,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

ভিন্ন ধর্মের জঙ্গি !

hindo moslim jangi

মুছা (পিক্লু দাশ ) ও সাইফুল্লাহ ( সুজিত দেব নাথ)

নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ রিভিউজঃ  জঙ্গিদের চোখ এখন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের দিকে ! জঙ্গি কর্মকান্ড পরিচালনার অভিনব কৌশল এটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করছেন, এটা জঙ্গি কর্মকাণ্ড পরিচালনার বিভিন্ন কৌশলের  নেপথ্যে কাজ করছে জামায়াত শিবির। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে নানা কায়দায় মগজ ধোলাইয়ের মাধ্যমে তারা কৌশলে এ কাজটি করে আসছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাগণ বিষয়টিকে এখনো উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন না। তাদের মতে জঙ্গি হওয়ার জন্য ধর্মান্তরিত হয়েছে এমনটি এখন পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। তবে ধর্মান্তরিত হওয়ার পর জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পেয়েছেন তারা।

aজানা গেছে, একটা সময় অশিক্ষিত কিংবা স্বল্প শিক্ষিত হতদরিদ্রদের দারিদ্রতাকে পুঁজি করে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো নিজেদের দল ভারি করতো। মাঠে নামানোর আগে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের পাশাপাশি চলতো মগজ ধোলাইয়ের কাজটিও। আর্থিক নিশ্চয়তা এবং বেহেশতের লোভ দেখিয়ে তাদের দিয়ে চালানো হতো নাশকতামূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড। বর্তমানে হতদরিদ্রের পাশাপাশি সমাজের উচ্চশিক্ষিত তরুণদেরও জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি ধর্মান্তরিত হয়েছে এমন একটি শ্রেণীকে জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত হয়ে পড়ার প্রমাণ মিলছে সম্প্রতি। এরকম শতাধিক ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ধর্মান্তরিত হয়ে জঙ্গি সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে দেশে বিভিন্ন এলাকায় নাশকতাসহ বোমা হামলা ও গুপ্তহত্যা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে জঙ্গি বিরোধী অভিযান কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তা। তাদের কাছে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে দেয়া হচ্ছে ভুল ব্যাখ্যা। সীতাকুণ্ড থেকে গত ১১ জুলাই আটক আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের বায়তুল মাল সম্পাদক মুসয়াদ ইবনে উমায়ের (২৫) ধর্মান্তরিত হয়ে পরবর্তীতে জঙ্গি সংগঠনে যোগ দেন। তার বাবার নাম অরুণ কান্তি দাশ। তাদের বাড়ি পটিয়া উপজেলার ছনহরা গ্রামে। আগে তার নাম ছিল পিকলু দাশ। সে পোশাক প্রস্তুককারক প্রতিষ্ঠান ইয়াং ওয়ানে চাকরি করলেও আড়ালে যুক্ত ছিলেন জঙ্গি সংগঠন এবিটির সঙ্গে। তার সম্পর্কে অনুসন্ধানে জানা যায়, হিন্দু থাকাবস্থায় তার কলেজের এক মুসলিম মেয়ের প্রেমে পড়ে ধর্মান্তরিত হয়ে জঙ্গি সংগঠনে যোগ দেয় সে। ২০১১ সালে বাড়ি থেকে চলে যায় সে। তার প্রায় মাস খানেক পর তার পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে একটি ডায়েরি পাওয়া যায়। প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা ছিল, ‘মালিক আল্লাহ’, পরের পৃষ্ঠায় লেখা ছিল, ‘হ্যাপী নামের মুসলিম এক মেয়েকে আমি ভালোবাসি। তাকে বিয়ে করার জন্য আমি মুসলিম হয়ে যাব।’

