,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

ফেসবুকে নিখোঁজ মায়ের সন্ধান মিলল

নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ রিভিউজ.কম::সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ডেসপারেটলি সিকিং, চিটাগাং (ডিএসসি)-এর গ্রুপে ইমন নুর ইমু নামের এক যুবক ২ জানুয়ারি বেলা ২টা ৬ মিনিটএকটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি একজন মহিলার ফুটপাতে ঘুমানোর ছবি দেন। লিখেন, নগরীর মোমিন রোডে ডিসি হিলের পাশে মহিলাটি শুয়ে আছেন। দেখে মনে হয় অবস্থাপন্ন ঘরের মহিলা। কারো সঙ্গে কথা বলেন না, প্রশ্ন করলেও উত্তর দেন না…. ইত্যাদি। ইমু মহিলাটির সন্ধান দেয়ার পর একই পোস্টে অনুরোধ জানান, কারো পরিচিত হলে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যেতে। ফেসবুকে এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মাহদী শুভ নামে এক তরুণের ফেসবুক আইডি থেকে মুন্না খান রুবেল নামে অপর এক যুবক আর্জি জানান, ছবির মহিলাটি তার মা। তাদের বাড়ি বাড়বকু–ে। ১৭ দিন ধরে তার মাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি ফেসবুক ব্যবহারকারীদের কাছে তার মায়ের সন্ধান ও ফেরে পেতে সহায়তা চান। মুন্না’র এই আবেদনের পর একেক জন একেক তথ্য দিতে থাকেন। কেউ বলেন ফেসবুকে দেয়া মহিলাকে দুদিন আগে চেরাগী পাহাড়ে দেখা গেছে। কেউ সিআরবি, কেউ চকবাজার আবার কেউ আনোয়ারায় দেখেছেন বলে অনবরত পোস্ট দিতে থাকেন। অন্যদের মতো পুলিশ কনস্টেবল আরিফ খান জয়–এর চোখেও পড়ে মুন্নার দেয়া পোস্টটি। তিনি আনোয়ারার বরুমছড়ায় মহিলাটিকে দেখা গেছে বলে যিনি জানিয়েছেন সেই ব্যক্তিকে অনুরোধ করেন মহিলাকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু ওই ব্যক্তি প্রতিউত্তরে জানান, ‘সন্ধান দিয়েছি। দরদ থাকলে এসে নিয়ে যান।’ ওই ব্যক্তির অসহযোগিতাসুলভ এমন জবাবে খুবই দুঃখ পান পুলিশ কনস্টেবল আরিফ খান জয়। শপথ করেন, যেকোন মূল্যে মহিলাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেবেন। ফেসবুকে পাল্টা পোস্ট দিয়ে তার ফেসবুক বন্ধুসহ সকল ব্যবহারকারীর সহযোগিতা কামনা করেন। পোস্টে উল্লেখ করেন, কেউ মহিলাটির সন্ধান দিলে তিনি ও আবদুল মালেক চৌধুরী নামে আনোয়ারার এক বড় ভাই নিজ দায়িত্বে মহিলাটিকে স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেবেন। কিন্তু এরপর আর কোন সাড়া নেই। নিজ বাড়ি আনোয়ারা হওয়ায় পুলিশ কনস্টেবল আরিফ খান তার আত্মীয়–স্বজনের কাছে মহিলাটিকে খুঁজে পেতে সাহায্য চান। প্রায় ১৫দিন আত্মীয়–স্বজনকে ব্যতিব্যস্ত রাখেন আরিফ। একইসঙ্গে ওই মহিলার ছেলে মুন্না খান রুবেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে মা’কে পেয়েছেন কিনা, খোঁজখবর নেন। কিন্তু মুন্না কখনো ফোন ধরেন আবার কখনো ধরেন না। সমস্যায় পড়ে যান পুলিশ কনস্টেবল আরিফ। এরিমধ্যে ওই মহিলার বোনের ছেলে (ইতালি প্রবাসী) ওমর ফারুক ফেসবুকে খালা’র নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ পেয়ে তাকে ফিরে পেতে উতলা হয়ে পড়েন। ফেসবুকের মাধ্যমেই পুলিশ কনস্টেবল আরিফের মোবাইল নম্বর যোগাড় করেন এবং খালাকে উদ্ধারে তার সর্বাত্মক সহযোগিতা চান। খালার সংবাদ জানতে প্রতিদিনই একবার আরিফের কাছে ফোন করেন। কিন্তু কেউই সুসংবাদ দিতে না পারায় অনেকটা হতাশা হয়ে পড়েন সংশ্লিষ্টরা।

