,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

প্রাইমমুভার ট্রেইলর ধর্মঘট অব্যাহত, চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেনার জটের শংকা,

port-stop-working

মীর মুহাম্মদ নাছির উদ্দীন সিকদার, বিডিনিউজ রিভিউজঃ চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার জট বেড়েই চলছে। প্রাইমমুভার ট্রেইলর ধর্মঘটের কারণে তা আরও প্রকট হচ্ছে। বিশ্বে আমাদের বন্দরের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। আর্থিক ভাবেই অপুরনীয় ক্ষতি হচ্ছে দেশ ও জাতির। ৪ দিন অতিবাহিত হলেও এব্যাপারে সমাধানের কোন পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা।এনিয়ে বন্দর ব্যভারকারি ও আমদানি রপ্তানির সাথে জড়িতরা উদ্বেগের মধ্যেই দিন যাপন করছেন।

 প্রাইমমুভার ট্রেইলর মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের ডাকা ধর্মঘটের কারণে নির্দিষ্ট সময়ে রফতানি পণ্যবাহী কন্টেনার বন্দরে পৌঁছতে পারেনি। এর ফলে ৮৯৮ টিইইউএস কন্টেনার রেখে বন্দর ছেড়ে গেছে তিনটি বিদেশি জাহাজ। সকালে এমভি এক্স ওরশোলা বন্দর ত্যাগ করে ১৭৭ টিইইউএস কন্টেনার রেখে। সন্ধ্যায় এমভি এক্সপ্রেস লর্ডসি ৬৭০ টিইইউএস এবং এমভি ওইএল কলম্বো ৫১ টিইইউএস কন্টেনার রেখে বন্দর ছেড়ে সিঙ্গাপুর এবং কলম্বোর পথে যাত্রা করেছে। এগুলো সিঙ্গাপুর বা কলম্বোর জাহাজে বোঝাই করার সিডিউল থাকলেও মূলত চালানগুলো ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের তৈরি পোষাক রয়েছে।

রফতানি পণ্যের এসব কন্টেনার নিয়ে ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন। তারা বলছেন, নির্দিষ্ট সময়ে বড় জাহাজ ধরতে না পারলে বিমানে পাঠাতে হবে। এতে লোকসানে পড়বে প্রতিষ্ঠানগুলো। কারণ চুক্তি অনুযায়ী পণ্য পৌঁছাতে না পারলে বায়াররা অর্ডার বাতিল করতে পারেন। এদিকে ৮৯৮ টিইইউএস কন্টেনারের মধ্যে ৯৫ শতাংশ পোশাক শিল্পের বলে জানা গেছে। এদিকে ১৬টি বেসরকারি ডিপোতে ২ দিনে পণ্যবাহী ৫ হাজার ৭২০ টিইইউএস কন্টেনার জমেছে।

আন্দোলনরত প্রাইমমুভার ট্রেইলর মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সাথে সাথে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বৈঠক ভেস্তে গেছে। এতে করে প্রাইমমুভার ট্রেইলর ধর্মঘট অব্যাহত রয়েছে। ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে এফসিএল কন্টেনার পরিবহন এবং আইসিডি থেকে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এতে করে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বন্দরে রপ্তানি পণ্য আসছে না। ফলে জাহাজগুলো কন্টেনারের জন্য অপেক্ষা করে একসময় খালি কন্টেনার নিয়ে বন্দর ছেড়ে যাবে।
অপরদিকে আমদানি পণ্য বোঝাই কন্টেনার খালাস ব্যাহত হওয়ায় বন্দর বড় ধরনের সংকটে পড়ার আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে। ধর্মঘট লাগাতার হলে কেবল জাহাজ বা কন্টেনারজট নয়, জাহাজ থেকে কন্টেনার খালাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

মঙ্গলবার দিনভর মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদ বন্দরের সল্টগোলা ক্রসিংয়ে পুলিশ বক্সের পাশে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। সমাবেশে বক্তারা পুরো বিষয়টিকে চট্টগ্রাম বন্দর ধংসের ষড়যন্ত্র বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

সেতু মন্ত্রণালয় থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৩৩ টনের বেশি ওজনের কোনো গাড়ি চলাচল করতে পারবে না মর্মে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সার্কুলার জারি করা হয়। এতে করে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কন্টেনার নিয়ে প্রাইমমুভার ট্রেইলরগুলো মেঘনা ব্রিজ এবং দাউদকান্দি ব্রিজ এলাকায় স্থাপিত স্কেলে আটকে দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে চল্লিশ ফুটি কন্টেনার বহনকারী ট্রেইলরগুলোর ওজন ৩৩ টনের বেশি। এই ধরনের বেশ কিছু ট্রেইলর মেঘনা এবং দাউদকান্দি ব্রিজের কাছে আটকা পড়ার পর সোমবার সকাল থেকে প্রাইমমুভার ট্রেইলর মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদ অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করে। তাদের দাবি, সার্কুলার প্রত্যাহার করতে হবে।

সোমবার ২৬ সেপ্টেম্বর  সকাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে এফসিএল (পুরো কন্টেনারের পণ্য একজন আমদানিকারকের) কন্টেনার পরিবহন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বন্দর থেকে প্রতিদিন গড়ে এক হাজারেরও বেশি এফসিএল কন্টেনার খালাস হয়। গত সোমবার থেকে এই কন্টেনার বন্দরের ভেতরে আটকা পড়ে আছে।