মুসায়ার ওরফে পিকলুর পারিবারিক অবস্থা প্রসঙ্গে পুলিশ জানিয়েছে, পটিয়া উপজেলা ছনহরা ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড অরুণ কান্তি দাশ ও ঝর্না দাশের ছেলে সে। তার বাবা রিয়াজউদ্দীন বাজার এলাকায় ব্যবসা করতেন। নগরীতে সপরিবারে ভাড়া বাসায় থাকতো পিকলুরা। ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম রেলওয়ে সিটি কর্পোরেশন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে পিকলু দাশ এবং চট্টগ্রাম ইসলামীয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে সে। তার মায়ের তথ্য মতে ২০১০ সালের শেষের দিকে নগরীর বাসায় পিকলুর ৩ জন বন্ধু আসা যাওয়া করতো। তারা ৪ জন মিলে দরজা বন্ধ করে প্রায় ২-৩ ঘণ্টা আড্ডা দিত। ওরা ছিল মুসলিম। ছেলের কলেজের বন্ধু হিসেবে তার মা বাবা ঐ তিনজনকেও নিজের ছেলের মতোই দেখতেন। ২০১১ সালে জানুয়ারি মাসে বাসায় কিছু না বলে পিকলু চলে যায়। চলে যাওয়ার দুইদিন পর বাসায় এসে মাকে ভাত দিতে বলে। তার মা ছেলেকে কৈ মাছ রেঁধে ভাত খেতে দেন। খেয়ে সেই যে চলে যায় আর ফিরে আসে নি। পিকলু ছাড়া তাদের আরো দুই মেয়ে এক ছেলে রয়েছে। ছেলে মুসলিম হওয়ার খবর শুনে তার বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত।

বাকি তিন সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে অরুণ কান্তি দাশ ও ঝর্ণা দাশ দম্পতি পিকলুর ধর্মান্তরিত হওয়ার শোক কাটিয়ে উঠছিলেন। এরই মধ্যে শুনেন তার জঙ্গি হওয়ার কথা। পিকলুর মা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যে ছেলেকে ১০ মাস ১০ দিন পেটে ধরেছি সে যদি জঙ্গি হয়ে যায় তার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নাই।

একইভাবে ঢাকার গুলশান-২ এর হলি আর্টিজান বেকারি ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নিখোঁজ যে ১০ যুবকের ছবিসহ নাম প্রকাশ করা হয়েছে তাদের একজন জাপান প্রবাসী মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ ওজাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার জিনদপুর ইউনিয়নের কড়ইবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা জনার্ধন দেবনাথের ছেলে সুজিত দেবনাথ। তিনি সিলেট ক্যাডেট কলেজের ছাত্র ছিলেন। এমনটি দাবি করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। সম্প্রতি তার নাম ঠিকানা যাচাইয়ে বাড়িতে পুলিশ গেলে তার পরিবার বিষয়টি জানতে পারে।

সুজিতের বাবা জনার্ধন দেবনাথ জানান, গত ১৪ মাস আগে জিনদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুর রউফের বাসায় এসে সুজিত আমাদের খবর দিলে আমরা সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করি। এক ঘণ্টা পরই সে ঢাকায় চলে যায়। সুজিত জাপান চলে যাওয়ার পর গত এক বছর আগে ফোনে সর্বশেষ কথা হয়েছিল, তবে সে নিখোঁজ কি-না সেটি আমরা জানি না। তিনি আরো জানান, সুজিত সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে মেধা তালিকায় স্থান নিয়ে এসএসসি এবং এইচএসসি পাস করে। ২০০১ সালে জাপান সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে সেদেশের এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে জাপানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। সুজিত জাপানেই হিন্দু থেকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে জাপানি এক মেয়েকে বিয়ে করে মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ ওজাকি নাম ধারণ করেন। বর্তমানে সুজিত ওরফে সাইফুল্লাহ চার ছেলে এক কন্যা সন্তানের জনক বলে জানা গেছে।

