,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

বাঁশখালী আলাওল ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষের অবসরকালীন মেয়াদ বাড়াতে জালিয়াতির অভিযোগ

alol collagebnr ad 250x70 1শাহ মুহাম্মদ শফি উল্লাহ, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা,বিডিনিউজ রিভিউজ ডটকমঃ চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা সদরস্থ আলাওল ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ মো. ইদ্রিছের অবসরকালীন মেয়াদ বাড়াতে জালিয়াতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে । এছাড়াও তাঁর বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থতছরুপ, অফিস কক্ষে বিচারালয় স্থাপন, স্বজনপ্রীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের । কলেজ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি স্থানীয় সংসদ সদস্য হওয়ায় বার বার তাঁদের প্রভাব কাটিয়ে নানা অনৈতিকতা ধামা চাপা দেয়া হয়েছে। এবার গাজীপুরস্থ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ও কলেজ পরিদর্শকের কাছে কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির কতিপয় সদস্য ও অভিভাবক সদস্যরা ক্ষুব্ধ হয়ে মো. ইদ্রিছের ভয়াবহ জালিয়াতির বিরুদ্ধে গত ৯ জুন অভিযোগ দায়ের করেছেন । ক্ষুব্ধ ও হতাশাগ্রস্থ অভিভাবকরা শংকিত হয়ে ওঠেছেন এবারো এমপি’র প্রভাবে অধ্যক্ষের জালিয়াতি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বর্তমান অধ্যক্ষের ভুয়া নবগঠিত কমিটির দাতা সদস্য প্রবীর কুমার দাশ, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আলী মোহাম্মদ মোস্তফা মিশু, বাঁশখালী পৌরসভার সাবেক মেয়র কামরুল ইসলাম হোসাইনী, বাঁশখালী উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মৌলভী নুর হোসেন, অভিভাবক মোশারফ আলী, জাহাঙ্গীর আলম, আব্দুল গোফরান বলেন, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে গাজীপুরস্থ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ও কলেজ পরিদর্শকের কাছে দেয়া অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছি, গত ২০১৫ সালের এপ্রিল মাস থেকে গত ২৪ মে ২০১৬ পর্যন্ত ১ বছরে কলেজ ব্যবস্থাপনা কমিটির কোন সভা হয়নি। ২০১৬ সালের ২১ মে কলেজ কমিটির মেয়াদ শেষ। চলতি বছরের আগামী ৫ সেপ্টেম্বর অধ্যক্ষের চাকুরীকালীন অবসর যাবেন। তিনি কলেজের পাঠদান বাদ দিয়ে সারাদিন অফিস কক্ষে গ্রাম্য শালিস-বিচার নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। এই ফাঁকে কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির মেয়াদ যে শেষ হয়েছে তা জানতেন না অধ্যক্ষ মো. ইদ্রিছ, এমনকি গত এক বছরে কোন সভাও আহ্বান করেননি । অধ্যক্ষ গত ২৫ মে কলেজ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা আহ্বান করলে কমিটির বেশ কয়েকজন সদস্য উপস্থিত হয়ে গত ২১ মে কলেজের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এখন কিসের সভা ? এই প্রশ্ন করা হলে সভায় কলেজ ব্যবস্থাপনা বিধিমালা অনুসারে এডহক কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়। কলেজ বিধিমালা অনুসারে এডহক কমিটি হলে অধ্যক্ষের অবসরকালীন মেয়াদ বাড়ানোর অধিকার এডহক কমিটির নেই। তাই সবকিছু আড়াল