,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

পার্বত্য শান্তিচুক্তি ১৯ বছরে

hill picখাগড়াছড়ি সংবাদদাতা,বিডিনিউজ রিভিউজ.কম :: আজ ২ ডিসেম্বর। ১৮ পেরিয়ে ১৯ বছরে পা দিলো ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি। যা অনেকের কাছে শান্তি চুক্তি নামে পরিচিত। পাহাড়ে শান্তি বাহিনীর সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হওয়ার পর প্রায় দু’যুগের বেশি সময় ধরে চলে সশস্ত্র সংগ্রাম।পরে সংগঠনটি ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে। সরকারের পক্ষে চুক্তি স্বাক্ষর করেন তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির আহবায়ক আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অধিবাসীদের পক্ষে চুক্তি স্বাক্ষর করেন জনসংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির ১৯ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়েছে। শান্তি চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি পার্বত্য জেলাসমূহের উন্নয়ন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এবং প্রিয় মাতৃভূমির উন্নয়নে দলমত নির্বিশেষে সকলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।

বাণীতে প্রধানমন্ত্রী পার্বত্য শান্তি চুক্তির ১৯ বছর পূর্তি উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীসহ দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানান এবং শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।

চুক্তি স্বাক্ষরের পর ১০ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আনুষ্ঠনিক অস্ত্র সমর্পণ করেন সন্তু লারমা। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামসহ ৪টি স্থানে প্রায় ১ হাজার ৯৬৮ জন শান্তিবাহিনীর (এসবি) সদস্য অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। চুক্তির অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে চলছে অবিশ্বাস, দূরত্ব।

জানা যায়, চুক্তি মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন-১৯৯৮ অনুযায়ী ৩৩টির মধ্যে রাঙামাটিতে ৩০টি, খাগড়াছড়িতে ৩০টি ও বান্দরবানে ২টি দফতর, বিভাগ ও বিষয় হস্তান্তর করেছে সরকার। বাকিগুলো হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। প্রত্যাগত ১২ হাজার ২২৩ শরণার্থী পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। শান্তি বাহিনী সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা এবং ৭১৫ জনকে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। চুক্তির পরে ২ হাজার ৫২৪ জনের বিরুদ্ধে ৯৯৯টি মামলার মধ্যে ৮৪৪টি যাচাই-বাছাই শেষে ৭২০টি মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া চলমান। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বিল-২০১০ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন দফতরে চাকরির ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নির্ধারিত কোটাও অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।

চুক্তি স্বাক্ষরকালীন পাহাড়ে একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল থাকলেও এখন আছে তিনটি। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (সন্তু গ্রুপ), পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (সংস্কার পন্থী), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। আছে বাঙালি সংগঠন। একপক্ষ বলছে চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। অপর পক্ষ বলছে এই চুক্তি একপেশে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা গ্রুপ) সভাপতি সুধাসিন্ধু খীসা বলেন, সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে বললেও এটি বাস্তবতার সাথে মোটেও সংঙ্গতিপূর্ণ নয়। পাহাড়ের প্রধান সমস্যা ভূমি। এটি যদি সমাধান না হয় তাহলে পাহাড়ের সমস্যা সমাধান হবেই না। উল্টে সমস্যা আরো বেড়ে যাবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (সন্তু গ্রুপ) কেন্দ্রীয় সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজিব চাকমা বলেন, দীর্ঘ ১৯ বছরে চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়াটা সত্যিই দুঃখজনক। সরকার চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো বাস্তবায়ন না করে চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বলছে। আন্তরিকতার অভাবে এতোটা বছরেও চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি। সমস্যা সমাধান চাইলে দ্রুত চুক্তি বাস্তবায়নের করতে হবে বলে জানান তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দেয়া এক বিবৃতি ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) কেন্দ্রীয় নেতা সচিব চাকমা বলেছেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে একটি অসম্পূর্ণ ও প্রতারণামূলক চুক্তি। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের আন্দোলন ধ্বংস করে দেয়ার জন্যই ১৯৯৭ সালে চুক্তিটি করা হয়েছিল, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নয়।’

বাঙালি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল মজিদ বলেন, পার্বত্য চুক্তিটি ছিল একপেশে। চুক্তিতে একটি পক্ষ উপকৃত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাঙালিরা। চুক্তির আলোকে ভূমি কমিশন যেভাবে সাজানো হচ্ছে এতে বাঙালিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাহাড়ি বাঙালিদের মতামতের ভিত্তিতে চুক্তি সংশোধন করার দাবি জানান তিনি। এদিকে গত মঙ্গলবার খাগড়াছড়ি সফরকালে যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘চুক্তির আলোকে ভূমি কমিশন আইন সংশোধন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে কমিশনের কাজ শুরু হয়েছে। পাহাড় উন্নয়ন অব্যাহত আছে। চুক্তির প্রত্যেক ধারা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনের আগেই চুক্তির নব্বই ভাগ বাস্তবায়িত হবে। তবে স্থানীয়রা চান যত দ্রুত সম্ভব সরকার পরিপূর্ণ চুক্তি বাস্তবায়ন করে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এদিকে চুক্তির বর্ষপূর্তিকে ঘিরে পার্বত্য তিন জেলায় বর্ণাঢ্য কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

মতামত...