,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান এখন ৭৬তম, এক বছরে ১১ ধাপ এগিয়ে: নৌ-পরিবহনমন্ত্রী

b1নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ রিভিউজঃ শিপিং বিজনেস বিষয়ক দৈনিক লয়েড লিস্টে পাকিস্তানের করাচি ও আমেরিকার bহিউস্টন সমুদ্র বন্দরকে পেছনে ফেলে চট্টগ্রাম বন্দরের ১১ ধাপ এগিয়ে আসাকে সরকারের অন্যতম সাফল্য বলে দাবি করেছেন নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। তিনি বলেন, এক বছরে ১১ ধাপ এগিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান এখন ৭৬তম। তবে যখন আমরা ক্ষমতা গ্রহণ করি তখন ছিল ৯৮তম। ওই হিসেবে বলা যায়, বর্তমান সরকারের আমলে ২২ ধাপ এগিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। আর সবকিছুই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বের কারণে।

তিনি গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২টায় চট্টগ্রাম বন্দরের শহীদ মো. ফজলুর রহমান মুন্সী অডিটোরিয়ামে লয়েড লিস্টের সনদ হস্তান্তর ও মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম খালেদ ইকবালের হাতে লয়েড’স লিস্টের বাংলাদেশ সমন্বয়ক ক্যাপ্টেন জিল্লুর রহমান স্বীকৃতির সনদ তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন সাফল্য তুলে ধরতে গিয়ে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী আরো বলেন, বিএনপি আমলে খালেদা জিয়া লোকসানের অজুহাতে মংলা বন্দরকে গলা টিপে হত্যা করেছিল। আমরা এখন সে মংলা বন্দর থেকে ৬৫ কোটি টাকা লাভ করেছি।

এনসিটি গেট-৩ এবং সিএফএস শেড উদ্বোধন : এর আগে মন্ত্রী সকাল সাড়ে দশটায় চট্টগ্রাম বন্দরের নবনির্মিত এনসিটি গেট-৩ এবং সিএফএস শেড উদ্বোধন করেন। এসময় মন্ত্রী বলেন, গত আট বছরে চট্টগ্রাম বন্দর উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বন্দরের উন্নয়নে সরকারের নানা গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে বন্দর এগুচ্ছে। তিনি আরো বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বন্দরের কী অবস্থা ছিল তা সবাই জানেন। তখন বন্দর উপদেষ্টা কমিটি পাঁচ বছরে এক কি দুটি সভা করেছিল। আমরা নিয়মিত সভা করছি। এ পরিষদের পরামর্শে আমরা অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। আমাদের সরকার বন্দরে সিটিএমএস, ভিটিএমআইএস চালু করেছে। ওয়াটার সাপ্লাই ভ্যাসেল সংগ্রহ করেছে। অ্যাম্বুলেন্স শিপ নিয়েছে। ৩০-৪০ হাজার টিইইউস ধারণক্ষমতার ইয়ার্ড তৈরি করেছে। ৫৯টি হ্যান্ডলিং ইক্যুইপমেন্ট সংগ্রহ করেছে। টাগবোট, মাল্টিপারপাস ড্রেজার কিনেছে। প্রশিক্ষণের জন্যে সিম্যুলেটর চালু করেছে। গাড়ির জন্যে আধুনিক শেড তৈরি করেছে। অকশন শেড তৈরি করেছে। ডক শ্রমিকদের জন্য হাসপাতাল করেছে।

নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান আরো বলেন, যারা দেশকে ভালবাসেনি, দেশের চেয়ে ও মানুষের চেয়ে নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখেছে, তারাই বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার চেয়ে পিছিয়ে নিয়ে গেছে। তারা সম্পদ গড়ে বিদেশে অর্থ পাচার করেছে এবং বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রচেষ্টা করেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গত আট বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ উন্নতির দিকে বহুদূর এগিয়ে গেছেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, চার জোট সরকারের আমলে জিডিপি যেখানে ছিল ৪ দশমিক ৮, এখন সেই জিডিপি ৭ দশমিক ১ এ উন্নীত হয়েছে এবং ৫২৭ ডলার থেকে মাথাপিছু আয় ১৪৬৬ ডলারে উন্নীত হয়েছে। যে বাংলাদেশকে গরিব রাষ্ট্র বলা হত, তার জায়গায় এখন আমরা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি। খালেদা জিয়া সরকারের আমলে যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ৩ হাজার ৭শ মেগাওয়াট, সেখানে বর্তমানে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করে ৮ থেকে সাড়ে ৮ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন হচ্ছে। খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে এখন খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। এখন আমদানি নয় বরং খাদ্যশস্য রপ্তানি করছে বাংলাদেশ।

অনুষ্ঠানে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী পাকিস্তানকে জঙ্গিবাদের মদদদাতা রাষ্ট্র আখ্যা দিয়ে বলেন, পাকিস্তান এখনো ষড়যন্ত্র করছে। সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এখনো মাঝে-মধ্যে চিমটি কাটে। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি হলে পাকিস্তানের কেন গাত্রদাহ হয়? ওরা উদ্বেগ প্রকাশ করে। তিনি বলেন, যে বাংলাদেশ পাকিস্তানের অংশ ছিল, সেই বাংলাদেশ এখন খাদ্যশস্য রপ্তানি করে। আর পাকিস্তান জঙ্গি রপ্তানি করে।

