,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে সংঘর্ষে হত ৪ আহত ৫০,তদন্তে ১ সদস্যের কমিটি

aনিজস্ব প্রতিবেদক,বিডি নিউজ রিভিউজ ডটকমঃবাঁশখালীর গণ্ডামারায় এস আলম গ্রুপের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষ-বিপক্ষ গ্রুপ এবং পুলিশের ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঘটনায় চমেক হাসপাতালে আরো ১ জন মারা গেছে। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাড়ালো ৪।

 সোমবার বিকাল বিকালে গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা এলাকায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষ-বিপক্ষ গ্রুপ এবং পুলিশের ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন। আহতদের বেশিরভাগকে বাঁশখালী থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও প্রাইভেট হাসপাতালে এবং গুরুতর আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

জানা গেছে, নিহতদের সকলে এবং আহতদের অধিকাংশই গুলিবিদ্ধ।  বর্তমানে পুরো এলাকার থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পরিস্থিতির  অবনতি ঠেকাতে চট্টগ্রাম থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে সশস্ত্র পুলিশ,  র‌্যাব ও বিজিবি’র দল ঘটনাস্থলে রয়েছে। পুলিশ সংঘর্ষে ৪ জন মারা যাওয়ার খবর নিশ্চিত করলেও এলাকাবাসীর দাবি এ সংখ্যা আরো বেশি ।

সংঘর্ষে নিহতদের মধ্যে রয়েছেন মতুর্জা আলী, আনোয়ার হোসেন আঙ্গুর ও জাকির আহমদ। রাতে সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোহাম্মদ জাকের নামে একজন মারা গেছেন। এছাড়া কুলসুমা আক্তার নামে এক মহিলা ও বদিউল আলম নামে আরও একজন মারা গেছে বলে শোনা গেলেও কোনো দায়িত্বশীল পক্ষ থেকে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে স্থানীয় সাবেক চেয়ারম্যান লেয়াকত আলী জানান, সংঘর্ষের ঘটনায় কুলসুমা আক্তার নামে এক নারীসহ মৃতের সংখ্যা ৮ জন হতে পারে।

সাতকানিয়া সার্কেলের এএসপি এ কে এম এমরান ভুইয়া জানান, বড়ঘোনা এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সংঘর্ষে নিহত তিনজনের লাশ বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং একজনের লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেলে রয়েছে।

 চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মমিনুর রশিদ কে প্রধান করে ঘটনা তদন্তে এক সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে।  কমিটিকে সাতদিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত কয়দিন আগে এস. আলম পাওয়ার প্ল্যান্টের গাড়িবহরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় রোববার গভীর রাতে গণ্ডামারা থেকে সাত জনকে আটক করে পুলিশ। এলাকাবাসীর দাবি এর মধ্যে ৫ জনই নিরীহ মানুষ। এই আটকের খবরে গণ্ডামারা এলাকার বেশ কিছু নারী পুরুষ থানার সামনে এসে অবস্থান করে।

প্রকাশ, পশ্চিম গণ্ডামারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এস. আলম পাওয়ার প্ল্যান্টের বিরুদ্ধে সোমবার বিকেল ৩টায় সমাবেশ আহ্বান করে একটি পক্ষ (বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিরোধী)। এ খবর মাইক নিয়ে প্রচার করায় মাইকসহ ৩ জনকে আটক করে থানা পুলিশ। এদিকে এর পাল্টা হিসেবে তাদের বিরোধীপক্ষও (বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষের) ওই এলাকায় সভা করার জন্য মাইকিং করে। পুলিশ জানায়, উভয়পক্ষের সংঘর্ষের আশঙ্কায় উপজেলা প্রশাসন ওই এলাকায় সমাবেশের ওপর ১৪৪ ধারা জারি করে। এসময়ই মূলত ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়। পুলিশ জানায়, ১৪৪ ধারা জারি করে তারা নিজেদের গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার সময় বেরিকেড তুলতে গেলে পুলিশের উপর দুইদিক থেকে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এর পরই শুরু হয় গোলাগুলি। মুহূর্তের মধ্যে ওই এলাকা রণক্ষেত্রের রূপ নেয়। সংঘর্ষ প্রায় ৫টা পর্যন্ত চলার পর পুলিশ গণ্ডামারা শীলকূপের মধ্যবর্তী জলকদর খালের গণ্ডামারা ব্রিজে এসে অবস্থান গ্রহণ করে। এসময় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষের স্থানীয় কিছু লোককেও এখানে অবস্থান নিতে দেখা যায়। অপরদিকে বিক্ষুব্ধ জনতা বড়ঘোনার দুইপাশে অবস্থান নেয়। তারা অভিযোগ করেন, এ অবস্থায় আহতদের চিকিৎসা দিতে নিয়ে যাওয়ার সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ব্রিজের উপর থাকা পুলিশ ও কয়লা বিদ্যুতের পক্ষের লোকজন।

