,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

মাদকের জোয়ারে ভাসছে কক্সবাজারসহ সারা দেশ

rajjakআবদুর রাজ্জাক, কক্সবাজার প্রতিবেদক,বিডিনিউজ রিভিউজঃ ভংয়কর মাদকের জোয়ারে ভাসছে পর্যটন নগরী কক্সবাজার জেলাসহ সমগ্র বাংলাদেশ। এই মাদক ব্যাধিতে আক্রান্ত সারা দেশ । বাংলাদেশের এমন জায়গা নেই যে খানে মাদকদ্রব্য নেই। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার আনাচে-কানাচে সর্বত্রই ইয়াবা, ফেনসিডিল, ইনজেক্টিং ড্রাগ, হেরোইন, কোকেন, আফিম, গাঁজা, দেশি-বিদেশি মদ ও বিয়ারসহ বিভিন্ন মাদকে ভরপুর। বিশেষ করে ভয়ংকর মাদকদ্রব্য মরণনাশক ইয়াবার ভয়াল প্রভাবে তরুণ প্রজন্ম মাদকাসক্ত হয়ে ধংসের পথে ধাবিত হয়ে পড়ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়,কক্সবাজার জেলার সীমান্তবর্তি টেকনাফ উপজেলার শাহপরীরদ্বীপ, কালার পাড়া, নয়াপাড়া, সাবরাং, জালিয়া পাড়া, নাইটং পাড়া, জাদিমুরা, হ্নীলা, মৌলভী বাজার, উনচিপ্রাঙ্ক, হোয়াইক্যং, উলুবনিয়া, কাটাখালী, তুলাতলী, উখিয়া উপজেলার আঞ্জুমান পাড়া, পালংখালী, রহমতের বিল, ধামনখালী, বালুখালী, কাটাপাহাড় সহ ৩৫টি পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমার থেকে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমান ইয়াবা ট্যাবলেট পাচারকারী ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বাজারজাত হয়ে আসছে। শুধুমাত্র বাংলাদেশের মাদকের বাজারকে লক্ষ্য করে পাশ্ববর্তী মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে ১৫টির অধিক কারখানায় কোটি কোটি পিস ইয়াবা উৎপাদন হয়ে থাকে বলে বিজিবি সুত্রে জানা গেছে।
yaba আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে সীমান্তবর্তী টেকনাফের-উখিয়ার চিহ্নিত বাঘা-বাঘা ইয়াবা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটরা এসব ইয়াবা তৈরীর কারখানা থেকে বিপুল পরিমান ইয়াবা সংগ্রহ ও মজুদ করে পরে তা কক্সবাজার জেলাসহ সারাদেশে মরননেশা ইয়াবা সরবরাহ আগে ভাগেই তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের ইনানী ও মনখালীর ব্রিজের নির্মাণ সম্পন্ন হয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজভাবে চালু হওয়ায় এবং উক্ত সড়কে ইনানীর পর থেকে কোন ধরনের চেকপোষ্ট না থাকায় ইয়াবা ব্যবসায়ী নিঃসন্দেহে টেকনাফ থেকে কক্সবাজার উদ্দেশ্যে ইয়াবা পাচার করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এই পবিত্র রমজানের শেষে ঈদুল ফিরতকে টার্গেট করে উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তের ৩০টির অধিক পয়েন্ট দিয়ে অসাধু ইয়াবা সিন্ডিকেট সদস্যরা শত কোটি টাকার ইয়াবা ট্যাবলেট পাচারের প্রস্তুতি নিয়েছে। এজন্যে তারা সড়কপথ ছাড়াও প্রয়োজনে টেকনাফ স্থল বন্দর, চট্টগ্রাম বন্দর ও কক্সবাজার বিমান বন্দরের পাশাপাশি অভ্যন্তরীন বিভিন্ন নৌ পথকে নিরাপদ চ্যানেল হিসেবে বেছে নিয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃংখলা বাহিনীর অসাধু সদস্যদের ম্যানেজের মাধ্যমে ইয়াবা চক্রের সদস্যরা ইতোমধ্যে শত কোটি টাকা মূল্যের এসব ট্যাবলেটের বিশাল বিশাল চালান নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা, অসাধু সাংবাদিক ও একশ্রেণীর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে দফারফা সম্পন্ন করেছে। কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক ও বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকটি স্থায়ী ও অস্থায়ী চেকপোষ্ট থাকলেও শক্তিশালী ইয়াবা সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা অভিনব