,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

বে টার্মিনালকে ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প করার সুপারিশের সিদ্ধান্ত চট্টগ্রাম বন্দর উপদেষ্টা কমিটিসভায়

নিজস্ব প্রতিবেদক, ২৫মার্চ, বিডিনিউজ রিভিউজ.কম:: চট্টগ্রাম বন্দর উপদেষ্টা কমিটির ১০ম সভায়ও সিদ্ধান্ত হয়েছিল, শুক্রবার অনুষ্ঠিত ১১তম সভায়ও একই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। সেটা হলো বে টার্মিনাল নির্মাণকে সরকারের ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের অন্তর্ভূক্ত করার সুপারিশ করা। শুক্রবারের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে বিমান বন্দর পথের যানজট নিরসনে অফডকসমূহকে নগরীর বাইরে দেড় বছরের মধ্যে সরিয়ে নেয়ার। মহেশখালি খালে প্রায় ৫ কোটি টাকায় নির্মিত বাধ জনদুর্ভোগ সৃষ্টির অভিযোগ ওঠায় সেটা অপসারণের বিষয়ে সিটি মেয়রের নেতৃত্বে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সাবেক সাংসদ নুরুল আলম চৌধুরী এবং দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদকে উপদেষ্টা কমিটির সদস্য করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে গতকালের সভায়।

বন্দর ব্যবহারকারী প্রধান সংগঠন বার্থ অপারেটরস, শিপহ্যান্ডলিং অপারেটরস এন্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস এসোসিয়েশন এবং সি এন্ডএফ এজেন্টস এসোসিয়েশনের প্রধানদের কেউ উপস্থিত ছিলেন না।

চট্টগ্রাম বন্দর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র মিলনায়তনে শুক্রবার বিকেলে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সিটি মেয়র আ জ ম নাছিরউদ্দিন, সাংসদ ড. হাসান মাহমুদ, এম আবদুল লতিফ, সামশুল হক চৌধুরী, নজরুল ইসলাম চৌধুরী, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব অশোক মাধব রায়, মহানগর পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার, কাস্টমস কমিশনার এম আবদুল্লাহ, চিটাগাং মেট্রোপলিটন চেম্বার সভাপতি আলহাজ খলিলুর রহমান, চিটাগাং চেম্বার পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ, বিজিএমইএ পরিচালক এ এম মাহবুব চৌধুরী, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার এসোসিয়েশনের শংকর কুমার দাস, প্রমুখ। বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবাল সভায় বিভিন্ন বিষয়ে সভাকে অবহিত করেন। অন্যদের উপস্থিত ছিলেন সাংসদ এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য ( প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলমসহ বন্দরের বিভিন্ন কর্মকর্তা এবং বন্দর ব্যবহারকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ বে টার্মিনাল প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের ব্যাপারে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি বিমান বন্দর মুখী সড়কে যানজট নিরসনে বিশেষত সকালে এবং বিকেলে পিকআওয়ারে ট্রেইলর চলাচল বন্ধ রাখার আহ্বান জানান। তা করা হলে কোন যানজট থাকবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রতিমন্ত্রী সিমেন্ট কারখানার কাঁচামাল ক্লিংকার, স্ল্যাগ দ্রুত খালাসে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতি।

সাবেক পরিবেশ ও বন মন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ আগামীতে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, স্বপ্নের সব বন্দর চালু হলেও ১০ বছর পরেও দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ৮০ ভাগ চট্টগ্রাম বন্দরকে সামাল দিতে হবে। বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্রুত বে-টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু আজও এটাকে সরকারের ফাস্ট ট্র্র্যাক প্রকল্পের অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। দ্রুত পণ্য ওঠানো-নামানোর জন্য বন্দরকে প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট সমৃদ্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, সব প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রম একই সঙ্গে না নিয়ে অগ্রাধিকার তালিকা করে সেভাবে কাজে হাত দিতে হবে। নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালকে যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ করা আবশ্যক। এতদিনেও তা না হওয়াটা দুঃখজনক। পানগাঁও টার্মিনাল ৩ বছরেও পূর্ণ ক্ষমতায় চালু করা যায়নি। আগামী ৩ বছরেও সেভাবে চালুর সম্ভাবনা নেই। অবস্থানগত ত্রুটির কারণে সেটা হচ্ছে না। সাবেক মন্ত্রী বলেন, নগরীতে অফডক গড়ে তোলা ঐতিহাসিক ভুল। এর জেরে ভয়াবহ যানজটে বিমান বন্দর যাওয়া যায় না ২ ঘণ্টায়ও। বিদেশি বিনিয়োগকারী যখন তা দেখে তখন তাদের বিতৃষ্ণা এসে যায় এখানে বিনিয়োগের প্রতি। তা থেকে পরিত্রাণ প্রয়োজন।

