,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

মাগুছড়া ট্রাজেডি দিবস আজ, ৩ কোম্পানীর হাত বদল

magosra gaspiklu chakrobortyপিকলু চক্রবর্তী, সিলেট সংবাদদাতা, বিডি নিউজ রিভিউজ ডটকমঃ  আজ মাগুরছড়া দিবস। ১৯৯৭ সালের এই দিনে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের মাগুরছড়া গ্যাসকূপ বিষ্ফোরণ হয়। মুহুর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ছাই হয়ে যায় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের গাছ-পালা,জীবজন্তু সহ আশ পাশের বিস্তীর্ন এলাকা। এখনো ক্ষতিপুরনের দাবীতে আন্দোলন করছে এলাকাবাসি। ১৯ বছর পরও গ্যাস উত্তোলনকারি মার্কিন কোম্পানির কাছ থেকে ক্ষতিপুরণ  আদায় করতে পারেনি সরকার।
১৯৯৭ সালের ১৪ জুন মধ্যরাতে ১টা ৪৫ মিনিটে মাগুরছড়া গ্যাসকূপে বিস্ফোরণের প্রচন্ড শব্দে কেঁপে ওঠে ছিল গোটা কমলগঞ্জ।  প্রায় ৫০০ ফুট উচ্চতায় লাফিয়ে উঠা আগুনের শিখায় গ্যাসফিল্ড সংলগ্ন লাউয়াছড়া রিজার্ভ ফরেষ্ট, মাগুরছড়া খাসিয়াপুঞ্জি, জীববৈচিত্র্য, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, ফুলবাড়ী চা বাগান, সিলেট-ঢাকা ও সিলেট- চট্টগ্রাম রেলপথ এবং কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সড়কে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। পরিবেশ সংরক্ষণবাদীদের তথ্য মতে, ৬৩ প্রজাতির পশু-পাখির বিনাশ সাধন হয়। সিলেটের সঙ্গে সারাদেশের রেলযোগাযোগ ১৬৩ দিন বন্ধ থাকে। মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছিল ১৫ হাজার কোটি টাকা।
বিভিন্ন সংগঠন মাগুরছড়া দুর্ঘটনার যথাযথ ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবিতে আন্দোলন পরিচালনা করে এলেও দীর্ঘ ১৯ বছরেও ক্ষতিগ্রস্থদের দাবিকৃত ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।  গঠিত তদন্ত্র কমিটির রিপোর্ট আজ পর্যন্ত জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। মাগুরছড়া দুর্ঘটনার  ক্ষতিপূরণ আদায় নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার কারণে আজো ক্ষতিপূরণ না পেয়ে মৌলভীবাজার তথা সিলেটের জনমনে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে।
মার্কিন অক্সিডেন্টাল কোম্পানী ক্ষয়ক্ষতির আংশিক পরিশোধ করলেও পরিপূর্ণ ক্ষতিপূরণ না দিয়েই ইউনিকলের কাছে হস্থান্তরের পর সর্বশেষ তাদের অনুসারী কোম্পানী শেভরনের কাছে বিক্রি করেছে।
সম্প্রতি শেভরন বিরোদ্ধে আর্ন্তজাতিক আদালতে পেট্রোবাংলা মামলা করেছিল। এই অজানা আতঙ্কের মাঝেই ১৪ জুন পূর্ণ হচ্ছে মাগুরছড়া গ্যাস কূপ বিস্ফোরণের ১৯ তম বছর। কিন্তু সরকারী তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আজও জন সম্মূখে প্রকাশ করা হয়নি। ক্ষতিপুরন আদায়ের জন্য স্থানীয় কমলগঞ্জবাসী দাবী তুলে আসছে। মার্কিন অক্সিডেন্টাল কোম্পানী মাগুরছড়া এলাকায় গ্যাস উত্তোলনের কাজ চলাকালীন সময়ে এই অগ্নিকান্ড ঘটে। অগ্নিকান্ডে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হলেও ক্ষতিগ্রস্তরা আজ পর্যন্ত তাদের প্রকৃত ক্ষতিপূরণ পায়নি। জানা যায়, কমলগঞ্জ উপজেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভিতরে লাউয়াছড়া ফরেষ্ট বিটের অভ্যন্তরে মাগুরছড়া এলাকায় ১৯৮৪-৮৬ ও ১৯৯৪ সালে সাইসলিক সার্ভেতে গ্যাস মজুদের সন্ধান পাওয়া যায়। এ প্রেক্ষিতে উৎপাদন ভাগাভাগির চুক্তিতে ১৯৯৫ সালের ১১ জানুয়ারী মার্কিন বহুজাতিক তেল ও গ্যাস উত্তোলণকারী কোম্পানী অক্সিডেন্টালের সাথে বাংলাদেশ সরকারের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং গ্যাস উত্তোলনের জন্য ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমতি প্রদান করা হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর অক্সিডেন্টাল কোম্পানী মাগুরছড়ায় গ্যাস ফিল্ডের ড্রিলিং কাজের জন্য সাবলিজ প্রদান করেছিল ডিউটেক নামের জার্মান কোম্পানীর কাছে। গ্যাস উত্তোলনে ১৪ নং ব্ল¬কের মাগুরছড়াস্থ মৌলভীবাজার-১ গ্যাসকূপের খননকালে ৮৫০ মিটার গভীরে যেতেই ১৪ জুন মধ্য রাতে ঘটে ভয়াবহ বিষ্ফোরণ। এ সময় শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ ১৫ কিঃমিঃ (৩৩ হাজার কেভি) উচ্চতাপ বৈদ্যুতিক লাইন পুড়ে নষ্ট হয়। কুলাউড়া, বড়লেখা ও কমলগঞ্জ উপজেলার ৫০ টি