,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

নজরদারি এড়াতে দেশের ৪১ ঘাটে ৯৬৬ নিত্য পণ্যবাহী লাইটারেজ জাহাজেই ভাসমান গুদাম

ship-lighterageনিউজ ডেস্ক, বিডিনিউজ রিভিউজঃ পণ্যের দাম বাড়াতে লাইটারেজ জাহাজকে ‘গুদাম’ বানিয়ে সাগর-নদীতে ভাসিয়ে রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। দেশের ৪১টি ঘাটে পণ্য নিয়ে ভাসছে ৯৬৬টি লাইটারেজ জাহাজ। ১৬ দিন থেকে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে ভাসছে জাহাজগুলো। এসব জাহাজে ডাল, চিনি, গমসহ বিভিন্ন ধরনের ১৬ লাখ টন পণ্য রয়েছে। পণ্য গুদামজাত করলে সরকারের নজরদারিতে পড়তে হয়। টনপ্রতি গুনতে হয় ৬০ থেকে ৬৫ টাকা ভাড়াও। তাই লাইটারেজ জাহাজের গোপন হ্যাজেই মাসের পর মাস পণ্য রাখছেন কিছু ব্যবসায়ী। এভাবে পণ্য ভাসিয়ে রেখে বাজার অস্থির করা হয়। পণ্যের দাম বাড়লে সুযোগ বুঝে আস্তে আস্তে লাইটারেজ থেকে পণ্য খালাস করেন তারা। এদিকে লাইটারেজ জাহাজকে এভাবে গুদাম বানানোয় ব্যাহত হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসের কার্যক্রম। চাহিদা মতো লাইটারেজ না থাকায় বন্দরের বহির্নোঙরে তৈরি হয়েছে পণ্যবোঝাই ৫৯ জাহাজের জট।

নিয়ম অনুযায়ী একটি লাইটারেজ জাহাজে পণ্য থাকার কথা সাত থেকে আট দিন। তবে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের ১৪ অক্টোবর তৈরি করা হিসাব অনুযায়ী, ১৬ দিন থেকে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে পণ্য নিয়ে ভাসছে ৯৬৬টি জাহাজ। এর মধ্যে ‘গুদাম’ হিসেবে ব্যবহৃত সর্বাধিক ১৫৮টি জাহাজ রয়েছে নারায়ণগঞ্জ ঘাটে। কর্ণফুলী নদীতে পণ্য নিয়ে ভাসছে ১৩৮টি জাহাজ। একইভাবে বাঘাবাড়ী ঘাটে ৬২টি,

নগরবাড়ীতে ৬৬টি, আলীগঞ্জ/নিতাইগঞ্জে ৫৭টি, এমআই সিমেন্ট ঘাটে ১২টি, বসুন্ধরায় ৮টি, কাঁচপুরে ৯৩টি, মিরপুরে ৩২টি, আকিজ সিমেন্ট ঘাটে ১টি, স্ক্যান সিমেন্ট ঘাটে ২টি, আনোয়ার সিমেন্ট ঘাটে ২টি, মেট্রো সিমেন্ট ঘাটে ১টি, শাহ সিমেন্ট ঘাটে ৬টি, সেভেন সার্কেল ঘাটে ৭টি, সিয়াম সিটি ঘাটে ৩টি, সিমেক্স ঘাটে ১টি, হোলসিম মেঘনা ঘাটে ৬টি, মীর সিমেন্ট ঘাটে ১টি, ভৈরব ঘাটে ১৬টি, আশুগঞ্জ ঘাটে ১৩টি, মেঘনা ঘাটে ৭টি, কাটপট্টি ঘাটে ১টি, খুলনার মংলা ঘাটে ৪২টি, নোয়াপাড়া ঘাটে ১২০টি, আবদুল মোনায়েম ঘাটে ৫টি, বরিশাল/ভোলা ঘাটে ৮টি, দাউদকান্দি ঘাটে ৩টি, ফরিদপুর (সিঅ্যান্ডবি) ঘাটে ৬টি, কাঞ্চন ঘাটে ৮টি, রূপগঞ্জ ঘাটে ৩টি, পায়রা ঘাটে ১টি, দাপা ঘাটে ২টি, ঝালকাঠিতে ২টি, পাগলা ঘাটে ৫টি, মোক্তারপুরে ১৯টি, জাফরগঞ্জে ৮টি, ছাতক ঘাটে ১টি, সিটি গ্রুপ ঘাটে ৩৪টি, দেশবন্ধু সুগার ঘাটে ৫টি, ফুলতলা ঘাটে ১টি লাইটারেজ অবস্থান করছে।