তিনি বলেন, আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের ৪৫ বছর পরও অনেকে পাকিস্তানের প্রেম ভুলতে পারেননি। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ক্রিকেট খেলার সময় তারা পাকিস্তান সাপোর্ট করে। যে দেশ আমাদের মানুষ মারল, মা-বোনদের ওপর নির্যাতন করল, তাদের যারা সমর্থন করে তারা নির্লজ্জ। একটি কথা আছে যে জোড়ায় তার পোড়ায়। তাই পাকিস্তানের অপতৎপরতায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজনের পোড়ায়। তিনি বলেন, পাকিস্তান যে দেশের বিরুদ্ধেই খেলুক তাদের সমর্থন করা যাবে না।

বন্দর শ্রমিকদের ভাতা ৩০০ থেকে বাড়িয়ে ৮০০ করেছেন উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কঠোর পরিশ্রম করে বন্দরকে এগিয়ে নিচ্ছেন। অবশ্যই প্রণোদনা দেওয়া উচিত। এ ব্যাপারে অর্থমন্ত্রীকে বুঝিয়ে বলব। তিনি অনুমোদন দিলে প্রণোদনা দেওয়া হবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, রাজনীতিকসহ বন্দর সংশ্লিষ্ট সবাইকে সংকীর্ণতা পরিহার করে দেশের স্বার্থে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে এসে প্রধানমন্ত্রীর হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। তিনি বলেন, বন্দরের কাজে কোনো রাজনীতি থাকতে পারবে না। এক মিনিটের জন্যেও চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ থাক, তা চাই না। আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, সরকারের সদিচ্ছা, মন্ত্রণালয়ের আন্তরিকতাসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বন্দরের আজকের অর্জন। এই অর্জন ধরে রাখতে হবে। সক্ষমতা না বাড়ালে ধরে রাখা সম্ভব হবে না। তিনি বে-টার্মিনাল প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যে লক্ষ্য পূরণের জন্য দেশ পরিচালনা করছেন, সেগুলো পূরণে অবশ্যই চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দেশের অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য বন্দরকে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর ভিশন ২০২১ বাস্তবায়ন করতে হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য এম এ লতিফ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের অর্জনে বন্দর এলাকায় জন্মগ্রহণকারী হিসেবে গর্বিত। বর্তমান সরকারের আমলে বন্দরের অবকাঠামোগত যে উন্নয়ন হয়েছে তার সুফল পাচ্ছি। এসময় তিনি পায়রা বন্দর নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, শুধুমাত্র চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি সার্ভ করা যাবে না। তাই আরো বন্দর দরকার। তিনি বলেন, যে পকিস্তান আমাদের বিরুদ্ধাচারণ করেছে, সেই পাকিস্তানের পক্ষ নিচ্ছে অনেক কুলাঙ্গার।

বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবাল বলেন, বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির ৯২ শতাংশ ও ৯৮ শতাংশ কন্টেনার হ্যান্ডলিং চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়। বাকি ২ শতাংশ মংলা বন্দর করে থাকে। আমাদের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। নয় মাসে সাড়ে ১৭ লাখ টিইইউস হ্যান্ডলিং হয়েছে। এ বছর ২২ লাখ টিইইউস ছাড়িয়ে যাবে। নতুন গেট ও শেডের কারণে ট্রেড ফ্যাসিলিটি ও নিরাপত্তা বাড়বে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ধারাবাহিক উন্নয়নের যে সাফল্যে তার স্বীকৃতি লয়েড’স লিস্ট। তিনি বলেন, এ বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১৮ লাখ টিইইউস কন্টেনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। আশা করছি আগামী বছরের ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে।

লয়েড’স লিস্ট প্রতিনিধি ক্যাপ্টেন জিল্লুর রহমান বলেন, লয়েড’স লিস্ট ১৭৩৪ সাল থেকে জাহাজ ও বন্দর বিষয়ক খবরাখবর নিয়ে সাপ্তাহিক কাগজ হিসেবে প্রকাশিত হয়ে আসছে। যা এখনো বন্ধ হয়নি। পরে সাপ্তাহিক থেকে দৈনিক হয়। ২০১৩ সালে হার্ড কপি ছাপানো বন্ধ করে অনলাইন ভার্সন প্রকাশ করা হচ্ছে। প্রতি বছর জরিপ করে শীর্ষ ১০০ কন্টেনার পোর্টের তালিকা তৈরি করে আসছে। ২০১৫ সালের কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দর ৭৬তম অবস্থানে রয়েছে। করাচি ৮০তম অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর যদি এবার ২ দশমিক ২ মিলিয়ন টিইইউস হ্যান্ডলিং হলে আগামী বছর ৭০ থেকে ৭২তম অবস্থানে চলে আসবে আশা করি।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার এএফএম আবদুল্লাহ খান বলেন, শুল্ক রাজস্বের ৭০ শতাংশ, দেশের মোট রাজস্বের ৩০ শতাংশ এ বন্দর থেকে আদায়ের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সাত বছর আগের তুলনায় চার গুণ বেশি রাজস্ব আদায় করা হচ্ছে।

সনদ হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, আবু রেজা নদভী, মোস্তাফিজুর রহমান, নজরুল ইসলাম ও শামসুল হক চৌধুরী, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এমএম তারেকুল ইসলাম প্রমুখ। নবনির্মিত এনসিটি গেট-৩ এবং সিএফএস শেডের উদ্বোধনকালে বন্দরের সদস্য কমডোর জুলফিকার আজিজ, চিটাগাং চেম্বারের পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ, বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী, জুনিয়র চেম্বারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নিয়াজ মোরশেদ এলিট, বন্দরের সচিব মো. ওমর ফারুক, সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার মো. রুহুল আমিন, জুনিয়র চেম্বারের ভাইস প্রেসিডেন্ট গিয়াস ফয়সাল।

মতামত...