,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

মংডু-বুচিডং মৃত্যুপুরী: লক্ষাধিক রোহিঙ্গা পাড়ি দেয়ার অপেক্ষায়

কক্সবাজার সংবাদদাতা, ১৪ সেপ্টেম্বর, বিডিনিউজ রিভিউজ.কম::মিয়ানমারে সেনাবাহিনী ও জাতীয়তাবাদী উগ্র মগ সম্প্রদায় রাখাইন রাজ্যের মংডু ও বুচিডং এলাকায় ব্যাপক তাণ্ডব চালানোর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এসব এলাকা থেকে আসা রোহিঙ্গাদের প্রায় সকলে নিজ বসতবাড়ি সহায় সম্পদ, আত্মীয়–স্বজন হারানো। সর্বশেষ মঙ্গলবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দক্ষিণ মংডু এলাকার অন্তত ১৯টি রোহিঙ্গা গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব এলাকা ও বুচিডং এলাকার কয়েক লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নাফ নদীর ওপারে সীমান্তের নো ম্যান্স ল্যান্ডে বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষা করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। কার্যত রাখাইনের মংডু ও বুচিডং এলাকা এখন মৃত্যু পুরীতে পরিণত হয়েছে।

বুধবার বেলা ১১টার দিকে উখিয়ার বালুখালী ঢালায় নতুনভাবে রোহিঙ্গাদের গড়ে উঠা আশ্রয় স্থলে সদ্য আশ্রয় নেয়া দক্ষিণ মংডুর গৌজদিয়া গ্রামের আব্দুল হামিদ (৫৫), কোনকার পাড়ার জমিলা খাতুন (৪৫) জানালেন টেকনাফের দমদমিয়া এলাকা থেকে নাফ নদী পেরিয়ে একটু পূর্ব থেকে তাদের গ্রাম। সেখানে প্রায় সাড়ে ৩শ’ পরিবারের বসবাস। মংডু শহরের প্রায় কাছাকাছি হওয়ায় এতদিন তারা মোটামুটি নিরাপদ থাকলেও সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কয়েক’শ সৈন্য ও উগ্রপন্থি মগরা এসে গ্রাম ঘিরে ফেলে। সেনাবাহিনী আসতে দেখে গ্রামবাসী বুঝতে পারে তাদের গ্রামে হামলা চালানো হবে। তাই গ্রামবাসী যে যেটি পেরেছে সেটি নিয়ে ছেলে মেয়ে সহ ঘরবাড়ি থেকে বের হয়ে দূরে খাল পাড়ে চলে আসে।

স্থানীয় মুখ বাধা বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা ঘরবাড়ি তল্লাশি করে মূল্যবান সহায় সম্পদ লুট করে এক জায়গায় নিয়ে আসে। তারা জানান, গ্রাম থেকে একটু দূরে হওয়ায় সব কিছু দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু কিছু করার ছিল না। ঘরের মালামাল বের করার পর বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা ঘরগুলোতে পেট্রোল ঢেলে দিয়ে একের পর এক আগুন লাগাতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো পাড়া জ্বলে ছাই হয়ে যায়। উপায়ান্তর না দেখে গ্রামের শত শত লোকজন প্রাণ বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য নাফ নদীর পাশে চলে আসে। গতকাল ভোরে ও রাতে অনেক লোক নৌকা দিয়ে নাফ নদী পেরিয়ে বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