চিটাগাং মেট্রোপলিটন চেম্বার সভাপতি শিল্পপতি আলহাজ খলিলুর রহমান বলেন, অফডক নীতিমালার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন আবশ্যক। এ ব্যাপারে গঠিত একটি কমিটির কোন সভা ডাকা হয়নি আজো। তিনি জানান, তাঁর মালিকানাধীন অফডকটি চলছে লোকসানে। গত ৫/৭ বছরে আড়াইশ’ কোটি টাকা লোকসান গুণতে হয়েছে। তিনি বলেন, অফডকসমূহ দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে সচল রেখেছে। এগুলো বন্ধ হয়ে গেলে বন্দর অচল হয়ে যাবে। তিনি আমদানি রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক অস্বাভাবিক চার্জ আদায়ের অভিযোগ করেন।

সাংসদ এম আবদুল লতিফ বলেন, নগরীর ১০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত অফডকগুলোর ৮/৯ হাজার হেভি গাড়ি প্রতিদিন চলাচল করে। এরদরুন বন্দর এলাকায় যানজট তৈরি হয়। প্রচুর জনঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে তাতে। সব অফডককে নগরীর ২০ কিলোমিটার বাইরে নিয়ে সরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানান। মহেশখালি খালের বাঁধ অপসারণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই বাঁধের অপরিনামদর্শীতায় জলাবদ্ধতার শিকার হালিশহর পতেঙ্গার জনসাধারণ বন্দর ঘেরাও করবে। স্লুইস গেইট না দিয়ে এই বাঁধ দেয়া হয়েছে।

চিটাগাং চেম্বারের পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বন্দরের যন্ত্রপাতি সংগ্রহে ইনডেমনিটির ব্যবস্থা রাখা এবং বহির্নোঙ্গরে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য লাইটারিংয়ের জন্য ইকুইপমেন্ট নেয়ার সুবিধার জন্য পৃৃৃথক লাইটারেজ জেটির আহ্বান জানান।

সভায় বিভিন্ন বক্তা ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বন্দরের চলমান প্রবৃদ্ধিকে সামনে রেখে সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। তারা বলেন, প্রস্তাবিত বে টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বন্দরকে যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ করা প্রয়োজন। ক্যাপিটাল ড্রেজিং না হওয়ায় কর্ণফুলী ধীরে ধীরে নাব্যতা হারাচ্ছে এবং বন্দরকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

সভাশেষে মন্ত্রী শাজাহান খান সভায় গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে জানান। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বে টার্মিনাল নির্মাণকে সরকারের ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প হিসেবে নেয়ার জন্য সুপারিশ করা, দেড় বছর সময় দিয়ে নগরীর বাইরে অফডক সরিয়ে নেয়ার জন্য নোটিস প্রদান, মহেশখালি খালের বাঁধ অপসারণ বা স্লুইস গেইট নির্মাণের ব্যাপারে সিটি মেয়র, স্থানীয় সাংসদ, ওয়ার্ড কাউন্সিলরবৃন্দ এবং বন্দরের প্রকৌশল বিভাগের সমন্বয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করে অবিলম্বে সিদ্ধান্ত নেয়া ও কার্যকর করা। কর্ণফুলীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং শিগগির শুরু হবে বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন।

শুক্রবার সকালে বন্দর জেটিতে মন্ত্রী শাজাহান খান নিউমেটিক কনভেয়র ও ব্যাগিং মেশিনের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, এই ব্যবস্থায় পণ্য খালাসে প্রচুর সময় সাশ্রয় হবে। বর্তমানে জাহাজ থেকে যে মাল খালাসে ১০ দিন থেকে ১২ দিন সময় লাগে, সেক্ষেত্রে এখন লাগবে মাত্র ৩দিন। অর্থাৎ পণ্য আমদানিতে ‘কস্টিং’ হ্রাস পাবে ব্যাপকভাবে। নেদারল্যান্ডস থেকে আমদানি করা হয়েছে অত্যাধুনিক নিউমেটিক কনভেয়র বেল্ট। চাল, ডাল, গম, সরিষা এবং আরও বিভিন্ন পণ্য আমদানি হয় খোলা অবস্থায়। বর্তমানে শ্রমিকরা জাহাজের হ্যাচে প্রবেশ করে এসব পণ্য ওজন করে বস্তায় ভর্তি করে। এরপর জেটিতে অপেক্ষমান ট্রাকে বোঝাই করা হয়। জাহাজের হ্যাচ থেকে ট্রাকে বোঝাই করা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ধুলো-বালি উড়ে বাতাসকে দূষিত করে। আর এই পরিবেশে চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হয় শ্রমিকদের। আমদানিকারকের খরচও বেড়ে যায় এই প্রক্রিয়ায় মাল খালাসে।

মতামত...