,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

ভাঙনের মুখে জাতীয় পার্টি

1002মীর মুহাম্মদ নাছির উদ্দীন সিকদারঃ জাতীয় পার্টির নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও তার স্ত্রী রওশন এরশাদ নিজেদের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব নিয়ে প্রকাশ্যে বিরোধে জড়িয়ে পডেছেন। একে  অপরের বিরুদ্ধে সংবাদ ও পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে এরশাদ ও রওশন  এখন মুখোমুখি। দুজনের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে দলীয় কোন্দল ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এত দিন কোন্দল প্রকাশ না হলেও গেল দুই দিনের ব্যবধানে জাতীয় পার্টির অবস্থা বেহাল।

রংপুর সফরে  গিয়ে দলের এক সভায় এরশাদ তার ছোট ভাই জি এম কাদেরকে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান এবং প্রাক্তন মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারকে দলের জাতীয় সম্মেলনের প্রস্তুতি কমিটির সদস্যসচিব ও  শিগগিরই মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে আসবে জাতীয় পার্টি এমন ঘোষণায়  জাপায় প্রতিক্রিয়ার শুরু হয়। নড়েচড়ে বসেন সরকারে থাকা জাতীয় পার্টির তিন মন্ত্রীসহ জি এম কাদের ও হাওলাদারের বিরোধীরা।

এরশাদের আকস্মিক এ ঘোষণায় জাপার একাংশে স্বস্তি ফিরলেও অপর অংশের নেতাকর্মীরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। জাপার গঠনতন্ত্রে কো-চেয়ারম্যানের কোনো পদ নেই বলে তারা এ ঘোষণাকে গঠনতন্ত্রবিরোধী বলে অভিহিত করেছেন।জাপার রওশনপন্থী হিসেবে পরিচিত বর্তমান সরকারের তিন মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু, মশিউর রহমান রাঙ্গা ও দলের মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুসহ বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য ও জ্যেষ্ঠ নেতা জাপার গঠনতন্ত্রে কো-চেয়ারম্যানের কোনো পদ না থাকলেও এরশাদের এ সিদ্ধান্তে প্রতিক্রিয়া জানান ।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ ছোট ভাই জি এম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান করার মধ্য দিয়ে নতুন বছরের শুরুতেই জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে চমক সৃষ্টি করেছেন। একই সাথে পার্টিতে নিজের উত্তরসূরি ঘোষণা করে নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের চাওয়াও তিনি পূরণ করলেন বলে অনেকেই মনে করছেন। রংপুরে জাতীয় পার্টি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দিয়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, আজ থেকেই জিএম কাদের দলের কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন এবং আমার অবর্তমানে দলের হালও ধরবেন তিনি। এত দিন রওশন নিজেকে দলের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে মেনে আসছিলেন। এরশাদের এ ঘোষণায় তার এ ধারণায় ছন্দপতন ঘটেছে। ফলে, এরশাদের এ ঘোষণার বিরুদ্ধে নিজেকে পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা  করেন রওশন।

জাপার মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু রওশনকে দলের ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন’ করার একদিন পর আজ মঙলবার দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে জাতীয় পার্টির মহাসচিব পদ থেকে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে অব্যাহতি দিয়ে রুহুল আমিন হাওলাদারকে ফের মহাসচিব ঘোষণা করেছেন দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।সংবাদ সম্মেলনে এরশাদ বলেন, রওশনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন ঘোষণা দেয়ার বাবলু কে?

1001জাপার সুত্রে প্রকাশ, মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগে রাজি নয় দলের এমন তিন মন্ত্রীসহ জি এম কাদের ও হাওলাদার বিরোধীরাই মূলত এরশাদের বিরুদ্ধে পাল্টা অবস্থান নিতে রওশনকে প্ররোচনা দিচ্ছেন। তারাই হঠাৎ করে এরশাদের পক্ষ ত্যাগ করে রওশনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। জানা গেছে, আজকের এরশাদ বিরুধিরাই কিছুদিন আগে রওশনকে মাইনাস করার খেলায় মেতেছিলেন। আজ আবার তারাই জি এম কাদের ইস্যু নিয়ে এরশাদকে মাইনাস করার চেষ্টা করছেন।

জানা গেছে, জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান ঘোষণার পর গেল দুদিনে রওশনের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন তিন মন্ত্রী ও দলের মহাসচিবসহ শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন। শেষ পর্যন্ত তারা রওশনকে এরশাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে যেতে সক্ষম হন।ফলে, এরশাদের এ ঘোষণার বিরুদ্ধে নিজেকে পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন রওশন।

