতে এরকম শতাধিক টিউশন মিডিয়া আছে।

শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, টাকা দেয়ার পর সেই টিউশনি আর পাওয়া হয়না। কয়েকবার যোগাযোগ করে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয় ভুক্তভোগীদের। আবার কেউ কেউ টিউশনি পেয়েছেন ঠিকই, তবে যে পরিমাণ টাকা দেয়ার কথা ছিল, দেয়া হচ্ছে তার অর্ধেক।

অনেক টিউশনিতে ৫ দিন, ১০ দিন বা ১৫ দিন না যেতেই শিক্ষকদের পড়াতে যেতে নিষেধ করেন। কারণ জানতে চাইলে তারা সংশ্লিষ্ট টিউশন মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে বলা হয়। এভাবে এসব প্রতিষ্ঠান প্রতিনিয়ত মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ঠকাচ্ছে, হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা। আবার তারা এক মাসের জন্য অফিস ভাড়া নিয়ে টিউশনি প্রত্যাশীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাচ্ছে।

এসব টিউশন মিডিয়ার বিরুদ্ধে আরও একটি অভিযোগ হচ্ছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের এলাকায় ব্যবসায় করতে হলে যে ট্রেড লাইসেন্স নিতে হয়, সেটাও তাদের নেই।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে চকবাজারের ‘টিচার্স মিডিয়া’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘৬০ ভাগ টাকা আগে দিয়ে দিতে হয় সেটা সত্য। তবে এক মাসে আগে টিউশনি চলে গেলে আমরা সে টাকা ফেরত দেই।’

লাইসেন্স সম্পর্কে জানতে চাইলে এ ব্যক্তি বলেন, ‘না, আমরা সিটি করপোরেশন থেকে কোনো লাইসেন্স নিইনি। আমাদের প্রতিষ্ঠানটি আমরা সবেমাত্র শুরু করেছি।’

এসব টিউশন মিডিয়ার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া যায় কি-না জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাহবুব হাসান বলেন, ‘মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা যারা টিউশনির ওপর নির্ভরশীল তারা এ প্রতারণা শিকার হচ্ছে। এটা তো এক ধরনের ফৌজদারি অপরাধ। কিন্তু এর সাথে শিক্ষা বোর্ডের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রতারণার ব্যাপার হয়ে থাকলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারতাম। আমি মনে করি এটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপার। তারা যদি এসব প্রতিষ্ঠানকে খুঁজে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়, তাহলে ভালো হয়।’

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এ ব্যাপারটা আমাদের নজরে নেই। কেউ যদি টিউশন মিডিয়া থেকে প্রতারণার শিকার হয়, তাহলে সে সেটা নিকটস’ থানায় অভিযোগ জানাতে পারে। পুলিশই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিবে।’

মতামত...