,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

প্রাথমিক শিক্ষায় ঘুষ বাণিজ্য বন্ধে ৩ মাসের আল্টিমেটাম দুদকের

নিজস্ব প্রতিবেদক, ১৭ ফেব্রুয়ারী, বিডিনিউজ রিভিউজ.কম::প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনে ‘ঘুষ-বাণিজ্যে’ জড়িত দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তাদের নিজেদের শুধরে নিতে তিন মাসের আল্টিমেটাম দিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ।

বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরীর প্রাইমারি টিচার ইনস্টিটিউট (পিটিআই) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত প্রাথমিক শিক্ষায় সুশাসন নিশ্চিতকরণে চট্টগ্রাম বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ সময় বেধে দেন। একই সাথে দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তাদের সতর্ক করে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার পাহাড়সম অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়েছে। শিক্ষকদের বদলি, অর্জিত ছুটি, পেনশনের কাগজপত্র প্রস্তুত, নারী শিক্ষকদের মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ নানা খাতে শিক্ষা কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ না দিলে কাজ হয় না; এমন অনেক অভিযোগ অফিসে ইতিমধ্যে জমা পড়েছে। এর সাথে কারা কারা জড়িত তার তথ্যও আমরা সংগ্রহ করছি।’ এই ‘ঘুষ-বাণিজ্যে’ জড়িতদের তিন মাসের মধ্যে নিজেদের শোধরাতে হুঁশিয়ারি বার্তা উচ্চারণ করেন দুদক চেয়ারম্যান।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এ সভার আয়োজন করে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামালের সভাপতিত্বে সভায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আসিফ উজ জামান, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. সামসুল আরেফিন, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপ-পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান বিল্লাহ, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাসরিন সুলতানা উপস্থিত ছিলেন। সভায় চট্টগ্রাম বিভাগের জেলা ও উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, সুপারিন্টেন্ডেন্ট, পিটিআই ইন্সট্রাক্টর, রিসোর্স সেন্টারের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দপ্তরের দুই শতাধিক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ আরো বলেন, ‘শিক্ষকরা অধিকাংশ সৎ ও নিষ্ঠাবান। প্রাথমিক শিক্ষা শিক্ষার মূল ভিত্তি। এই ভিত্তি মজবুত না হওয়ার পেছনে ব্যাঙের ছাতার মত কোচিং সেন্টার ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাদানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষাকে কাঙ্খিত পর্যায়ে নিয়ে যেতে না পারলে দেশের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাবে। নানা খাতে যেসব অভিযোগ আমি পেয়েছি তার জন্য আমি আগামী তিন মাস অপেক্ষা করবো। এ সময় কেবল যারা অনৈতিক কাজে জড়িত আছেন তাদের শুধরে নেওয়ার জন্য দিচ্ছি। পরে আমরা পদক্ষেপ নিব।’
শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করা, প্রকৃত ফলাফল পরিবর্তন করা, ফলাফল কারচুপি করার মতো ভয়ানক অভিযোগ পেয়েছি। তাছাড়া অনেক শিক্ষক নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান না করে বাড়তি আর্থিক সুবিধার উদ্দেশ্যে বাইরে পড়াচ্ছেন এমনও অভিযোগ পাচ্ছি। এসব অভিযোগ সত্য না হলে তা কিভাবে দুদক অফিসে আসলো? আমি জানি এর উত্তর আপনারা কেউ দিতে পারবেন না। নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সবাইকে শিক্ষার মিশন নিয়ে দেশের স্বার্থে কাজ করতে হবে। কোনোভাবে অনৈতিক কাজ করা যাবে না।
চট্টগ্রামের সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হৃশীকেশ শীলের সঞ্চালনায় সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রাথমিক শিক্ষা চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপ-পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান বিল্লাহ। সভাপতির বক্তব্যে প্রাথমিক ও শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ই-মনিটরিং সিস্টেম চালু করা হচ্ছে। কোনো কর্মকর্তা আর বিদ্যালয়ে উপস্থিত না হয়ে কাগজে-কলমে রিপোর্ট জমা দিতে পারবেন না।’ তিনি আরো বলেন, আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আমাদের কাজ করতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমাদের অনেক বিদ্যালয় রয়েছে। যেখানে কর্মকর্তারা খুব একটা পরিদর্শনে যান না। এক্ষেত্রে শিক্ষার মানের বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত ই-মনিটরিং চালু করতে যাচ্ছি। এ অর্থবছরের মধ্যে সারা বাংলাদেশে একসাথে তা চালু করা হবে। কাজ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কোন কর্মকর্তা বিদ্যালয়ে স্বশরীরে না গিয়ে কাগজে কলমে রিপোর্ট দিতে পারবেন না। আগের মত ৪ থেকে ৫ পৃষ্ঠার ছক পূরণ করে আর প্রদর্শনীর রিপোর্ট দিতে হবে না। কোমলমতি শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ও শিক্ষা অর্জন করতে পারছে কিনা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসছে কি না, বিদ্যালয়ে থাকছে কি না- এসব বিষয়গুলো ই-মনিটরিংয়ের আওতায় চলে আসবে। আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এরমাঝেও আমরা ই-প্রাইমারি সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে ৬০ ভাগ কাজ শেষ করে ফেলেছি।
বর্তমানে প্রাক-প্রাথমিক এবং প্রাথমিক স্তরে ২ কোটি ১৭ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়সহ অধিদপ্তরে কর্মরত ৬ হাজার, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ৩ লাখ ৫৭ হাজার, সরকারি-বেসরকারিসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ লাখ ২৬ হাজার। দেশের ২ কোটি ১৭ লাখ পরিবারের সন্তানদের আমরা মানুষ করতে দায়িত্ব নিয়েছি। প্রতিটি কোমলমতি শিক্ষার্থীর নির্দিষ্ট স্বপ্ন রয়েছে। সেই শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন লালনকারী প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। ‘বাংলাদেশের উন্নয়নের বাতিঘর, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ এই গানে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরকে আমরা ব্রান্ডিং করার চেষ্টা করছি।
পরে সভাপতির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত হয় উন্মুক্ত আলোচনা পর্ব। আলোচনায় অংশ নিয়ে মতামত তুলে ধরেন চট্টগ্রাম পিটিআই সুপার মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার, কুমিল্লার পিটিআই সুপার হারুনুর রশিদ ভূঁইয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শিক্ষা অফিসার সুব্রত কুমার বণিক, লক্ষ্মীপুর জেলা শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ আবদুল আজিজ, কক্সবাজার জেলা শিক্ষা অফিসার সিদ্দিকুর রহমান, বান্দরবানের সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার রিটন কুমার বড়ুয়া, কুমিল্লার আলীগঞ্জের পিটিআই সুপার মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন, কুমিল্লা সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ রফিক, চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলা প্রাইমারি শিক্ষা অফিসার হেমায়েতুল ফারুক ভূঁইয়া, মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার ইন্সট্রাক্টর মো. মাঈনুদ্দিন, চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানা রিসোর্স সেন্টারের ইন্সট্রাক্টর দিলরুবা জাহান, কুমিল্লার তিতাসের সহকারী থানা ইন্সট্রাক্টর খালেদা আক্তার প্রমুখ।

মতামত...