জাপার একটি সূত্র জানায়, জাতীয় পার্টি শিবিরে আগ থেকেই দলের ফ্রন্ট লাইনে নেতৃত্বের প্রশ্নে জি এম কাদের ও প্রাক্তন মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারের ব্যাপারে রওশনের আপত্তি ছিল। সেই ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান মহাসচিবরা।  জি এম কাদের কে জাপার কো-চেয়ারম্যান করায় এরশাদের পরে জাতীয় পার্টির সর্বেসর্বা হবেন এবং জাপায় রওশন গুরুত্বহীন হয়ে যেতে পারেন। অপর দিকে রুহুল আমিন হওলাদারকে পার্টির জাতীয় সম্মেলনের সদস্য সচিব করায় তিনি আগামি দিনে জাতীয় পার্টির ফ্রন্টলাইনে চলে আসতে পারেন। এই সকল কারনই  রওশন ও বাবলুকে জাপায় ক্ষমতাহীন হওয়ার দূশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। এসব আশঙ্কা থেকে দলের মহাসচিব গ্রুপ টি   হঠাৎ করে প্রকাশ্য এরশাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নিজেদের আসন থিকিয়ে রাখতে মরিয়া হয়ে উটে। এর ফলে রওশনের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করে এরশাদকে ঘায়েল করতেই সোমবার সন্ধ্যায় রওশনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করে।

ফলে, জাপা্র আগামি দিনের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব নিয়ে বর্তমানে এরশাদ রওশন দুজনই মুখোমুখি অবস্থানে। দুজনের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে  সারা দেশের জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরাও এখন বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। কেউ এরশাদের পক্ষে, কেউ রওশনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

এছাডাও  আগামিতে জাতিয় পাটির সদস্যদের মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে আসার মতো সিদ্ধান্ত আসতে পারে জেনে জি এম কাদেরের ইস্যুকে পুঁজি করে দলের একটি গ্রুপ রওশনকে এরশাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছেন। হঠাৎ করে  রওশনের পক্ষ নিয়ে তারা নিজেদের ফায়দা লুটতে চাইছেন বলেও  জাপার অনেক নেতাই অভিযোগ করেছেন।

হঠাৎ করেই জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এ পরিবর্তন নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে থাকা, না থাকা নিয়ে নানান নাটকীয়তার কারণে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল দলটি। শেষ পর্যন্ত ৪০ জন সংসদ সদস্য নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে জাতীয় পার্টি। বিরোধীদলীয় নেতা হন তার স্ত্রী ও দলের সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদ। পাশাপাশি মন্ত্রিসভায়ও যোগ দেয় দলটি। পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদ নিজে হন মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। তিনজন নেতার স্থান হয় মন্ত্রিসভায়। একই সাথে সরকারে ও বিরোধী দলে থাকায় দলটি নানামুখী সমালোচনার মুখে পড়ে। দেশে-বিদেশে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও এর কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই দলটির নেতাদের কাছে। টিআইবি জাতীয় পার্টির এ দ্বৈত ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে। নেতাকর্মীদের মধ্যেও দলের এ ভূমিকায় সৃষ্টি হয় চরম হতাশা। এরশাদ নিজেও এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার কথা মাঝে মধ্যেই তুলে ধরেন। জাতীয় পার্টির এ ভূমিকা নিয়ে রওশন এরশাদের সাথেও বিরোধ দেখা দেয় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের।

এরশাদের ঘনিষ্ঠ জাতীয় পার্টির এক প্রেসিডিয়াম সদস্য জানান, পার্টির চেয়ারম্যান দলের গঠনতন্ত্রের ৩৯ ধারার ক্ষমতা বলে যেকোনো সময় যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কারো সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই একইভাবে এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে জিয়াউদ্দিন বাবলুকে দলের মহাসচিব করেছিলেন। তখন তো এসব নেতা চুপ ছিলেন।

পার্টির এক অপর এক প্রেসিডিয়াম জাপার চেয়ারম্যান হিসাবে তিনি দলের কোনো নেতার বিরুদ্ধে  যদি কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, কিংবা পার্টির গঠনতন্ত্র বিরোধী কাজ করে থাকেন, তাহলে তা দলীয় ফোরামে তা আলোচনা করা যেত। পার্টির চেয়ারম্যান বহাল থাকা অবস্থায় অতি উৎসাহী হয়ে রওশনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করা কি তারা বৈধ কাজ করেছেন। এসব অপকর্ম দলের সঙ্গে বেইমানি ছাড়া আর কিছু নয়। জিয়াউদ্দিন বাবলুদের প্ররোচনায় রওশন এরশাদকে দিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

মতামত...