আইসিডি থেকে কন্টেনার নিয়ে প্রাইমমুভারগুলো বন্দরের জেটিতে আসে। রপ্তানি পণ্য বোঝাই এসব কন্টেনার জাহাজে বোঝাই করার পর বিশ্বের নানা গন্তব্যে যায়। কিন্তু সোমবার সকাল থেকে সব ধরনের রপ্তানি পণ্যবাহী কন্টেনার বন্দরে আসা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রপ্তানি কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হওয়ার উপক্রম হচ্ছে। রপ্তানি পণ্য সময়মতো না পৌঁছায় বন্দর থেকে কন্টেনার জাহাজ খালি কন্টেনার নিয়ে ছেড়ে যাচ্ছে। গত দুদিনে বেশ কিছু রপ্তানি পণ্য জাহাজিকরণের কথা থাকলেও প্রাইমমুভার ধর্মঘটের কারণে সেগুলো জাহাজে তোলা সম্ভব হয়নি।

আন্দোলনরত প্রাইমমুভার ট্রেইলর নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার বিকেলে বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (পরিবহন) সারওয়ার আলম বৈঠক করেন আন্দোলনকারী প্রাইমমুভার ট্রেইলর মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সাথে। এসময় নিরাপত্তা পরিচালকও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রাইমমুভার মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দের মধ্যে আবু বক্কর সিদ্দিক, মোহাম্মদ হুমায়ুন কবিরসহ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারীদের দেশের স্বার্থে শুধুমাত্র রপ্তানি পণ্য পরিবহন ছাড় দেয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু আন্দোলনকারীরা তাদের দাবি মেনে নেয়া না হওয়া পর্যন্ত কোনো ছাড় দেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, আমাদের দাবি একটিই। সার্কুলার প্রত্যাহার করতে হবে।

আন্দোলনরত প্রাইমমুভার ট্রেইলর নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছে বলে জানা গেছে ।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও প্ল্যানিং) মোহাম্মদ জাফর আলম মঙ্গলবার বলেন, বিষয়টি খুবই উদ্বেগের। এই অবস্থা চললে আমরা জটিলতায় পড়ব। যত সময় বেশি লাগবে ততই জটিলতা বৃদ্ধি পাবে। দ্রুত সংকটের সুরাহা করার জন্য মন্ত্রণালয়ে কথা বলেছি।

তিনি বলেন, বর্তমানে সংকটে বন্দর কর্তৃপক্ষের যা ক্ষতি হচ্ছে তার থেকে অনেক বেশি হচ্ছে রপ্তানিকারকদের। তাদের পণ্য বন্দরে আসছে না। পণ্য সময়মতো বন্দরে না পৌঁছলে জাহাজিকরণ হবে না। অর্ডার বাতিল হওয়ার আশংকা তৈরি হচ্ছে।

বন্দরের অপর একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বন্দরের অভ্যন্তরে কন্টেনারের পরিমাণ প্রতিদিনই বাড়ছে। কন্টেনার বাইরে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এই অবস্থায় বন্দরের চল্লিশ হাজার টিইইউএস ধারণ ক্ষমতা ফুরিয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না। সেক্ষেত্রে জাহাজ থেকে কন্টেনার নামিয়ে রাখার জায়গার সংকট সৃষ্টি হবে। এতে জাহাজ থেকে কন্টেনার খালাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বন্দরে জাহাজজট এবং কন্টেনারজট প্রকট হয়ে উঠছে। তার খেসারত বন্দর কর্তৃপক্ষকে দীর্ঘ সময় ধরে দিতে হবে।

প্রাইমমুভার ট্রেইলর মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির বলেন, দাবি মেনে না নেয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন থেকে সরে আসার কোনো পথ নেই। তিনি বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে চল্লিশ ফুটি কন্টেনারের ওজন গাড়িসহ ৪৫ টন হবে। এখন যদি ৩৩ টনের বেশি পণ্য পরিবহন করতে দেয়া না হয়, সেক্ষেত্রে এসব কন্টেনার কী করে পরিবহন করা হবে?

মঙ্গলবার বিক্ষোভ সমাবেশে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরকে ধ্বংস করার জন্য সুকৌশলে এই ধরনের সার্কুলার জারি করা হয়েছে। বিশ্বের আর কোথাও পণ্য বোঝাই চল্লিশ ফুট কন্টেনার গাড়িসহ ৩৩ টনের বাধ্যবাধকতা নেই; যা অর্থনৈতিকভাবেও সাশ্রয়ী নয়। কন্টেনারে বেশি পণ্য বোঝাই করা হয় খরচ কমানোর জন্য। এখন যে সার্কুলার জারি করা হয়েছে তা বহাল থাকলে এই বন্দর দিয়ে চল্লিশ ফুটি কন্টেনারে পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যাবে। চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম যাতে স্বাভাবিকভাবে না চলে সেজন্য চট্টগ্রাম বিদ্বেষী কোনো মহল ষড়যন্ত্র করছে কিনা, তা খতিয়ে দেখার জন্য বক্তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

মতামত...