,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

পৌর মেয়রদের দলত্যাগে সুযোগ : শঙ্কিত বিএনপি

ঢাকা নভেম্বর ২৯: পৌরসভা নির্বাচনেরাজনৈতিকভাবে  মেয়র  নির্বাচিত হয়ে কোনো মেয়র একটি দল থেকে অন্য দলে যোগ দিলে যে জটিলতা তৈরি হবে, সে বিষয়ে আইনে কিছুই বলা নেই। এ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিএনপি। দলটির মতে, নির্বাচনের পর প্রলোভনে অথবা চাপে পড়ে তাদের নির্বাচিত মেয়ররা ক্ষমতাসীন দলে যোগ দিলে তাদের কিছুই করার থাকবে না।সংশোধিত পৌরসভা আইন ও বিধিতে-মেয়রের পদ শূন্য হলে কাউন্সিলররা প্যানেল মেয়রের দায়িত্ব পালন করবেন। বর্তমান আইনে মেয়রের পদ শূন্য হলে অরাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত কাউন্সিলর কীভাবে মেয়রের দায়িত্ব পালন করবেন, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সংশোধিত পৌরসভা আইন ও বিধিতে এমন আরও কিছু ফাঁকফোকর তৈরি হয়েছে, যা নির্বাচনের আগে ও পরে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি
করতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক ও নির্বাচন বিশ্লেষকেরা। তাঁরা আরও মনে করেন, সরকার তড়িঘড়ি করে আইন করায় এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে আইন করলে এসব দুর্বলতা হয়তো থাকত না। আর দলগুলোও তাদের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও প্রার্থী নির্বাচনের বিষয়গুলো গঠনতন্ত্রে অন্তর্ভুক্ত করতে পারত।
নতুন পৌরসভা আইনে বলা হয়েছে, পৌরসভার মেয়ররা রাজনৈতিক দলের পরিচয় ও প্রতীকে নির্বাচিত হবেন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (সংসদ নির্বাচন আইন) অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪০টি দলের মেয়র প্রার্থীরা দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবেন। তবে কাউন্সিলররা নির্দলীয়ভাবে নির্বাচিত হবেন।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, একটি দল থেকে নির্বাচিত একজন সাংসদ অন্য দলে যোগদান করলে তাঁর সদস্যপদ থাকবে না। কোনো দল থেকে নির্বাচন করতে হলে সেই দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থাকতে হবে। কিন্তু পৌরসভা আইনে এ সম্পর্কে কিছুই বলা নেই, নেই দলগুলোর গঠনতন্ত্রেও।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এটি একটি এবড়োখেবড়ো আইন। এই আইনে নির্বাচন কমিশন, সরকার, রাজনৈতিক দল—সবাইকে হোঁচট খেতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করলে এমন হতো না। নির্বাচনের পর অনেক জটিলতার সৃষ্টি হবে। মামলা-মোকদ্দমা হবে।
বিএনপির নেতারা বলছেন, বিগত সময়ে তাঁদের নির্বাচিত সিটি মেয়রদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অপসারণ করে প্যানেল মেয়রকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আগামী পৌর নির্বাচনের পরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা। সে ক্ষেত্রে পদ রক্ষায় মেয়ররা শাসক দলে যোগ দেওয়ার মতো সহজ রাস্তা বেছে নিতে পারেন।
আচরণবিধিতে অপরাধের উল্লেখ থাকলেও বিচারিক কর্তৃপক্ষের উল্লেখ নেই। বিধিতে বলেছে, কেউ নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে তিনি ছয় মাসের কারাদণ্ডে অথবা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানার দণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। দল আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে ৫০ হাজার টাকা জরিমানার দণ্ডে দণ্ডিত হবে। কিন্তু নির্বাচনী অপরাধ কে আমলে নেবে, কে বিচার করবে—সে বিষয়ে আইনে কিছুই বলা নেই।
আইনের এসব বিচ্যুতি সম্পর্কে গত বৃহস্পতিবার সংসদের বিরোধী সদস্যদের প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, প্রথমবার রাজনৈতিকভাবে নির্বাচন হচ্ছে। ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। পরে এসব সংশোধন করা যাবে।
