,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

নতুন নির্বাচন কমিশনার হলেন যারা

 টানা অপেক্ষার অবসান হলো। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে মধ্য ডিসেম্বর থেকে দেশজুড়ে যে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছিল, গতরাতে কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বে ৫ সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তার অবসান ঘটালেন।

মঙ্গলবার রাতে মন্ত্রিপরিষদের তরফে জানানো হয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদে সাবেক সচিব কে এম নুরুল হুদাকে নিয়োগ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। এ ছাড়া আরও চারজনকে কমিশনার হিসেবেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা হচ্ছেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব তালুকদার, সাবেক সচিব রফিকুল ইসলাম, সাবেক জেলা ও দায়রা জজ কবিতা খানম ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহাদৎ হোসেন চৌধুরী। পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এই কমিশনের নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। নতুন ইসি নিয়োগে গতকাল সন্ধ্যায় সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে যে ১০টি নামের সুপারিশ করেছিল, তা থেকে পাঁচজনের এই ইসি রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ গঠন করেছেন বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম গতকাল সোমবার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান। জানা গেছে, সার্চ কমিটির তালিকায় সিইসি পদে সার্চ কমিটির সুপারিশে নুরুল হুদার সঙ্গে ছিলো সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারের নামও। ১৯৭৩ ব্যাচের সরকারি কর্মকর্তা নুরুল হুদার বাড়ি পটুয়াখালীতে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং সংসদ সচিবালয় যুগ্মসচিব ও অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে দীর্ঘদিন ওএসডি থাকার পর ২০০৬ সালে সচিব হিসেবে অবসরে যান তিনি।