করে কলেজ অধ্যক্ষ ওই ২৫ তারিখ রাতে পিছনের তারিখ উল্লেখ করে নিজ হাতে লেখা যাবতীয় কাগজপত্র তৈরী করেন। গত ২ মার্চ, ৭ এপ্রিল ও ১৮ মে পর পর তিনটি কলেজ কমিটির ভুয়া সভা দেখিয়ে নতুন খাতায় ভুয়া স্বাক্ষরে রেজুলেশন তৈরী করে কলেজ কমিটির দাতা সদস্য, হিতৈষী সদস্য, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, শিক্ষক প্রতিনিধি ও অভিভাবক সদস্যসহ যাবতীয় সদস্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছে বলে কমিটি গঠন করা হয়। ওই নির্বাচিত কমিটির সদস্যরা কেউ জানেনও না কখন মনোনয়ন ফরম, তফসিল ঘোষণাপত্র, ফলাফল ঘোষণাপত্র হয়েছে। নতুন ক্রয় করা ছোট ছোট কয়েকটি খাতায় যাবতীয় কাগজপত্রে কমিটির সদস্যদের ভুয়া স্বাক্ষর বানিয়ে নির্বাচন হওয়ার কথা বলে কমিটি গঠন করে ফেলে। এই ধরণের কোন নির্বাচন কলেজে হয়নি। কোন ধরণের ভোটার লিষ্ট কলেজের নোটিশ বোর্ডে ও ছাত্র-ছাত্রীদের অবহিত করেনি। এছাড়া ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজে কম্পিউটার, ফটোষ্টেটসহ যাবতীয় তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যম ও কর্মচারী থাকলেও ২৭ পৃষ্ঠার প্রতিটি কাগজপত্র অধ্যক্ষের নিজ হাতে লেখা । কলেজের অন্যান্য তুচ্ছ কাগজও কম্পিউটারে প্রস্তুত হয়ে থাকে অথচ কলেজ ব্যবস্থাপনার মত গুরুত্বপূর্ণ এই কাগজপত্র কলেজ অধ্যক্ষ নিজের অবসরকালীন চাকুরীর মেয়াদ বাড়াতে ভয়াবহ জালিয়াতি করেছেন।
তারা আরো বলেন ‘আমরা দীর্ঘদিন কলেজ ব্যবস্থাপনায় জড়িত। কিন্তু এই ধরণের জালিয়াতি করে ভুয়া স্বাক্ষর করে কমিটি গঠন আমরা নিজেদেরকে কলংকিত করেছে। এই অধ্যক্ষের নানামুখি, দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতায় আমরা অতিষ্ঠ। কলেজের সুনাম রক্ষার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়েছি। কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে এডহক কমিটি হবে এটাই নিয়ম। ভুয়া কমিটি করার মানে কী ?’
২০১৪ সালের আগষ্ট মাসে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডেও উপ-কলেজ পরিদর্শক ইলিয়াস উদ্দিন আহমদ ও সহকারী সচিব আবু রেজার নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে পাবলিক পরীক্ষার খাতায় আভ্যন্তরীন পরীক্ষা নেয়ার অপরাধে তার হেফাজত থেকে ৬ হাজার খাতা জব্দ করে। ওই সময় থেকে তাঁকে চট্টগ্রাম শিক্ষার্বোডের পরীক্ষকের দায়িত্ব থেকে বাদ দেয়া হয়। ম্যানেজ করে বড় শাস্তি থেকে পার পান। কলেজের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক প্রদীপ কুমার দত্তের বাড়ি ভারতে। প্রতিবছর অন্তত ৭/৮ বার ভারতে যাওয়ার সুযোগ করে দেন। কলেজে কোন হিসাব নিকাশ নেই। কলেজের ৬টি দোকান, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে টিআর, কাবিখা পাওয়ার হিসাব নিকাশ কোথাও নেই। সারাদিন কলেজ অফিসে বসে গ্রাম্য শালিশ বিচার করে বিচারলয় স্থাপন, কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কলেজ বাস বিক্রয় করে অর্থ আত্মসাৎ, ছাত্র-ছাত্রীদের ছাউনি ভেংগে ফেলেছে ও নানাভাবে কলেজের অর্থ তছরুপ সহ নানামুখি অনিয়মের ফাঁদে কলেজকে ধ্বংস করে চলছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-কলেজ পরিদর্শক হাসান আমির বলেন,‘অধ্যক্ষের আবেদন ও স্কুল কমিটির অভিযোগ দুটোই পেয়েছি। বিষয়টি খুবই জটিল। অধ্যক্ষের পাঠানো কাগজে কিছু অসংগতি চোখে পড়েছে তাই আমি কলেজের যাবতীয় বিষয়টি ভাইন্স চ্যান্সেলর স্যার বরাবরে পাঠিয়ে দিয়েছি। তদন্তের পর সিদ্ধান্ত হবে।’
