,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

দেশের শাকসবজির বাজারে আগুন

vagit1বিশেষ সংবাদদাতা, বিডিনিউজ রিভিউজঃ শাকসবজির বাজারে স্বস্তি নেই ক্রেতার। দাম কমছেই না। জুলাইয়ে বন্যার সময় বাড়তে শুরু করা সবজির দাম গত তিন মাসেও কমেনি বরং দাম বেড়েছে সবজিভেদে ১২৫ শতাংশের বেশি। অথচ দেশে সবজির উৎপাদন বেড়েছে। বেড়েছে রফতানিও। সেই অনুপাতে উৎপাদন খরচ বাড়েনি। এমনকি বন্যা উপদ্রুত যে ১২ জেলার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে চাহিদার মাত্র ১০-১২ শতাংশ শাকসবজি উৎপাদন হয়। আর বন্যা উপদ্রুত জেলাগুলোয় শাকসবজির তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ধানের আবাদে। সুতরাং এ মুহূর্তে বাজারে শাকসবজির সংকট ও দাম বাড়ার কথা নয়।

উৎপাদন এলাকার কৃষকরাও এমন তথ্য দিয়েছেন। বন্যা হয়নি এমন এলাকার মধ্যে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের লিয়াকত আলী জানান, তার ওখানে বেগুন বিক্রি হচ্ছে ২৫-৩০ টাকা কেজি। আর জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার চরশিশুয়া গ্রামের কৃষক ওমর ফারুক জানান, তার ওখানে কেজিপ্রতি বেগুন ৪০ টাকা। অথচ সেই সেই বেগুন ঢাকায় বিক্রি হচ্ছে ৮০-৯০ টাকা। অর্থাৎ কেজিপ্রতি বেগুনের দাম বেড়েছে ৫৫-৬০ টাকা। অনুরূপভাবে অন্যান্য শাকসবজির দাম বাড়ারও তথ্য মিলেছে।

শুধু বেগুনই নয়, অস্বাভাবিক দাম বেড়েছে অন্যান্য শাকসবজিরও। রাজধানীর বাজারে বলতে গেলে ৭০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। সবচেয়ে বেশি দাম বেগুন কেজিপ্রতি ৮০-৯০ টাকা ও টমেটো ১০০-১২০ টাকা। আর সবচেয়ে কম দাম কচুমুখির, তাও কেজিপ্রতি ৪০-৪৫ টাকা। আর বাকি সবজিগুলোর দাম ৫০-৭০ টাকার মধ্যে।

তাহলে এ দাম বৃদ্ধি কেন—জানতে চাইলে কৃষিবিশেষজ্ঞ ও মাঠপর্যায়ের কৃষক এবং পাইকারি ব্যবসায়ীরা দুই ধরনের কারণ উল্লেখ করেছেন। কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী আসলাম তালুকদার বলেন, কোরবানির ঈদের আগে উত্তরবঙ্গের ১২ জেলায় বন্যা হওয়ার কারণে অনেক সবজিখেত নষ্ট হয়ে গেছে। বন্যার পর ওই এলাকার কৃষকরা এখনো শাকসবজি উৎপাদন করতে সক্ষম হননি। ফলে সরবরাহ কমেছে। আর সে সুযোগে সবজির দাম যে এলাকায় বন্যা হয়নি সেখানেও বেড়েছে এবং আমাদের বেশি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। যে পরিমাণ সবজি কেনার জন্য টাকা নিয়ে যাই, তার অর্ধেক সবজি কিনলে টাকা শেষ হয়ে যায়। সরবরাহ কম ও দাম বেশি হওয়াই সব মিলিয়ে দাম একটু বেশি।

কৃষক ও কৃষিবিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের অপর কৃষক আবদুর রহমান জানান, দেড় বিঘা জমিতে মুলা চাষ করেছেন। বাজারে নতুন মুলা বিক্রি করছেন। দামপ্রতি মণ ৮০০-১০০ টাকা, যা কেজিপ্রতি পড়ে ২০-২২ টাকা। এ ছাড়া অন্যান্যা সবজির দামও নাগালের মধ্যে রয়েছে। খরচ অনুযায়ী লাভ হবে কি না—জানতে চাইলে এই কৃষক বলেন, যে দামে বিক্রি করছি, এভাবে থাকলে লাভ হবে। তবে শীত মৌসুমে অন্যান্য সবজি বাজারে এলে দাম কিছুটা কমবে। তার পরও খরচ উঠে আসবে। তিনি আরো বলেন, গত বছর ছয় বিঘা জমিতে মুলা চাষ করেছি। প্রথমে ভালো দাম পেলেও পরে তা কমে যাওয়ায় লোকসান দিতে হয়েছে।

অর্থাৎ বাজারে শাকসবজির কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে ও উৎপাদন এলাকায় দাম বৃদ্ধির মিথ্যে অজুহাত দেখিয়ে এক ধরনের অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়ারা দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। মাঝখানে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক ও ক্রেতারা। কৃষকরা যেমন তার পণ্যের সঠিক মূল্য পাচ্ছে না, তেমনি অসহায় সাধারণ মানুষকেও কিনতে হচ্ছে চড়া দামে। বিশেষ করে আয়-ব্যয়ের বৈষম্য বেশি থাকায় শাকসবজির দাম নিয়ে বেশি দুর্ভোগে রাজধানীর মানুষ। সংসারের ব্যয় সংকুলান করতে গিয়ে প্রতিদিন তাদের খাদ্য তালিকায় শাকসবজির পরিমাণ কমছে।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, সরকারের উচিত বাজার যাচাই করে শাকসবজিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া। এরপর বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করলে ক্রেতারা সুফল পাবেন। বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের সরবরাহ যখন কয়েকজন ব্যবসায়ীর হাতে থাকে, তখন একচেটিয়া বাজার তৈরি হয়। দেশের বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ এখন কয়েকজন ব্যবসায়ীর হাতে। সেখানে সরকারেরর নিয়ন্ত্রণ নেই। বাজার মনিটরিং কমিটিগুলো নামকাওয়াস্তে। তারা কোনো কাজ করে না। ফলে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ান।