সার্চ কমিটির সুপারিশে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আরও যে চারটি নাম ছিল তারা হলেন- স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ, ঢাবি লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক জারিনা রহমান খান, প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ, চেয়ারম্যান জানিপপ ও পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সদস্য আবদুল মান্নান।
এরআগে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতিকে সুপারিশের জন্য দশজনের নাম চূড়ান্ত করে সার্চ কমিটি। কমিটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) পদের জন্য সাবেক দুই প্রভাবশালী আমলার নাম প্রস্তাব করেছে। এ তালিকায় ইসির চার কমিশনারের বিপরীতে দু’জন নারীসহ মোট আটজনের নাম চূড়ান্ত করে সুপারিশ করা হয়েছে। তবে কারো নামই প্রকাশ করেনি সার্চ কমিটি। নাম প্রকাশের বিষয়টি তারা বঙ্গভবনের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। এই সুপারিশের মধ্যে থেকে একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য চারজনকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিলেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্ট জাজেস লাউঞ্জে আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠক করে ২০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে দশজনকে চূড়ান্ত করে। বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এ বৈঠকে অংশ নেওয়ার পর রাষ্ট্রপতির হাতে নামের তালিকা ও প্রতিবেদন তুলে দিতে সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে সার্চ কমিটির সদস্যরা বঙ্গভবনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তারা সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় পূর্বনির্ধারিত সদয়ের মধ্যে বঙ্গভবনে পৌঁছান। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমও আলাদাভাবে বঙ্গভবনে যান। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সার্চ কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দিচ্ছে। কমিটির প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন রাষ্ট্রপতির হাতে প্রস্তাবিত নামের তালিকা হস্তান্তর করেন। এখন সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ স্বাপেক্ষে এই তালিকা থেকে একজনকে সিইসি এবং চার জনকে ইসি পদে নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। এসময় সার্চ কমিটির সদস্য বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, সিএজি মাসুদ আহমেদ, পিএসসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদিক, অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও অধ্যাপক শিরীণ আখতার উপস্থিত ছিলেন।
এরআগে সন্ধ্যায় জাজেস লাউঞ্জে সার্চ কমিটির বৈঠকের পর অতিরিক্ত সচিব আব্দুল ওয়াদুদ সাংবাদিকদের বলেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই সার্চ কমিটি তাদের প্রস্তাবিত নাম ও প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে। রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ জমা দেওয়ার আগে কারও নাম প্রকাশ করা হবে না। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আবদুল ওয়াদুদ আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো যে নাম দিয়েছিল, সার্চ কমিটির সঙ্গে মতবিনিময়ে অংশ নিয়ে বিশিষ্ট নাগরিকেরা যে পরামর্শ দিয়েছেন, তার আলোকেই ১০ জনের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। চূড়ান্ত হওয়া ১০ জনের নাম কেন প্রকাশ করা হচ্ছে না- এর জবাবে আবদুল ওয়াদুদ বলেন, এই তালিকা প্রকাশ করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেবেন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি নাম প্রকাশ করার আগে সার্চ কমিটি নাম প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোন মানদ-ের ভিত্তিতে দশ জনের নাম সুপারিশ করা হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ যেসমস্ত যোগ্যতা বা মানদ-ের কথা বলেছেন। মূলত: তাদের সুপারিশের উপর ভিত্তি করে ও মানদ- বিবেচনা করে সুপারিশ করা হয়েছে। সার্চ কমিটির সুপারিশ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কী না- জানতে চাইলে আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, আশা করি গ্রহণযোগ্য হবে।
সার্চ কমিটির পক্ষ থেকে নাম প্রকাশে কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করা হলেও নানা সূত্রে পাওয়া নামগুলো ছিল- সাবেক মুখ্যসচিব এমএ করিম, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসেন ভূইয়া, শেখ ওয়াহিদুজ্জামান, সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ ও আইজিপি নুরুল হুদা, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, বিচারপতি কবিতা খানম, এনজিও ব্যক্তিত্ব অ্যারোমা দত্ত, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ, ড. সাদেকা হালিম, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ইকরাম আহমেদ, ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী, পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান এটি আহমেদুল হক চৌধুরী প্রমুখ।
বৈঠক শেষে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিটির একজন সদস্য বলেন, বৈঠকে আমরা ১০ জনের নাম চূড়ান্ত করেছি। প্রতিটি শূন্যপদের বিপরীতে দুজন করে ১০ জনের নাম সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু প্রস্তাবনাও থাকছে। আমরা রাষ্ট্রপতির কাছে অনুরোধ করেছি বিতর্ক এড়াতে তিনি যাতে আমাদের প্রস্তাবিত নামগুলো প্রকাশ করেন।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, সার্চ কমিটির দেওয়া তালিকা থেকেই সিইসি এবং ইসি নিয়োগের কোনও বাধ্যবাধকতা ছিল না রাষ্ট্রপতির। তিনি চাইলে তালিকার বাইরে থেকেও যে কাউকে সিইসি এবং ইসি নিয়োগ করতে পারতেন। এক্ষেত্রে সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। এ বিষয়ে সংবিধানের ১১৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনার নিয়ে একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতিত রাষ্ট্রপতি তার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করিবেন। তবে শর্ত থাকে যে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনো পরামর্শদান করিয়াছেন কি না এবং করিয়া থাকিলে কি পরামর্শ দান করিয়াছেন, কোনো আদালত সেই সম্পর্কে কোনো প্রশ্নের তদন্ত করতে পারিবেন না।
প্রসঙ্গত নির্বাচন কমিশন গঠনে গত ২৫ জানুয়ারি বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে প্রধান করে ছয় সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেন রাষ্ট্রপতি। সার্চ কমিটির অপর সদস্যরা হলেন- হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক, কম্পট্রোলার এন্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) মাসুদ আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য শিরীণ আখতার। এ কমিটিকে ৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নারীসহ ১০ জনের নামের তালিকা রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ২৫ জানুয়ারি সার্চ কমিটি গঠনের পর ৬টি বৈঠক হয়েছে। এর মধ্যে দুইদিন বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়। আর রাজনৈতিক দল থেকে নাম পাওয়ার পর অনুসন্ধান কমিটি দুটি বৈঠক করে। বিশিষ্ট নাগরিকেরা দলনিরপেক্ষ, সাহসী, দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নাম প্রস্তাব করার সুপারিশ করেছেন। তাঁদের মত হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন হতে হবে বিতর্কের ঊর্ধ্বে, মেরুদ- হতে হবে সোজা। যাতে চাপ কিংবা হুমকির মুখেও প্রভাবমুক্ত হয়ে তাঁরা কাজ করতে পারেন। ৮ ফেব্রুয়ারি বর্তমান সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ ও অন্য তিন কমিশনারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। আর ১৪ ফেব্রুয়ারি কমিশনার শাহনেওয়াজের মেয়াদ শেষ হবে।

মতামত...