,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

বিনিয়োগ বান্ধব মুদ্রানীতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের

953নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা,১৫, জানুয়ারি (বিডি নিউজ রিভিউজ ডটকম):চলতি বছরের ৬ মাসের(জানুয়ারি-জুন) জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর এ মুদ্রানীতিকে সংযত, সতর্ক এবং বিনিয়োগ সমর্থনমূলক বলেছেন ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান।

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে গভর্নর ড. আতিউর রহমান এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন।

তিনি বলেন, ‘নয়া মুদ্রানীতিতে চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর আমাদের স্বপ্ন প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরে। আর এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের সব দরজা খোলা রয়েছে।’

মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে ড. আতিউর রহমান বলেন, বর্তমানে খাদ্য ও জ্বালানি বহির্ভূত কোর মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা সার্বিক মূল্যস্ফীতিকে ঊর্ধ্বমুখী চাপে রেখেছে। তাই সতর্ক ও সংযত মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী চাপের কারণে গতবারের চেয়ে ব্যাপক ও বেসরকারি খাতের ঋণ যোগানের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে যথাক্রমে ১৫ শতাংশ এবং ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রেপো ও রিভার্স রেপো হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে যথাক্রমে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ করা হয়েছে।

গভর্নর অর্থনৈতিক সূচকগুলোর ওপর আগের মুদ্রানীতির প্রভাব কতোটা পড়েছে, সে বিষয়গুলো উল্লেখ করে বলেন, ‘২০১৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার অগ্রগতি ছিল বেশ ভালো। বছরের শুরুর দিকের কিছু চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আমরা ৬ দশমিক ৫১ শতাংশের সম্মানজনক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছি। অর্জন করেছি ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক ও মূল্য স্থিতিশীলতা। ২০১৫ সালেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি নয়া মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। গত বছরই আমরা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা লাভ করেছি। গত মুদ্রানীতি থেকেই ভোক্তামূল্য মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। ভোক্তা মূল্যস্ফীতি জুনের ৬ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে আরো কমে ডিসেম্বরে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। বর্তমান মূল্যস্ফীতি আমাদের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যেই রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বর শেষে খাদ্য ও জালানি বহির্ভূত কোর মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতিকে ঊর্ধ্বমুখী চাপে রেখেছে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো চলতি বছরের উচ্চ প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার পরিবেশেও আমাদের রপ্তানি বাড়ছে। বছর শেষে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বৈদেশিক সূত্রের অর্থায়নসহ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি জুনের ১৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে নভেম্বরে ১৩ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আমানত ও ঋণের সুদহার কমেছে এবং এ দুটি সুদহারের ব্যবধান অর্থাৎ স্প্রেড ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। তবে এই স্প্রেড আরো কমানোর জন্য ব্যাংকগুলোকে আমরা তাগিদ দিয়ে যাচ্ছি। অভ্যন্তরীণ এবং বহির্বিশ্ব উভয় খাতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে ৬ দশমিক ৮ থেকে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং ৬ দশমিক ১ শতাংশ মূল্যস্ফীতি প্রক্ষেপণ করছে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে অর্থবছর শেষে এই প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশও স্পর্শ করতে পারে।’

গভর্নর বলেন, ‘উৎপাদন ও মূল্য পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আমরা সংযত কিন্তু সমর্থনমূলক মুদ্রানীতি ভঙ্গি দিয়ে যাচ্ছি। এবারে প্রথমত, আমরা নীতি সুদহারগুলো কমিয়েছি। বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রেপো এবং রিভার্স রেপো হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে যথাক্রমে ৬ দশমিক ৭৫ ও ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ব্যাপক মুদ্রা ও বেসরকারি খাতের ঋণ যোগানের প্রবৃদ্ধি প্রক্ষেপিত হয়েছে যথাক্রমে ১৫ শতাংশ ও ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এই লক্ষ্যমাত্রা আগের মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সামান্য কম, তবে প্রকৃত অর্জনের চেয়ে যথেষ্ট বেশি। এই কমতি নীতি সুদহার, যথাযথ ঋণ যোগান এবং ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে আমাদের এই পলিসি রিক্যালিব্রেশন (নীতি পুনঃসমন্বয়) মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে একদিকে কোনো বিঘ্ন ঘটাবে না, অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য যথেষ্ট হবে বলে আমরা মনে করি। বরাবরের মতো এবারেও আমরা বর্তমানের বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা বিবেচনায় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সমন্বয় করতে সদা প্রস্তুত রয়েছি। মাঝপথেও, এই নীতিভঙ্গি পরিবর্তনের সুযোগ অবারিত থাকবে।’

উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং রপ্তানি পণ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমাদের রপ্তানি খাতের আরো উন্নয়ন ঘটাতে হবে উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, ‘শুধু রপ্তানি বাড়ালেই হবে না। এখন সময় এসেছে রপ্তানির পাশাপাশি আরেকটি গ্রোথ-ইঞ্জিন যুক্ত করার। আর সেটি হচ্ছে আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা। তবে আশার কথা, আমাদের তরুণ কর্মক্ষম জনশক্তির সুবিধা, দ্রুত বিকাশমান মধ্যবিত্তের চাহিদা, প্রযুক্তি গ্রহণে তাদের সদা প্রস্তুতি, বাড়ন্ত বাজার পরিধি এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ইঞ্জিনটিকে দ্রুতগতিতে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাই সামনের দিনগুলোতে এই দুই ইঞ্জিনের মধ্যে অভ্যন্তরীণ চাহিদার ইঞ্জিনটিকে আরো শক্তিশালী করাকেই বেশি প্রাধান্য দিতে হবে। সেজন্য আমাদের জাতীয় সঞ্চয়ের হার আরো বাড়াতে হবে এবং সেই সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল খাতে বেশি করে বিনিয়োগ করতে হবে।’

ড. আতিকুর রহমান আর্থিক খাতকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সময় সকল মানুষের কথাই খেয়াল রাখতে হবে। শুধু যারা বেশি ধনবান তাদের সুযোগ করে দিলেই চলবে না, সুবিধাবঞ্চিতদের জন্যও বাড়তি বিনিয়োগের সুযোগ করে দিতে হবে। এটি আমাদের আর্থিক খাতের গভীরতা আরো বাড়াবে এবং একইসঙ্গে তা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। আশার কথা, আমাদের পুরো আর্থিক খাত এই নয়া বাস্তবতা শুধু উপলব্ধিই করছে তাই নয়, স্বেচ্ছায় তার অবদান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্রিয় রয়েছে। সরকারের উন্নয়ন নীতি-কৌশলও এই ধারাতেই রয়েছে।’

গভর্ন বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বোত্তম বিধি-বিধান, সুপারভিশন, নীতি সহায়তা এবং বাজার উন্নয়নের মাধ্যমে সঞ্চয়কারী ও ঋণ গ্রহণকারী উভয়েরই অনুকূল স্বার্থ রক্ষায় অঙ্গীকারাবদ্ধ। আমরা আর্থিক মধ্যস্থতার কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে সুশাসন ও সুপারভিশনের ওপর জোর গুরুত্ব দিয়েছি। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগেই এর প্রমাণ মেলে।’

বাজার উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক বন্ড মার্কেটকে দেশে ও দেশের বাইরে এবং প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের জন্য আরো সুগম করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, ‘বাজার অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দেশীয় বিনিয়োগ ভিত্তিকে বহুমুখীকরণের মাধ্যমে এই বাজারকে আরো লিক্যুইড করা হচ্ছে। এই দীর্ঘমেয়াদি তহবিলকে গতিশীল করার জন্য পেনশন তহবিল এবং বিমা খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আইএফসির আসন্ন টাকা বন্ড বিনিয়োগের জন্য আরো সম্পদের যোগান দিবে এবং মুদ্রা বিনিয়োগ হারের ঝুঁকি কমাতে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করছি। এটি স্থানীয় মুদ্রা বন্ডকে টাকায় মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সহায়তা করবে। আমাদের যথাযথ মুদ্রানীতি ও রেগুলেটরি সমর্থন টেকসই পুঁজিবার উন্নয়নেও সহায়ক হবে। এ ছাড়া, পরিবেশ উন্নয়নে আর্থিক খাতকে কাজে লাগাতে আমরা গ্রিন বন্ড ইস্যুর জন্যও কাজ করছি।’

এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী, আবু হেনা মো. রাজি হাসান, আবুল কাশেম, প্রধান অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পাল, সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ফয়সাল আহমেদ।

মতামত...