,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশকে টপকাতে ভারতের প্যাকেজ

aনিজস্ব প্রতিবেদক, বিডি নিউজ রিভিউজ ডটকমঃ ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা একটি বিশেষ প্যাকেজ অনুমোদন করেছে, যাতে ২০১৮ সালের মধ্যে অন্তত ৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বস্ত্র ও পোশাক বিদেশে রপ্তানি করতে পারে তারা।

তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে গার্মেন্ট রপ্তানিতে পেছনে ফেলে এক নম্বরে যেতে চাইছে ভারত।

বুধবার ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা একটি বিশেষ প্যাকেজ অনুমোদন করে বলে জানায় বিবিসি।

ইউ এন কমট্রেড এর দেওয়া পরিসংখ্যান দেখিয়ে ভারত সরকার বলছে, ১৯৯৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ আর ভিয়েতনামের থেকে বস্ত্র আর পোশাক রপ্তানিতে এগিয়ে ছিল ভারত।

কিন্তু তারপর থেকেই এই শিল্পে রপ্তানির পরিমাণ কমতে থাকে। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ আর ২০১১ সালে ভিয়েতনামের থেকেও বস্ত্র রপ্তানিতে পিছিয়ে পড়ে ভারত।

২০১৪ সালে ভারত ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বস্ত্র আর পোশাক রপ্তানি করতে পেরেছিল। যেখানে বাংলাদেশ থেকে ২৬ বিলিয়ন আর ভিয়েতনাম থেকে ২১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বস্ত্র আর পোশাক বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছে।

ভারতের মন্ত্রিসভা যে বিশেষ প্যাকেজের অনুমোদন দিয়েছে, তাতে বস্ত্র আর পোশাক শিল্পে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের যেমন ব্যবস্থা করা হবে, তেমনই বিভিন্ন ধরনের কর ছাড় আর বিনিয়োগের সুবিধাও দেয়া হবে।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় এই নতুন প্যাকেজ নিয়ে একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে উন্নতমানের যন্ত্রপাতি বসানোর জন্য ২৫% পর্যন্ত ভর্তুকি দেয়া হবে।

এই ভর্তুকি পেয়ে যাতে সত্যিই তা কাজে লাগানো হয়, সেটা নিশ্চিত করতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার পরেই এই টাকা দেওয়া হবে কোম্পানিগুলিকে।

বিভিন্ন রাজ্য সরকার যে লেভি আদায় করে, সেগুলো ফিরিয়ে দেয়া হবে গার্মেন্ট শিল্প মালিকদের।

এজন্য কোষাগারের ওপরে বাড়তি ৫৫০০ কোটি টাকার বোঝা চাপবে। কিন্তু ভারতীয় বস্ত্র শিল্পকে বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতায় সাহায্য করার জন্য এই বাড়তি টাকা খরচ করতেও পিছপা হবে না সরকার।

আয়কর ছাড়, মহিলাদের বস্ত্র আর পোশাক শিল্পে আরো বেশি করে নিয়োগ দেয়ার মতো ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে নতুন প্যাকেজে।

বর্তমানে ভারতের তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ডে বেতনের ১২ শতাংশ অর্থ জমা দিতে হয়। এর মধ্যে সরকার দেয় ৮.৩৩ শতাংশ, শ্রমিকরা দেয় ৩.৬৭ শতাংশ। ঘোষিত প্যাকেজে বলা হয়েছে, যেসব শ্রমিকের ন্যূনতম বেতন ১৫ হাজার রুপির কম, আগামী তিন বছর পর্যন্ত প্রভিডেন্ট ফান্ডে তাদের কোনো টাকা জমা দিতে হবে না। তাদের হয়ে পুরো ১২ শতাংশই জমা দেবে সরকার। এতে তিন বছরে এক হাজার ১৭০ কোটি রুপি বাড়তি খরচ হবে ভারত সরকারের।

অধিকসংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভারত ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজে বলা হয়েছে, কোনো কারখানা মালিক একজন শ্রমিককে দিয়ে সপ্তাহে আট ঘণ্টার বেশি ওভারটাইম করাতে পারবেন না। এ ছাড়া দেশটির আয়কর আইন অনুযায়ী, বছরে অন্তত ২৪০ দিন কর্মরত থাকা শ্রমিকদের আয়করে ৩০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার বিধান রয়েছে। নতুন অনুমোদিত প্যাকেজে তা কমিয়ে ১৫০ দিন করা হয়েছে। আরো বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্যই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতের বস্ত্র মন্ত্রণালয়।

