,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

চট্টগ্রাম নগরীর যানজট নিরসন ও পরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে একগুচ্ছ সুপারিশ

dewanhatনিজস্ব প্রতিবেদন, বিডিনিউজ রিভিউজঃ চট্টগ্রাম মহানগরে পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফেরাতে গঠিত কমিটির প্রথম বৈঠক আজ। বৈঠক ঘিরে নগরবাসী, নগরবিদ আর পরিবহন সেক্টরের সাথে সংশ্লিষ্টদের মাঝে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। শৃঙ্খলা ফেরাতে এসব মহল থেকে নানা সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ক্রসিংসমূহে বাস-বে তৈরি, কাউন্টারভিত্তিক বাস ও হিউম্যান হলার চালু, হকার উচ্ছেদ, ব্যাটারি চালিত রিকশা আর রেজিস্ট্রেশনবিহীন প্যাডেল চালিত রিকশা উচ্ছেদ, রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজি ট্যাক্সি ও টমটম উচ্ছেদ, জেলার রেজিস্ট্রেশনভুক্ত সিএনজিগুলোর মহানগরে প্রবেশে বিধিনিষেধ, নামীদামি কয়েকটি স্কুলের শিক্ষার্থী, ডায়াগস্টিক সেন্টারের ডাক্তার আর রোগীদের প্রাইভেট কার পার্কিংয়ে কড়াকড়ি, হালিশহর ও বন্দর এলাকায় সড়কের উপর লং ভেহিকল পার্কিং বন্ধ করা। এসব সমস্যার সমাধান হলে নগরীর পরিবহন সেক্টরে নৈরাজ্য দূর হবে বলে মত প্রকাশ করেন তারা। পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে গঠিত কমিটির সদস্য সচিব ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সম্মেলন কক্ষে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে যানজট সমস্যা ও কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত হবে।

সিএমপি ট্রাফিক বিভাগের টিআই (সদর-উত্তর) কানু চন্দ্র বিশ্বাস জানান, বেলা ১২টায় ছোট পরিবহন মালিক শ্রমিকদের সাথে আলোচনা হবে। এরপর দুপুর ১টায় আলোচনা হবে গণপরিবহনসহ অন্যান্য বড় পরিবহনের সংশ্লিষ্টদের সাথে। সংশ্লিষ্টরা জানান, নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কসমূহে বাস-বে তৈরি করা জরুরি। প্রতিটি ক্রসিংয়ের ৫০ গজ দূরে এসব বাস-বে তৈরির পাশাপাশি তা ব্যবহারের জন্য বাস ও হিউম্যান হলারকে বাধ্য করতে হবে। এর সাথে কাউন্টারভিত্তিক বাস ও হিউম্যান হলার ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা গেলে নগরবাসী এর সুফল পাবে। যেসব এলাকায় বাস-বে জরুরি যেসব এলাকার মধ্যে রয়েছে শাহ আমানত সেতুর গোলচত্বর, রাহাত্তার পুল, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ষোলশহর, জিইসি মোড়, ইস্পাহানী মোড়, টাইগারপাস, দেওয়ানহাট মোড়, চৌমুহনী, বাদামতল, বারিক বিল্ডিং মোড়, কাস্টম, সল্টগোলা, ইপিজেড মোড়, বিএম ঈসা খাঁ গেট, বড়পোল, হাক্কানি মোড়, অলংকার মোড়, এ কে খান মোড়, কর্নেলহাট, চকবাজার অলি খাঁ মসজিদ মোড়, গুলজার মোড়, আন্দরকিল্লা মোড়, কোতোয়ালী মোড়, নিউ মার্কেট মোড় এবং বিআরটিসি।

কাউন্টারভিত্তিক গণপরিবহন : নগরবাসীর সুবিধার্থে কাউন্টারভিত্তিক গণপরিবহন পরিচালনা জরুরি বলে মত দিয়েছেন নগরবিদরা। তারা জানান, ২০১১ সালে ট্রাফিক বিভাগের তৎকালীন উপ-পুলিশ কমিশনার ফারুক আহমেদ প্রতিটি রুটে কাউন্টারভিত্তিক গণপরিবহন চালু করেন। কিন্তু দুয়েকটি পরিবহন সংগঠনের নেতৃবৃন্দের অসহযোগিতার ফলে ওই ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়। এবার চসিক ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ট্রাফিক বিভাগ ওই ব্যবস্থায় ফিরে গেলে বাস্তবায়ন সহজ হবে এবং নগরবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরবে বলে তারা মনে করেন।