বাঁশখালী পৌরসভার মেয়র ও কলেজ ব্যবস্থাপনা কমিটির হিতৈষী সদস্য মুক্তিযোদ্ধা সেলিমুল হক বলেন, ‘ ঘটনাটি শুনে আমি মর্মাহত। কলেজ অধ্যক্ষের সুনাম রক্ষার্থে আমি তাঁকে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর মেয়াদ শেষে আর কলেজে না থাকার অনুরোধ জানিয়েছি।’
কলেজ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও বাঁশখালী সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘কলেজ কমিটির মেয়াদ নিয়ে এধরণের কারসাজি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন কিছুই জানি না। অধ্যক্ষ সব কিছু আড়াল করে আমার স্বাক্ষর নিয়েছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’
বাঁশখালী আলাওল ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ মো. ইদ্রিছ বলেন, ‘ কলেজ ব্যবস্থাপনা কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি প্রজ্ঞাপনের ভুলের কারণে জানতে পারি নাই। কলেজটি বর্তমানে সরকারি করণের তালিকায়। যা কিছু করেছি কলেজের স্বার্থে করেছি। আমার স্বার্থে নই। অভিযোগ যেহেতু করা হয়েছে সেহেতু নির্দেশা আসলে এডহক কমিটি করা হবে। আমি ৫ সেপ্টেম্বরের পর একদিনও থাকব না।’
নানা অনিয়মের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ সরকারি-বেসরকারী অডিট কমিটি সবকিছু তদন্ত করে বাৎসরিক প্রতিবেদন দেন। তাদের আপত্তি না থাকলে জনগণের মিথ্যাা অভিযোগ কোন কাজে আসবে না।’
‘মামা-ভাগিনা দাপটে ভাগ্যবান প্রফেসরের এমপি ম্যানেজ’
গ্রামের অসংখ্য মানুষ অভিযোগ করে বলেন, অধ্যক্ষ মো. ইদ্রিছ ভাগ্যবান ‘প্রফেসর’ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। জাতীয় পার্টির আমলে সংসদ সদস্য মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীকে ‘মামা’ সম্বোধন করে নানা দাপটে অপকর্ম করে বেড়াতেন। কলেজের প্রফেসর হলেও তখন থেকে তিনি রিক্সা সমিতি, জীপ সমিতি, টেক্সী সমিতি ও সিএনজি অটোরিক্সা সমিতি সভাপতিসহ নানা নিচু কাজে জড়িয়ে থাকতে অভ্যস্ত। এমনকি নানা গ্রাম্য শালিশ বিচার নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রশাসনের দালালি কওে মামলা মকদ্দমা করিয়ে দেয়া তাঁর মৌলিক পেশা। এর পর আওয়ামীলীগ এমপি মুক্তিযোদ্ধা সুলতানুল কবির চৌধুরীর কাছে ঠাঁই পাননি। বিএনপি’র এমপি ও সাবেক বন প্রতিমন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরীকেও একইভাবে ‘মামা’ সম্বোধন করে ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন। আওয়ামীলীগের বর্তমান এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীকে ‘ভাগিনা’ সম্বোধন করে নানাভাবে অনৈতিক ক্ষমতার দাফট দেখিয়ে যা কিছু আদায় করে নিতে ব্যস্ত তিনি। বিএনপি’র চিন্তা-চেতনায় গড়া এই অধ্যক্ষ মো. ইদ্রিছ যখন যে সরকার আসুক তাঁকে ম্যানেজ করতে কারুকাজে পটু । তাই তিনি এলাকায় ‘ভাগ্যবান প্রফেসর’ হিসেবে পরিচিত । কলেজের ভুয়া কমিটির কাগজপত্রে কৌশলে এমপি’র অসংগতিপূর্ণ সাক্ষর নিয়েও ছেড়েছেন।

শাহ মুহাম্মদ শফি উল্লাহ
বাঁশখালী( চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা

মতামত...