কায়দায় ব্যাটারী চালিত টমটম, বর্তমানে অটোরিক্সা সিটের নিচের থাকা ব্যাটারী টুলবক্সের ভেতরে ইয়াবাগুলো বহন করে কক্সবাজারের বিভিন্ন হোটেল-মোটেল ও পর্যটন নগরীর বিভিন্ন পর্যটন স্পটে নিরাপধ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরে দিন দিন ইয়াবার চাহিদার পরিমাণ যেমন তুলনামূলক হারে বাড়ছে তেমনি বাড়ছে এর সেবনের পরিমাণও। এদিকে ইয়াবা আসার অন্যতম প্রধান রুট মিয়ানমার থেকে টেকনাফ, উখিয়া হয়ে কক্সবাজার। তাছাড়া সীমান্তের কুতুপালং ক্যাম্পের বস্তি এলাকা ও উখিয়ার গ্রামগঞ্জের বিভিন্ন দোকানকে গুদাম হিসাবে ব্যবহারসহ পালংখালী, থাইংখালী, বালুখালী, উখিয়া সদর, কোটবাজার ও অন্যতম চেক পোস্ট পাশ্ববর্তি ষ্টেশন মরিচ্যা বাজার সহ তার আশ-পাশের বেশ কয়েকটি গুদামে ইয়াবার মজুদ বাড়াচ্ছে ইয়াবা সিন্ডিকেট। এসব ইয়াবা সিন্ডিকেটর মধ্যে উখিয়া উপজেলার বালুখালী, ঘিলাতলী, হাজীরপাড়া ও দুছড়ি, রতœাপালং, তেলীপাড়া, রাজাপালংয়ের যাদীমোরা, হিজলিয়া এলাকার কয়েকটি সিন্ডিকেট বর্তমানে দিনে-রাতে মিয়ানমার থেকে নির্দিষ্ট কয়েকটি গুদামে ইয়াবা মজুদ করে যাচ্ছে। মজুদকৃত এসব ইয়াবা সড়কপথে সুন্দরী নারীদের ঈদের কেনা-কাটার পর্যটন নগরী কক্সবাজার যাওয়া অজুহারে শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে অভিনব কায়দায় পায়ুপথ ব্যবহার করে পাচারে ব্যাস্ত রয়েছে অন্য কয়েকটি সিন্ডিকেট। উখিয়া উপজেলার কুতুপালং ও টেকনাফ উপজেলার নয়াপাড়া শরনার্থী ক্যাম্প ভিত্তিক ২ শতাধিক রোহিঙ্গা মহিলা ছাড়াও কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্তের অর্ধশতাধিক পয়েন্টে ৬ শতাধিক পাচারকারী নারী-পুরুষ মরণ নেশা ইয়াবা পাচার কাজে জড়িত রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের আন্তর্জাতিক চোরাচালান সিন্ডিকেট এখন অস্ত্র ব্যবসার পরিবর্তে মাদক ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এ সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের অধিকাংশের বাড়ী কক্সবাজারের টেকনাফ, শাহপরির দ্বীপ, হ্নীলা, মৌলভী বাজার, কানজর পাড়া, হোয়াইক্যং, উখিয়া, থাইংখালী, বালুখালী, কোটবাজার, রতœাপালং, তেলীপাড়া ও সীমান্তের কাছাকাছি। মূলত তিন শতাধিক সদস্যের একটি দল সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইয়াবা ও মানবপাচার এক সুত্রে গাথা বলে স্থানীয় সচেতন মহল দাবী করেন। মানবপাচারকারীদের বেশীরভাগ ইয়াবা ব্যাবসার সাথে সরাসরি জড়িত। এদের অনেকেই ইতিমধ্যে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছে। সীমান্তে দায়িত্বে নিয়োজিত বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ সদ্যসরা একের পর এক অভিযান চালিয়ে ইয়াবা ও বিভিন্ন মাদক দ্রব্যের চালান উদ্ধার করতে পারলেও শীর্ষ ইয়াবা পাচারকারীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকায় কোন মতেই ইয়াবাসহ মাদক পাচার থামছে না কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে। যার কারণে সীমান্তে দায়িত্বে নিয়োজিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন ইয়াবা প্রতিরোধ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। সম্প্রতি গত ২০ জুন উখিয়ার শীর্ষ ইয়াবার ডন পালংখালী ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের নবনির্বাচিত মেম্বার বখতিয়ার আহম্মদ ও তার সহযোগী টেকনাফের নুর আলম টিটু ৫০ হাজার পিস ইয়াবা নিয়ে প্রাইভেট কার সহ ঢাকায় আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে আটক হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে মাঝে মধ্যে ইয়াবা ও মাদকের চালান ধরা পড়লে ও মুল গডফাদারেরা রয়ে যাচ্ছে বরাবরের মত ধরা ছোঁয়ার বাহিরে।