চা-বাগানে দীর্ঘদিন স্থায়ীভাবে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দেয়। ৬৯৫ হেক্টর বনাঞ্চলের বৃক্ষ সম্পদ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এছাড়া ২৪৫ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে নষ্ট হয়, যার বাজার মূল্য দাঁড়ায় ৫০ কোটি ডলার। গ্যাস বিস্ফোরনের পর অক্সিডেন্টাল তাদের সহোদর ইউনোকলের কাছে দায়িত্ব দিয়ে এ দেশ ত্যাগ করলে দুই বছর পর ফুলবাড়ি চা বাগান, পার্শ্ববর্তী মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির বাড়ি-ঘর, পান জুম এলাকার ক্ষয়ক্ষতি বাবদ আংশিক টাকা প্রদান করে ইউনোকল। অন্যদিকে দূর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি কমলগঞ্জ শ্রীমঙ্গল সড়ক ধারে সামাজিক বনায়নের রোপিত গাছের জন্য ৩ ব্যক্তিকে ১০ লাখ টাকা ক্ষতি পূরণ প্রদান করা হয়। দীর্ঘ ৬ মাস কমলগঞ্জ শ্রীমঙ্গল সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকার কারণে ক্ষতি পূরণ বাবত বাস মালিক সমিতিকে ২৫ লাখ টাকা প্রদান করা হয়। এছাড়াও বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সময়ে কিছু ক্ষতিপুরন দেয়া হয়েছে। কিন্তু পরিবেশ ও গ্যাস বাবত কোন ক্ষতিপূরণ করা হয়নি এবং কোন সরকারই ক্ষতিপূরণ আদায়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় জনমনে সন্দেহ বিরাজ করছে। দুর্ঘটনার পর তৎকালীন সরকারের খনিজ ও জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহফুজুল ইসলামকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তদন্ত কমিটি ১৯৯৭ সালের ৩০ জুলাই মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট পেশ করলেও তা জনসম্মূখে প্রকাশ করেনি। মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির মন্ত্রী জিডিসন প্রধান সুচিয়ান বলেন, এ ঘটনার মধ্যদিয়ে প্রাকৃতিক বনের যে কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা কেউ বুঝতে পারবে না। আমরা যারা এই বনে বসবাস করছি তা বুঝতে পারছি। সিলেট বিভাগীয় বন্যপ্রাণী বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, বনের ১৭৭ কোটি টাকার ক্ষতি নিরূপন করে দেয়া হলে এ পর্যন্ত কিছুই পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক বনের ক্ষতি কোন সময়ে পুষিয়ে উঠার নয়। এদিকে ২০১০-১১ সালে শেভরন কমলগঞ্জের নূরজাহান ও ফুলবাড়ি চা বাগান এবং শ্রীমঙ্গলের জাগছড়া চা বাগানে সবুজ বেষ্টনীর আবাদ করে গ্যাসকূপ খনন করে। এসব কূপের কার্যক্রমে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণির জন্য ক্ষতি বয়ে আনছে। জাতীয় তেল গ্যাস রক্ষা কমিটির মৌলভীবাজার শাখার সম্পাদক সৈয়দ আমিরুজ্জামান, সিলেট বিভাগ আদিবাসী ফোরাম নেতা খাসিয়া হেডম্যান জিডিসন সুচিয়াং প্রধান,বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন [বাপা]-ও সিলেট শাখার সম্পাদক আব্দুল করিম ও লেখক ও গবেষক আহমদ সিরাজ বলেন, ১৯ বছর আগের ক্ষতি পূরণ আদায়ে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এর মাঝে গ্যাস ক্ষেত্রের দায়িত্ব হাত বদল হয়ে ইনোকল হয়ে শেভরনে পৌছেছে। তার উপর এখন প্রভাবশালী গাছ চোর চক্র বনের মূল্যবান গাছ গাছালি কেটে বন ধংসে লিপ্ত রয়েছে। এসব বিষয় দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য  জাতীয় উদ্যান সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকলেও এ কমিটি গঠন করা হয় রাজনৈতিকভাবে। এ কমিটিতে গাছ ও কাঠ ব্যবসার সাথে যুক্ত লোকজনই বেশী থাকেন। তাই অবাদে বনজ গাছগাছালি কেটে পাচার করা হচ্ছে। ফলে বনের জীব যন্ত্র লোকালয়ে বেরিয়ে মানুষের হাতে ধরা পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে আবারও মারা যাচ্ছে। জাতীয় তেল গ্যাস রক্ষা কমিটির মৌলভী বাজার শাখার সম্পাদক সৈয়দ আমিরুজ্জামান, ও কমলগঞ্জ উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি এম এ ওয়াহিদ বলেন, দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে তারা ক্ষতি পূরনের দাবী জানিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন। এবার আজ মঙ্গলবার সকার ১০টায় কমলগঞ্জ উপজেলা সদর ও শ্রীমঙ্গল উপজেলা সদরে মানব বন্ধন কর্মসূচি পালন করে স্মরকলিপি প্রেরণ করা হবে প্রধান মন্ত্রী বরাবরে।

মতামত...