এদিকে পর্যাপ্ত লাইটারেজ না পাওয়ায় তিন মাস ধরে বন্দরের বহির্নোঙরে জট লেগে আছে বিদেশি জাহাজের। গত সোমবারও বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের জন্য অপেক্ষমাণ জাহাজ ছিল ৫৯টি। এর মধ্যে চাল, ডাল, গমসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী রয়েছে ১৩টি জাহাজে। এ ছাড়া চিনির তিনটি, লবণের তিনটি, জিআই ১৪টি, সিমেন্ট ক্লিংকারের ১৬টি জাহাজ ও অয়েল ট্যাঙ্কার ছিল তিনটি। ২৭ অক্টোবরের মধ্যে গম, তেল, চিনিসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে আরও ৪৪টি জাহাজ বন্দরে নোঙর করার কথা। এখন বহির্নোঙরে যে জাহাজ আছে, সেগুলোর কোনো কোনোটি অপেক্ষা করছে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে। ‘এএস ভার্জিনিয়া’ নামের জাহাজটি ৫৫ হাজার টন গম নিয়ে কুতুবদিয়ায় আসে ১১ সেপ্টেম্বর। সেখানে ১২ হাজার টন গম লাইটারেজ জাহাজে করে খালাস করতে এ জাহাজের সময় লেগেছে ১৮ দিন। ২৯ সেপ্টেম্বর জাহাজটি বন্দরের বহির্নোঙরে আসে। সেখানে আরও ১৬ হাজার টন গম খালাস করতে লাগে ১৬ দিন। ১৪ অক্টোবর বন্দরের জেটিতে জাহাজটি বার্থিং সুবিধা পেলেও গতকালও এ জাহাজে খালাসের অপেক্ষায় পণ্য ছিল ১৯ হাজার ৬৮ টন। এ পণ্য খালাস করতে আরও অন্তত সাত থেকে আট দিন লাগবে। সময় মতো লাইটারেজ পেলে এ জাহাজটি ১২ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করে ত্যাগ করতে পারত চট্টগ্রাম বন্দর। এটিকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে প্রায় দেড় মাস। চট্টগ্রাম বন্দরে বেশি গভীরতার জাহাজ সরাসরি নোঙর করতে পারে না। তাই বহির্নোঙরে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করে বন্দরের জেটিতে নোঙর করতে হয় বিদেশি জাহাজকে।

‘এএস ভার্জিনিয়া’ জাহাজের স্থানীয় শিপিং এজেন্ট মিউচ্যুয়াল গ্রুপ। এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারভেজ আহমেদ বলেন, ‘যথাযথ প্রক্রিয়ায় পণ্য খালাস করতে পারলে জাহাজটি বন্দর ত্যাগ করতে পারত ১০ থেকে ১২ দিনে। পর্যাপ্ত লাইটারেজ না থাকায় বন্দরের বহির্নোঙরেই এক মাস সময় বাড়তি লেগেছে। এ জন্য প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ হাজার ডলার বাড়তি গুনতে হয়েছে।’

জানা যায়, গুদামে পণ্য রাখতে যে পরিমাণ ভাড়া গুনতে হয় তার চেয়ে অনেক কম ভাড়া দেওয়া যায় লাইটারেজে। তাছাড়া লাইটারেজে পণ্য থাকলে গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিও এড়ানো যায়। এ প্রসঙ্গে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের প্রধান নির্বাহী মাহবুব রশীদ বলেন, গুদামে পণ্য রাখলে প্রতি টনে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা ভাড়া দিতে হয় মাসে। লাইটারেজ জাহাজে পণ্য রাখলে টনপ্রতি দিতে হয় মাত্র ১০ টাকা।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবাল বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে আসা খোলা পণ্যের ৭০ শতাংশেরও বেশি খালাস হয় বহির্নোঙরে। বেশি ড্রাফটের জাহাজগুলো লাইটারেজের মাধ্যমে বহির্নোঙরে কিছু পণ্য খালাস করে বন্দরের জেটিতে নোঙর করে। পর্যাপ্ত লাইটারেজ না থাকায় বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে প্রভাব পড়ছে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমেও।’

বাজারে চিনির দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। সরবরাহ কম থাকার অজুহাতে মিল মালিকরা দাম বাড়াচ্ছেন চিনির। খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে গত এক মাসে মণপ্রতি চিনির দাম বেড়েছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। অথচ লাইটারেজ জাহাজে ভাসা পণ্যের মধ্যে আছে চিনির কাঁচামালও। আছে ডাল, গম, ভুট্টা, কয়লা, পাথর, গলানো লোহা, সার এবং অন্যান্য পণ্যও। এ প্রসঙ্গে ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলেন, ‘কয়েকটি কারণে লাইটারেজ জাহাজ নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। বহির্নোঙরে প্রতি বছর আমদানি পণ্যের পরিমাণ ১৫ শতাংশ হারে বাড়লেও সে হারে বাড়ছে না লাইটারেজ। পাথর, কয়লার মতো অপ্রচলিত পণ্যও এখন আমদানি হচ্ছে। লাইটারেজের ঘাটে অবকাঠামোগত কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নও হয়নি। আবার কেউ কেউ লাইটারেজকে গুদাম হিসেবেও ব্যবহার করছে। এসব কারণে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে। বাড়ছে সৎ ব্যবসায়ীদের খরচ।’

  • সমকাল’র প্রতিবেদন। 

মতামত...