সংঘর্ষে আহত পুলিশ সদস্যরা হলেন পুলিশের উপ-পরিদর্শক বেলাল হোসেন (৩৫), মো. বাহার (৩২), মো. মুজিবুল ইসলাম (৩০), সহকারী উপ-পরিদর্শক মো. আনোয়ার হোসেন (২৯), কনস্টেবল মো. ওয়াসিম (২২), কনক চন্দ্র সিংহ (২৪), খোরশেদ আলম (৫০), মো. নুরুল কবির (২৯), মিরাজ উদ্দিন (২৮), মিনহাজুল ইসলাম (৪৮), চন মুং মারমা (৪৮), রূপবন্ধু চাকমা (৪৭), শহীদুল ইসলাম (৩৫), নায়েক এল.এম হোসেন (৪০) আনসার সদস্য আবদুল মোতালেব (২৩)। এছাড়া সাধারণ লোকজনের মধ্যে আহত যাদের নাম জানা গেছে তারা হলেন আবদুল খালেক (২৭), মো. ছগীর (৩৫), মো. জহির (৩৫), জিয়াদ রহমান (২৪)।

বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. রেজাউল হক বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আহত ১৯ জনকে ভর্তি করা হয়। তাদের অধিকাংশই পুলিশ। আহতদের মধ্যে এক আনসার সদস্যসহ ৭ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয় বলে তিনি জানান।

 চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির নায়েক জাহাঙ্গীর আলম জানান, বাঁশখালী থেকে সাতজনকে চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয়েছে।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সামসুজ্জামান বলেন, ১৪৪ ধারা জারি করে পুলিশ প্রশাসনসহ ফিরে আসার পথে রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে অতর্কিতভাবে আমাদের উপর হামলা চালানো হয়েছে। তিনি জানান, এ পরিস্থিতিতে পুলিশ নিজেদের রক্ষার্থে গুলি চালায়। এ ব্যাপারে বাঁশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ স্বপন কুমার মজুমদার বলেন, এলাকার আইন শৃংখলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাধ্য হয়ে এবং জনস্বার্থে এখানে আসতে হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মামলার প্রক্রিয়া চলছে।

 বাঁশখালীতে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনায় হতাহতের ঘটনা সম্পর্কে স্থানীয় এমপি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ‘এস আলমের কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষে বিপক্ষের লোকেরা সংঘর্ষ করেছে। পুলিশ আইন শৃংখলা নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করেছে। এতে লোকজন হতাহতের খবর আপনারা যেভাবে শুনেছেন আমিও একইভাবে শুনেছি।’

এ ব্যাপারে এস. আলম পাওয়ার প্ল্যান্টের সমন্বয়কারী মো. নাছির উদ্দীনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কতিপয় লোক নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থে পাওয়ার প্ল্যান্টের বিরুদ্ধে নানা ধরনের প্রচারণা চালিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। এমনকি আমরা যে জায়গা খরিদ করেছি তার টাকা দেওয়া হয়নি বলে নানাভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে। আমাদের প্রকল্পের জন্য নেওয়া জমির কোন টাকা বকেয়া নেই। মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সাধারণ জনগণকে প্রশাসনের মুখোমুখি করা হয়েছে। আমরা সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য আহবান জানাচ্ছি।

প্রসঙ্গত, গন্ডামারা ইউনিয়নের বড়ঘোনায় ‘১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র’ যৌথভাবে নির্মাণ করছে এস আলম গ্রুপ ও চীনের একটি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ভূমি অধিগ্রহণ চলছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি হলে বাঁশখালীর গণ্ডামারা ইউনিয়নের লবণ ও চিংড়ি চাষিরা বেকার হয়ে পড়বেন -এ আশঙ্কায় স্থানীয়দের একটি অংশ এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধিতা করছে।

 বি এন আর/০০১৬/০০৫/০০৪/০০০৪৮০৪/ এন

মতামত...