রাজধানীর শাকসবজির বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে এবং মাঠপর্যায়ের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে দাম বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে। দাম বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরতে রাজধানীর বাজার, বন্যামুক্ত এলাকা ও বন্যা উপদ্রুত এলাকার শাকসবজির বাজারের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও হাতিরপুল বাজারে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কোরবানির ঈদের আগে বেড়ে যাওয়া সব সবজির দাম এখনো কমেনি। বরং সবজিভেদে বেড়েছে। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের বেগুন কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৮০-৯০ টাকা, যা পাইকারি বাজারে ৫০-৬০ টাকা কেজি। পাইকারি বাজারে কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১২০-১৫০ টাকা, যা খুচরা বাজারে ১৬০-২০০ টাকায়। এ ছাড়া বরবটি বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজি দরে, যা পাইকারি বাজারে ৪০-৪৫ টাকা কেজি। কাঁকরোল খুচরা কেজিপ্রতি ৬০ টাকা ও পাইকারি ৪০-৪৫ টাকা। চিচিঙা পাইকারি বাজারে ৩৫-৪০ টাকা ও খুচরা বাজারে ৫০-৬০ টাকা। খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি ৫০ টাকার পটোল পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩০-৩৫ টাকা। ঝিঙা খুচরা কেজিপ্রতি ৪০-৪৫ টাকা ও পাইকারি বাজারে ৫৫-৬০ টাকায়। খুচরা কেজিপ্রতি ৬০ টাকার মুলা পাইকারি ৪০-৪৫ টাকা। টমেটো খুচরা কেজিপ্রতি ১০০-১২০ টাকা ও পাইকারি ৮০-৯০ টাকা। আলু পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা কেজি, খুচরা ২৫ টাকা কেজি দরে।

কিন্তু বন্যাকবলিত ও বন্যামুক্ত এলাকাগুলোর শাকসবজির বাজার থেকে জানা গেছে, সেখানে উৎপাদনের যেমন অভাব নেই, তেমনি দামও নাগালের মধ্যে। তার পরও রাজধানীতে আসা শাকসবজরি দাম বেড়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে বন্যাকবলিত জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার শাকতোরা ইউনিয়নের কৃষক সজ্জল জানান, বন্যায় সবজিখেত নষ্ট হয়ে গেছে। বন্যাপরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সবজি চাষ করেছেন তিনি। বেগুন, কাঁচামরিচ ও মুলা লাগিয়েছেন দুই বিঘা জমিতে। সবজিগুলো এখনো মাঠে রয়েছে। বেগুন বিক্রির উপযোগী হতে আরো এক মাস সময় লাগবে। এ ছাড়া মুলা বিক্রির উপযোগী হতে আরো ১৫-২০ দিন সময় লাগবে। সবজির দাম কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব ধরনের সবজির দাম মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মুলা বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২০-২৫ টাকা, বেগুন ৪০ টাকা কেজি। পটোল ও কাঁকরোল বিক্রি হচ্ছে ২৫-৩০ টাকা কেজি দরে। চিচিঙা বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা কেজি, বরবটি ৩০ টাকা ও কাঁচামরিচ ৫০-৬০ টাকা কেজি। অন্যদিকে, বন্যামুক্ত কুষ্টিয়ার দৌলতপুর এলাকার কৃষক লিয়াকত আলী জানান, তার এলাকায় বেগুন বিক্রি হচ্ছে ২৫-৩০ টাকা কেজি, পটোল কেজিপ্রতি ২০ টাকা, পেঁপে ৮-১০ টাকা, বরবটি ২০-২৫ টাকা কেজি, কাঁকরোল ১৫-২০ টাকা কেজি দরে। অন্যদিকে, দেশে শাকসবজির উৎপাদন বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ড. গোলাম রাব্বানী। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে দেশে চাহিদা অনুপাতে সবজির সংকট নেই। গত এক দশকে বাংলাদেশে সবজির আবাদি জমির পরিমাণ ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। একসময় ভালো স্বাদের সবজির জন্য শীতকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। টমেটো, লাউ, কপি বা নানা পদের শাক শীতকাল ছাড়া বাজারে মিলতই না। শ্রীষ্মকাল ছিল সবজির আকালের সময়। গত এক যুগে পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন প্রায় সারা বছরই ২০ থেকে ২৫ জাতের সবজি খেতে পারছে দেশের মানুষ। কৃষকরা সারা বছরই নানা ধরনের সবজির চাষ করছেন।

দেশে সবজির উৎপাদন যেমন বেড়েছে, ভোগও তেমনি বেড়েছে। গত এক যুগে দেশে মাথাপিছু সবজির ভোগ বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। পাশাপাশি সবজি রফতানি করেও মিলছে বৈদেশিক মুদ্রা। গত এক বছরে শুধু সবজি রফতানি আয়ই বেড়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। এখন দেশে ৬০ ধরনের ও ২০০টি জাতের সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। এসব সবজির ৯০ শতাংশ বীজই দেশে উৎপাদিত হচ্ছে।

মতামত...