সারা দেশে ইয়াবা, ফেনসিডিল, ইনজেক্টিং ড্রাগ, হেরোইন, কোকেন, আফিম, গাঁজা, দেশি-বিদেশি মদ ও বিয়ারের ভয়াল প্রভাবে তরুণ প্রজন্ম মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। আর এসব মাদক উদ্ধারের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ইয়াবা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত এক পরিসংখ্যানে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রতি মিনিটে ৩৮ পিস ইয়াবা উদ্ধার করছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, ২০১৪ সালে ৬৫ লাখ ১২ হাজার ৮৬৯ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। ২০১৫ সালে উদ্ধারকৃত ইয়াবার পরিমাণ তিনগুণের বেশি অর্থাৎ ২ কোটি ২৬ লাখ ৯ হাজার ৪৫ পিস। একই সময় ফেনসিডিল, কোকেনসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য উদ্ধারের পরিমাণও কমেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের খাতায় ২০১৫ সালে আফিম উদ্ধারের পরিমাণ শূন্য। ২০১৪ সালে উদ্ধাররকৃত আফিমের পরিমাণ ছিল ৯১ কেজি।
মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে আজ সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে আসাদুজ্জামান খান বলেন, বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাদকের পাচার রোধে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।বাংলাদেশে মাদক প্রবেশপথ প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে মাদক পাচার রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্যের মধ্যে ইয়াবা নিয়ে তিনি বেশি চিন্তিত। আকারে ছোট হওয়ায় সহজে বহনযোগ্য হওয়ায় ইয়াবার পাচার রোধ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও পাচার বন্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান রেখে হালনাগাদ ও যুগোপযোগী আইন করা হবে। দেশে ৫০ হাজারেরও বেশি মামলা পেন্ডিং রয়েছে জানিয়ে তিনি পৃথক আদালত গঠনের কাজ এগিয়ে চলছে বলে জানান। মাদকের অপব্যবহার রোধে শুধু আইন প্রণয়ন, আসামিকে গ্রেফতার কিংবা শাস্তি প্রদান যথেষ্ট নয় মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, সামাজিক গণসচেনতা গড়ে তোলার মাধ্যমে সামাজিক প্রতিরোধ ছাড়া মাদকের ভয়াল থাবা থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচানো দুরূহ হবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মন্তব্য করেন।
জানা গেছে, ২০১৪ সালে সারা দেশে ৫১ হাজার ৮২৭টি মামলায় ৬২ হাজার ২৪৬ জনকে আসামি করা হয়। ২০১৫ সালে মামলার সংখ্যা ৫৭ হাজার ৪২৭টি ও আসামির সংখ্যা ৭০ হাজার ৫৯০ জনে দাঁড়িয়েছে।মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক রাকিবুর রহমান জানান, ২০১৪ সালে ১১ হাজার ৭২৩টি ও ২০১৫ সালে ১০ হাজার ৫৪৮টি মামলা দায়ের করা হয়। ২০১৪ সালে ১২ হাজার ৫৯০ জনকে ও ২০১৫ সালে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জানা গেছে, ২০১৪ সালে ভ্রাম্যমাণ আদালত ১৪ হাজার ৮১৫টি অভিযানে ৭ হাজার ৯৪৮টি মামলায় ১২ হাজার ৫৯০ জনের সাজা ও ২০১৫ সালে ১৪ হাজার ৯৩৭টি অভিযানে ৭ হাজার ৪৮৭টি মামলায় ৭ হাজার ৮২৩ জনকে সাজা দেয়া হয়।
এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ বলেন, প্রায় প্রতিদিনই ইয়াবা আটকের ঘটনা ঘটছে, তবুও পবিত্র ঈদুল ফিরতকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আগের চেয়ে বেশী তৎপর রয়েছে। পাশাপাশি ইয়াবা গড় ফাদারদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

মতামত...