হকার উচ্ছেদ : নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে হকাররা তাদের পসরা সাজানোর ফলে ওইসব এলাকার পথচারীদের সড়ক ব্যবহার করতে হয়। আবার কোথাও কোথাও রাস্তার উপরও হকাররা পসরা সাজিয়েছেন। এর ফলে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সমাগমের ফলে সড়কগুলোতে যানজট বেশি থাকে। এরকম যানজটপ্রবণ এলাকা হলো বাকলিয়ার শাহ আমানত সেতুর গোলচত্বরের আশপাশ থেকে চামড়া গুদাম, চান্দগাঁও এলাকার বহদ্দারহাট এলাকার চারপাশ, কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে কালুরঘাট, পাঁচলাইশের ষোলশহরের চারপাশ, ক্রসিং থেকে বেবি সুপার মার্কেট, জিইসির মোড় থেকে গোলপাহাড়, কোতোয়ালীর চেরাগী পাহাড় থেকে আন্দরকিল্লা হয়ে লালদীঘির পাড়, কোর্ট বিল্ডিং ওঠার প্রবেশ মুখ থেকে সিডিএ ভবন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মুখ, নিউ মার্কেট থেকে তিন পুলের মাথা, নিউ মার্কেট থেকে বিআরটিসি টার্মিনাল, নিউ মার্কেট থেকে সিটি কলেজ মোড়, সিইপিজেড এলাকা থেকে বন্দর টিলা, ডিইটি রোডের ঈদগাঁ কাঁচাবাজার থেকে দেওয়ানহাট, অলংকার মোড়, কর্নেলহাট ও এ কে খান মোড়, ডবলমুরিং এলাকার গাউছিয়া মার্কেট, বাদামতলী পর্যন্ত হকার ব্যবস্থা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আগ্রাবাদের বাদামতলী এলাকায় মোটর পার্টসের দোকানের কারণে প্রাইভেট গাড়ি রাস্তায় পার্কিং করে পার্টস সংযুক্ত ও মেরামতের কাজ চালানোর ফলে যানজটের সৃষ্টি হয়।

ব্যাটারি চালিত রিকশা : ব্যাটারি চালিত রিকশা চলাচল কাগজে কলমে বন্ধ হলেও এখনো এসব রিকশা নগরীর অলি গলিতে চলাচল করছে। সুযোগ পেলেই উঠে আসছে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে। এর ফলে হচ্ছে যানজট। এসব রিকশাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে সিন্ডিকেট। এলাকাভিত্তিক সিন্ডিকেটের নির্দিষ্ট পরিমাণের চাঁদা পরিশোধ করেই চলাচল করছে এসব রিকশা। এসব কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটে।

নগরীর কোথাও কোথাও ট্রাফিক পুলিশ এসব রিকশা আটক করলেও সিন্ডিকেটের সদস্যরা পুলিশের কাছ থেকে তা ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। নগরীর বায়েজিদ, চান্দগাঁও, লালখান বাজার, বাস্তুহারা, পাঠানটুলী, চৌমুহনী এলাকায় এসব রিকশা ও সিন্ডিকেটের আধিপত্য বেশি।

রেজিস্ট্রেশনবিহীন প্যাডেল রিকশা : রেজিস্ট্রেশনবিহীন প্যাডেল রিকশার প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে সঠিক তথ্য নেই কারো কাছে। সিটি কর্পোরেশন নির্দিষ্ট পরিমাণ রিকশার লাইসেন্স প্রদান করলেও এর প্রকৃত সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। অতিরিক্ত অনুমোদনহীন এসব রিকশা যানজটের অন্যতম কারণ। এ কারণে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অনুমমোদনহীন প্যাডেল এবং ব্যাটারি চালিত রিকশা সরাসরি ডাম্পিং করার সুপারিশ করা হয়।

রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজি ট্যাক্সি : নগরীতে চলাচলের জন্য ১৩ হাজার সিএনজি ট্যাক্সির রেজিস্ট্রেশন দেয়া হলেও বিভিন্ন অজুহাতে চলাচল করছে ৩০ হাজারের বেশি সিএনজি ট্যাক্সি। রেজিস্ট্রেশনবিহীন এসব সিএনজিকে ঘিরে কয়েকটি গ্রুপ প্রতি মাসে কোটি টাকার বাণিজ্য করছে বলে অভিযোগ আছে। উচ্চ আদালতের মামলা থাকায় ট্রাফিক বিভাগ এসব সিএনজির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারছে না। মামলার সুযোগে এসব সিএনজি যত্রতত্র ট্রাফিক আইন অমান্য করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

টমটম ও গ্রাম সিএনজি : কাগজে কলমে বিদ্যুৎখেকো টমটম উচ্ছেদ হলেও নগরীর কয়েকটি এলাকায় ব্যাটারি চালিত রিকশার মতোই চলাচল করছে টমটম। এর মধ্যে কাঠগড়, চকবাজার, নবাব সিরাজউদ্দৌলা রোড, কালামিয়া বাজার অন্যতম। এছাড়া নগরীতে চারটি প্রবেশমুখে রয়েছে জেলার রেজিস্ট্রেশনভুক্ত সিএনজি ট্যাক্সির অবৈধ স্টেশন। এসব স্টেশন পরিচালিত হয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। দৈনিক ভিত্তিতে দিতে হয় সিন্ডিকেটের সদস্যদের চাঁদা। নগরীতে প্রবেশের চার প্রবেশ মুখ কাপ্তাই রাস্তার মাথা, শাহ আমানত সেতুর গোল চত্বর, কর্নেলহাট ও অক্সিজেন এলাকায় এসব স্টেশন যানজটে যানবাহন স্থবির হয়ে পড়ে।

বন্দরে প্রবেশে একটি গেটের বদলে কয়েকটি গেট খুলে দেয়া, নির্দিষ্ট স্থানে ট্যাংক লরি ও কন্টেনার মুভার পার্কিংয়ে বাধ্য করা এবং সড়কের উপর এসব গাড়ি পার্কিং বন্ধে প্রশাসনের কঠোর হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এসব বিষয়ে পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন করা হলে যানজটের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব বেলায়েত হোসেন বেলাল জানান, পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফেরাতে করণীয় নির্ধারণ করতে কমিটির পক্ষ থেকে সভা আহ্বান করা হয়েছে। সভায় যোগদানের আমন্ত্রণ পেয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, বৈঠকে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের বিষয়ে আলোচনা হবে।

মতামত...