ফেসবুকে দেয়ার ১৫ দিন পর বুধবার (১৭ জানুয়ারি) দুপুরে মো. ইমন হোসেন নামে পুলিশ কনস্টেবল আরিফের এলাকার এক ছোট ভাই মোবাইলে জানান মহিলাটিকে আনোয়ারার মোহছেন আউলিয়া মাজারের পাশের বাজারে পাওয়া গেছে। সংবাদ পেয়েই আরিফ খান সন্ধানদাতাকে বলেন, যেভাবেই হোক উনাকে আটকে রাখো, আমি আসছি। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মহিলার সন্তান মুন্না খান রুবেলকে ফোন করেন এবং নগরীর নিউমার্কেট এলাকায় আসতে বলেন। তিনিও চাকরিস্থল দামপাড়া পুলিশ লাইন থেকে নিউমার্কেটে গিয়ে মুন্নার সঙ্গে মিলিত হন। দুজনেই একসঙ্গে ছুটে যান আনোয়ারায়। সেখানে গিয়ে যখন মুন্না মাকে দেখেন তখন তিনি বাজারে মাটিতে শুয়ে আছেন। ছেলেকে দেখে চিনতে পারলেও চোখে–মুখে তেমন উচ্ছ্বাস ছিল না। ছেলে যখন মা’কে বাড়ি যাওয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছিল, মাটিতে বিছানো কাঁথার উপর শুয়ে মা শুধু জড়ানো কণ্ঠে বলেন, আরেকটু শুয়ে তারপর যাব।

সেই সুযোগ না দিয়ে সন্ধানদাতা ইমন ও পুলিশ কনস্টেবল আরিফ মা–ছেলেকে বাড়বকুন্ডে যাওয়ার জন্য একটি ট্যাক্সিতে তুলে দেন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে মোবাইলে আলাপকালে মহিলার ছেলে মুন্না খান রুবেল বলেন, বাড়বকু–ের আনোয়ারা জুট মিল গেট এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। দিনমজুরের কাজ করে স্ত্রী আর এক মেয়ে নিয়ে কোনমতে সংসার চালান। সেখানেই মাকে নিয়ে উঠেছেন। আর্থিক সংকটের কারণে অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা ভালভাবে করতে পারছেন না।

মায়ের নিখোঁজ হওয়ার প্রসঙ্গে মুন্না খান রুবেল জানান, তার বাবা নেই। নানীর মৃত্যুর পরই মায়ের মানসিক কিছু সমস্যা দেখা দেয়। বেড়ানোর জন্য দুই মাস আগে মা–কে তিনি সিলেটে বোনের বাড়িতে পাঠান। এরপর ২৯ ডিসেম্বর তার বোন ট্রেনে মাকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে একাকী পাঠিয়ে দেন। কিন্তু এই সংবাদটি তাকে দেয়া হয়নি। বোনের অপরিণামদর্শী বোকামির কারণে মানসিক সমস্যাগ্রস্ত তার মা ট্রেন থেকে নেমেই নিরুদ্দেশ হয়ে যান। ২২ দিন পর পুলিশ কনস্টেবল আরিফ খানের সহায়তায় ফিরে পান। উচ্ছ্বসিত রুবেল বলেন, ‘মাকে ফিরে পেতে আরিফ সাহেব আমার জন্য যা করেছেন পেটের ভাইও তা করবে না। গুরুত্বপূর্ণ চাকরির ফাঁকে ফাঁকে টাকা ও শ্রম দিয়ে তিনি আমাকে যে সহযোগিতা করেছেন এবং মাকে খুঁজে পেতে যেভাবে লেগেছিলেন আমিও সেটা পারিনি’।

মায়ের জন্য মানুষের ত্যাগে পুলিশ কনস্টেবল আরিফ খান ও ফেসবুক বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন রুবেল।

আরিফ খান জয় বলেন, মহিলাটিকে প্রথম যখন ফেসবুকে দেখি আমার নানীর মতো লেগেছিল। তারচেয়েও বড় কথা, অসহায় মানুষের জন্য আমার মন কাঁদে। অসহায় লোকদের কেউ মন্দ বললে কিংবা খারাপ ব্যবহার করলে আমার সহ্য হয় না। ছোটবেলা থেকেই মানুষের জন্য কিছু করায় আমি আনন্দ পাই। সেই বোধ থেকেই মহিলাটিকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করি এবং আল্লাহর রহমতে সফলও হই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের কল্যাণে হারিয়ে যাওয়া মহিলাকে উদ্ধার করা গেছে বলে জানিয়ে আরিফ খান জয় ফেসবুক বন্ধুদের ধন্যবাদ দিতে ভুললেন না।

মতামত...