এ বিষয়ে পৌর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘সরকার আইন করার সময়ে আমাদের জানায়নি। একবার অধ্যাদেশ জারি করল। পরে তা বাতিল করে সংসদে আইন পাস করল। এ নিয়ে আমাদের দুবার কাজ করতে হয়েছে। সময় কম, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। তাই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বসার সুযোগ হয়নি।’
যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক নির্বাচনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রের মিল থাকতে হয়। সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রতিটি দলেরই গঠনতন্ত্রে সংসদীয় বোর্ডের কথা বলা আছে। সেই বোর্ড প্রার্থী মনোনয়ন দিয়ে থাকে। কিন্তু পৌর আইন ও নির্বাচন সম্পর্কে কোনো রাজনৈতিক দলেরই গঠনতন্ত্রে কোনো কিছুর উল্লেখ নেই। দলের প্রধান অথবা সাধারণ সম্পাদক জেলার সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক অথবা অন্য কাউকে মনোনয়ন কর্তৃপক্ষ নিয়োগ করতে পারবেন। প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, সে বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা এই আইনে নেই।
জানতে চাইলে মিউনিসিপ্যাল অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক শামীম আল রাজী বলেন, পৌরসভা নির্বাচন ও এর আইনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক তৈরি করতে হলে দলগুলোর গঠনতন্ত্রে সংশোধনী আনতে হবে। কিন্তু সরকার দলগুলোকে সেই সময় দেয়নি। এখন যে আইন হয়েছে, তাতে দলীয় প্রধান অথবা সাধারণ সম্পাদক যাঁকে খুশি তাঁকে মনোনয়ন কর্তৃপক্ষ বানাতে পারবেন। ক্ষমতা পাওয়া সেই ব্যক্তি যাঁকে খুশি তাঁকে মনোনয়ন দেবেন। তাঁর ক্ষমতা কি অসীম? এটা কি গণতন্ত্র হতে পারে?
আইনে বলা হয়েছে, মেয়ররা দলীয় পরিচয় ও প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবেন। আর কাউন্সিলররা নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন করবেন।  মেয়রের পদ শূন্য হলে কাউন্সিলররা প্যানেল মেয়রের দায়িত্ব পালন করবেন। বর্তমান আইনে মেয়রের পদ শূন্য হলে অরাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত কাউন্সিলর কীভাবে মেয়রের দায়িত্ব পালন করবেন, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক শুরু হয়েছে।
এই আইনকে স্ববিরোধী উল্লেখ করে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, অরাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত কোনো কাউন্সিলর অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য রাজনৈতিক একটি পদে (প্যানেল মেয়র) দায়িত্ব নিলে তা নিয়ে আইনি প্রশ্ন দেখা দেবে। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে। তিনি আরও বলেন, মেয়র দলীয় ও কাউন্সিল নির্দলীয়ভাবে নির্বাচিত হলে মেয়রের গুরুত্ব বেড়ে যাবে। এতে মেয়রের সঙ্গে কাউন্সিলরদের দূরত্ব বাড়বে। যা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
এবারের নির্বাচনে অনেক পৌরসভায় শেষ পর্যন্ত দলগুলোর একজনও প্রার্থী থাকবেন না—সে রকম আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, দলগুলো একজনের বেশি প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারবে না। কোনো কারণে কোনো একটি দলের প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে গেলে ওই পৌরসভায় সেই দলের আর কোনো প্রার্থী থাকবেন না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব জেসমিন টুলি বলেন, দলগুলো ঋণখেলাপি, বিলখেলাপি বা অযোগ্য প্রার্থীদের কেন মনোনয়ন দেবে, যাঁদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যাবে?

মতামত...