এখানে আসার পর কে কোন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে তার কোন হদিস নেই। তারা জানান এভাবে গত তিন দিনে দক্ষিণ মংডুর কোয়াং তা কার, কোনকার পাড়া, বড়ডেল, গৌজদিয়া ইউনিয়নের প্রায় ১৯টি পাড়া গ্রাম সেনাবাহিনী, বিজিপি ও পুলিশের উপস্থিতিতে রাখাইন মগ সন্ত্রাসীরা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। মংডু থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে বুচিডং এলাকার বরগিবিল থেকে পালিয়ে এসে ঘুমধুম রাবার বাগানে আশ্রয় নেয়া খাইরুল বশর (৪০), জোলাপাড়া থেকে আসা আব্দুল হামিদ (২৮) জানালেন আরো করুন চিত্রের কথা। তাদের মতে, বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে একটু দূরে হওয়ায় বুচিডং এলাকার নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের অনেকে পথে, জঙ্গলে, ধান খেতে, খাল পারে আটকা পড়ে রয়েছে। এসব এলাকায় গত এক সপ্তাহ ধরে রোহিঙ্গা গ্রাম পাড়াগুলো একের পর এক জ্বালিয়ে দিচ্ছে বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা একই কায়দায়। বুচিডং এলাকার বিভিন্ন পাড়া গ্রাম থেকে অনেক লোক আসতে পারলেও এখনো বিভিন্নস্থানে সেনাবাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধদের ভয়ে নানা স্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এসব লোকজন ১০/১২ দিন ধরে প্রায় না খেয়ে অভুক্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। এদের অধিকাংশ নারী ও শিশু বলে তারা জানান। এদের মধ্যে অনেক নারী ও শিশু, বৃদ্ধ নানাভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তাদের মতে, মংডু দক্ষিণ ও বুচিডং এলাকার প্রায় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসার জন্য অপেক্ষা করছে।

মংডু ও বুচিডং থেকে আসা লোকজন ও মিয়ানমার সরকারি তথ্যমতে, পুরো রাখাইন রাজ্যে প্রায় ১১ লক্ষ রোহিঙ্গা নাগরিকের বসবাস। সেখানে শুধু মংডু এলাকায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ৫ লক্ষাধিক ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মাত্র ৩০ হাজারের মত। আর বুচিডং এলাকায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় আড়াই লক্ষ। সেখানে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রয়েছে ৪৫ হাজারের মত। মংডু জেলার মংডু ও বুচিডং অঞ্চলে প্রায় সাড়ে সাত লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বসবাস। আর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজনের সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার। অর্থাৎ এ দুই অঞ্চলে মোট জন সংখ্যা প্রায় ১০ ভাগ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও ৯০ ভাগ রোহিঙ্গা মুসলমান। মিয়ানমার সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে জাতিগত শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে বর্তমান অং সান সুচির সরকারের আমলে গত বছরের অক্টোবর থেকে গত ২৫ আগস্ট পর্যন্ত দুই দফা পরিচালিত অভিযানে রোহিঙ্গা মুসলিমদের রাখাইন রাজ্য থেকে সমূলে বিতাড়িত করতে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বলে অভিযোগ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের।

রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানায়, ইতোমধ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীরা উক্ত রাজ্যের রোহিঙ্গা সংখ্যাধিক্য মংডু ও বুচিডং অঞ্চলের রোহিঙ্গা গ্রাম ও পাড়াগুলোতে চরম নির্যাতন ও লুটতরাজ চালিয়েছে। এ দুই অঞ্চলের প্রায় ৮৫ শতাংশ রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, দোকানপাট সহ অন্যান্য স্থাপনা অগ্নি সংযোগ করে ছাড়খার করে দিয়েছে। এসব রোহিঙ্গা গ্রাম থেকে লুটে নিয়েছে কয়েক হাজার কোটি ডলারের সম্পদ। হত্যা করেছে প্রায় ৫ হাজার রোহিঙ্গা নাগরিকদের। ধর্ষণ করেছে শত শত মহিলা ও শিশুদের। কার্যত রাখাইনের এ দুইটি রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চলকে প্রায় রোহিঙ্গা শূণ্য করে দিয়ে মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনী চরম মানবতা বিরোধী অপরাধ করছে বলে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনের অভিযোগ। এ দুইটি এলাকা ছাড়াও রোহিঙ্গা অবস্থান রাচিডং অঞ্চলেও সেনা নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তবে এটি বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে অনেক দূরে ও দুর্গম হওয়ায় সেখানকার লোকজন প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। গতকাল বুধবারও উখিয়া থেকে টেকনাফ সড়কে রোহিঙ্গা আগমনের ঢল লক্ষ করা গেছে। এ এক কঠোর বিশৃংখল পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। রোহিঙ্গাদের দাবি– পুরো মংডু ও বুচিডং অঞ্চলকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীরা ম্যাসাকার করে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে।

মতামত...