যদি এই প্যাকেজ ঠিকমতো কাজে লাগানো যায়, তাহলে ২০১৮ সালে ভারত ৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বস্ত্র আর পোশাক রপ্তানি করতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশ সে বছর ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি করতে পারবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের প্রতিক্রিয়া

এদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা বলছেন, পোশাক রপ্তানিতে ভারতের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের চেয়েও বেশি। দেশটির নিজস্ব শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ রয়েছে। গত তিন বছরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে দেশটির মুদ্রার মান ব্যাপক হারে কমেছে। ফলে দেশটি কয়েক বছর ধরে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে।

গত অর্থবছরের প্রথম দিকে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি যখন ঋণাত্বক ছিল, তখনো ভারতের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি যখন এক অঙ্কে উঠেছে, তখন ভারতের প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কে থেকেছে। এ অবস্থায় তৈরি পোশাক খাতের জন্য সরকারের দেওয়া বিভিন্ন প্রণোদনা আরো বাড়ানোর পাশাপাশি এই শিল্পের ওপর আরোপিত উৎসে কর ও করপোরেট কর হার কমানোর দাবি করেছেন তারা। না হলে রপ্তানি প্রতিযোগিতায় ভারত ও ভিয়েতনামের কাছে হেরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর এবং বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির (ইএবি)।

বাংলাদেশের পোশাক খাতের রপ্তানিকারকরা বলছেন, ১৯৯৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের চেয়ে বেশি অর্থের তৈরি পোশাক রপ্তানি করত। ওই সময় পোশাক রপ্তানিতে চীনের পরেই অবস্থান ছিল ভারতের। এর পর থেকেই ভারত বাংলাদেশের তুলনায় পোশাক রপ্তানিতে পিছিয়ে পড়ে। ২০০৩ সালে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ ভারতকে পেছনে ফেলে। আর ২০১১ সালে ভিয়েতনামও বস্ত্র রপ্তানিতে পেছনে ফেলে ভারতকে। ২০১৪ সালে ভারতের পোশাক ও বস্ত্র রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৭০০ কোটি ডলার। ওই বছর বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ২৬০০ কোটি ডলার। ভিয়েতনামের রপ্তানি ছিল ২১০০ কোটি ডলার।

বিজিএমইএ নেতারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ১২ জাতির ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) চুক্তিতে সই করেছে ভিয়েতনাম। ফলে ভিয়েতনাম তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্রসহ টিপিপিভুক্ত অন্য দেশ জাপান, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় বিনা শুল্কে পোশাক রপ্তানির সুযোগ পাবে। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও ভিয়েতনাম মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ সই করতে যাচ্ছে। ফলে ইউরোপেও শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা পাবে ভিয়েতনাম।

এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ভিয়েতনামের কাছে বাজার হারানোর আশঙ্কা আগে থেকেই রয়েছে বাংলাদেশের। এ অবস্থায় ভারতের এই প্রণোদনা বাড়তি চাপে ফেলবে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের।

ইএবির সভাপতি ও দেশের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এনভয় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, প্রতিযোগী ও প্রতিবেশী সব রপ্তানিকারক দেশই বাজার ধরতে নানা কৌশল নিচ্ছে। ভিয়েতনাম টিপিপি সই করেছে। ভারত তাদের ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের বিকাশে বাড়তি প্রণোদনা ঘোষণা করছে।

তিনি বলেন, ‘এমনিতেই তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। আমাদের যখন রপ্তানিতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয় তখনো ভারতের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। আমাদের প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের হলে, ওদের হয় দুই অঙ্কে। দীর্ঘদিনের পোশাক রপ্তানির অভিজ্ঞতা ছাড়াও মার্কিন ডলারের তুলনায় রুপির দরপতন ভারতের রপ্তানিকারকদের বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। তিন বছর আগে এক ডলারে পোশাক রপ্তানি করে রপ্তানিকারক পেতেন ৪৪ রুপি। এখন পাচ্ছেন ৬৮ রুপি। আর বাংলাদেশে তিন বছর আগে এক ডলারে পোশাক রপ্তানি করে পাওয়া যেত ৮৪ টাকা, এখন মিলছে ৭৬ টাকা।’

আবদুস সালাম মুর্শেদী আরো বলেন, ভারত কারিগরি ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। তা সত্ত্বেও রপ্তানি বাড়াতে দেশটির ঘোষিত প্যাকেজ সময়োপযোগী। এ অবস্থায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর উৎসে করহার, করপোরেট করহার কমানো উচিত। এ ছাড়া বিদ্যমান প্রণোদনা আরো বাড়ানো দরকার। না হলে ভারত হয়তো প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে হারিয়ে দেবে।

 

মতামত...