ধর্মান্তরিত হয়ে জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট হওয়া কীসের প্রলোভনে জানতে চাইলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর ড. মইনুল ইসলাম আজাদীকে বলেন, এটা কোন প্রলোভনের কারণে তো নয়, এটা এক ধরনের সম্মোহনের কারণে হয়েছে। তিনি বলেন, প্রক্রিয়াটাতো অত্যন্ত দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়া। এটা একবার মাথায় ঢুকলে, তার মধ্যে সত্য মিথ্যা যাচাইয়ের ক্ষমতা লোপ পেয়ে যায়। এর নেপথ্যে জামাত শিবির আছে দাবি করে ড. মইনুল বলেন, ধর্মকে এই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া -এটা সারা বিশ্বেই ঘটছে। বাংলাদেশেও অনেকদিন থেকে জামাত শিবির এটা করছিল। আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, জেএমবি, হিযবুত তাহরীর -নাম যা-ই হোক না কেন, এগুলো সবগুলোই জামাতের পকেট অর্গানাইজেশন। জামাত শিবির নিজেদের প্রয়োজনে একেক সময় একেক সংস্থার জন্ম দিচ্ছে। এগুলোকে আমি আলাদা করে দেখি না। সুতরাং ফোকাসটা জামাত শিবির থেকে অন্যদিকে সরিয়ে নেয়া ঠিক না।

মুক্তির উপায় কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, জামাত শিবিরকে নির্মূল করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে হবে। তা না হলে এখান থেকে আমাদের সহজে মুক্তি নেই। ১৯৭৬ সাল থেকে গত ৪০ বছরে জামাত শিবিরের কয়েক লাখ ফলোয়ার হয়ে গেছে এবং ফাইনেনসিয়ালিও তারা অত্যন্ত শক্তিশালী। তাদের অপতৎপরতা বর্তমান পর্যায়ে চলে এসেছে। তারা বলে ইসলামী ছাত্র শিবির একটা আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তার মানে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। তাদের কাছে শিবিরের এই মক্তবগুলো কারখানাগুলোই আসল। একবার কেউ ফাঁদে পড়লে তার জীবনে কোন মুক্তি নেই। মগজ ধোলাইটা এমন একটা পর্যায়ে চলে এসেছে যে তারা মনে করে মরে গেলেতো আমাদের জন্য বেহেশতের দ্বার খোলা আছেই। লোভনীয় একটা ব্যাপার। এ ধরনের ধর্মান্ধতা অবশ্যই বড় উদ্বেগের কারণ।

ড. মইনুল ইসলাম বলেন, আগে আমরা বলতাম যে যারা শিবির করে তারা এটার মধ্যে পড়ছে। এখন শিবিরের পকেট থেকে বেরুনো হিযবুত তাহরীর টার্গেট করেছে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এটাও জামাত শিবিরের একটা কৌশল। টার্গেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক। সেজন্য নর্থ সাউথের বড়লোকের ছেলে মেয়েরা এখানে এসে গেছে। এটা নিয়ে বেশি বলতে চাইছি না, কারণ পুরো জিনিসটা এখনো পরিষ্কার হয় নি। ভবিষ্যতে হয়তো আরো পরিষ্কার হবে।

ধর্মান্তকরণ বড়ো ব্যাপার নয় জানিয়ে ড. মইনুল বলেন, ধর্মান্তকরণের মধ্যে একটা চয়েসের ব্যাপার আছে। তাছাড়া তাকে এমনভাবে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে যে সে হিন্দু থেকে আসলো নাকি মুসলিম পরিবার থেকে সেটা বড়ো কথা নয়। সেখানে হয়তো ধর্মের প্র্যাকটিস বলতে কিছুই নেই। সে ট্র্যাপে পড়ে অমন একটা পর্যায়ে চলে যায়। এই যে পাঁচ মাস ছয় মাস একবছর যে নিখোঁজ ঐ সময়টাতেই তাকে প্রচণ্ডভাবে মগজ ধোলাইয়ের শিকারটা করা হয়।

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, জঙ্গি হওয়ার জন্য তারা ধর্মান্তরিত হচ্ছে -এমনটা আমরা এখনো পাইনি। সে ধর্মান্তরিত হয়েছে এক কারণে। এরপর জাকির নায়েকের বক্তব্য কিংবা জসিমউদ্দিন আনসারির বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে কিংবা অন্য কোন কারণে জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

 

মতামত...