,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দন্ড প্রাপ্ত নিজামীর প্লট বরাদ্দ বাতিল

nizami2

নিউজ ডেস্ক, বিডিনিউজ রিভিউজঃ মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি দন্ড প্রাপ্ত জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামীর প্লটের বরাদ্দ বাতিল করেছে রাজউক। ক্ষমতার অপব্যবহা ও অনিয়ম করে প্লট বরাদ্দ, ভবন ও আইন লঙ্ঘগন করায় তার প্লট বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

রাজউকের চেয়ারম্যান এম বজলুল করিম চৌধুরী বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের প্লট বাতিল করে দেওয়ার ব্যাপারে ঘোষণা দিয়েছে সরকার।এ নির্দেশ অনুযায়ী আমরা তাদের নথি ঘেঁটে দেখেছি, রাজউকের আইনেই তাদের প্লট বাতিল করার সুযোগ রয়েছে। তাই রাজউকের আইন অনুসরণ করে তাদের প্লট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

গত ২৮ জুলাই রাজউকের ০৭/২০১৬তম সাধারণ সভায় (বোর্ড সভা) নিজামীর প্লট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিজামীর প্লট বরাদ্দে পাঁচ ত্রুটি (১) প্লট বরাদ্দকালীন মূল হলফনামা না থাকা ও দাখিলীয় ফটোকপি হলফনামায় নিজামীর সই না থাকা, (২) মিশন ডেভেলপারের আমমোক্তার হিসেবে রাজউকের অনুমোদন না পাওয়া, (৩) আবাসিক প্লটকে বাণিজ্যিক ভাবে ব্যবহার, (৪) সরকারের অনুশাসন ছাড়াই নিজামীর নামে প্লট বরাদ্দ এবং (৫) পরবর্তীতে পাওয়া সরকারের অনুশাসন রাজউকের বোর্ডসভায় (সাধারণ সভা) উপস্থাপন না করা , রয়েছে যা চিহ্নিত করে তা প্লট বরাদ্দ বাতিল করা হয়।

জানা গেছে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী ২০০৬ সালের ৯ মে রাজউকের একটি প্লট পেতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। একই আবেদনে তিনি বনানী আবাসিক এলাকার ১৮ নম্বর সড়কের ৬০ নম্বর প্লটটি সরেজমিনে অবরাদ্দকৃত অবস্থায় খালি আছে মর্মে জানান।

নিজামীর এ আবেদনে মন্ত্রীর নির্দেশে রাজউকের ০৮/২০০৬তম সাধারণ সভায় নিজামীকে বনানী অথবা উত্তরায় প্রাপ্তি সাপেক্ষে পাঁচ কাঠা আয়তনের একটি প্লট বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের আলোকে ১৩ সেপ্টেম্বর নিজামীর নামে বনানীর ১৮ নম্বর সড়কের ৬০ নম্বর প্লটের সাময়িক বরাদ্দপত্র দেয় রাজউক। এক মাস পর দেওয়া হয় চূড়ান্ত বরাদ্দপত্র। চূড়ান্ত বরাদ্দপত্র পাওয়ার চার দিনের মাথায় (১৫ অক্টোবর) নিজামীকে সরেজমিন প্লটটির দখল বুঝিয়ে দেয় রাজউক। এরপর নিজামী প্লটের ওপর ভবন নির্মাণ ও আমমোক্তারও নিয়োগ করেন। এর আগে প্লটের পুরো মূল্য পরিশোধ করেন তিনি।

নিজামীকে এই প্লট বরাদ্দ দেওয়ার বেলায় রাজউকের প্লট বরাদ্দ বিধিমালা ১৯৬৯ এর ১৩/এ ধারা অনুসরণ করা হয়। ১৩/এ ধারাটি হল দেশের প্রতি যারা অবদান রেখেছেন তাদের প্লট বরাদ্দ দেওয়ার জন্য প্রযোজ্য। অথচ এই নিজামীকেই মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সম্প্রতি ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে।

জানা গেছে, ৬০ নম্বর প্লটটি নিজামীকে বুঝিয়ে দেওয়ার পরপরই প্লটের মূল ফাইল রাজউক থেকে গায়েব হয়ে যায়। এ ব্যাপারে রাজউকের একজন সহকারী পরিচালক ২০০৬ সালের ১৭ অক্টোবর মতিঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এই ডায়েরিতে উল্লেখ করা হয়, ২০০৬ সালের ১৬ অক্টোবর তারিখ থেকে ফাইলটি পাওয়া যাচ্ছে না। ফাইল নিয়ে এত বড় জালিয়াতি হলেও কাউকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি।

জানা গেছে, ২০০৮ সালের ৮ মে আজিজুর রহিম নামের এক ব্যক্তি বনানী আবাসিক এলাকার ১৮ নম্বর সড়কের ৬০ নম্বর প্লটের মালিকানা দাবি করে বকেয়া কিস্তির টাকা রাজউকের বিধি মোতাবেক জমা দেওয়ার অনুমতিসহ প্লটটির দখল বুঝে পেতে আবেদন করেন।

এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্লটের মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে সে বছর ৫ আগস্ট রাজউক তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটিতে ছিলেন রাজউক পরিচালনা পর্ষদের সদস্য-অর্থ মো. আবু বক্কার সিকদার, পরিচালক-অর্থ মো. সামসুজ্জামান এবং পরিচালক (ভূমি) সৈয়দ নজরুল ইসলাম। বিস্তারিত তদন্ত শেষে এই কমিটি নিজামীর নামে প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে পাঁচটি ত্রুটি শনাক্ত করে।

কমিটির প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়, মতিউর রহমান নিজামী খুব তড়িঘড়ি করে প্লটের যাবতীয় কাজ সম্পাদনের চেষ্টা করেছেন। তিনি যেদিন প্লটের লিজ দলিল রেজিস্ট্রি করেছেন, একই দিন অপর একটি রেজিস্ট্রিকৃত আমমোক্তারনামা দলিলমূলে প্লটে ইমারত নির্মাণসহ যাবতীয় কাজ সম্পাদনের জন্য মিশন ডেভেলপারকে দায়িত্ব প্রদান করেছেন। আমমোক্তারনামায় নিজামী তার প্লটের লিজ দলিলের নম্বর ও সম্পাদনের তারিখ উল্লেখ করেননি। যদিও আমমোক্তারনামাটি রাজউক অনুমোদন করেনি।

কমিটির মন্তব্যে বলা হয়, এসব কারণে এটা প্রতীয়মান হয় যে, তিনি (নিজামী) হয়ত কোনও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে থাকতে পারেন। এ ছাড়া প্লটটির মূল ফাইল হারিয়ে গেলেও তা উদ্ধারে নিজামীর পক্ষ থেকে কোনও চাপ না দেওয়া এবং নির্লিপ্ততার বিষয়টি রহস্যজনক মনে হয়।

অন্যদিকে আজিজুর রহিম সম্পর্কে কমিটি বলেছে, আলোচিত ৬০ নম্বর প্লটটি ১৯৯৫ সালের ১৬ নভেম্বর আজিজুর রহিমের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। আজিজুর রহিম জামানতের টাকা ছাড়া আর কোনও অর্থ পরিশোধ না করায় ১৯৯৬ সালে তার বরাদ্দ বাতিল করে দেয় রাজউক।

রাজউক জানিয়েছে, তদন্ত কমিটির রিপোর্টটি বিবেচনায় এনে নিজামীর প্লট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাজউকের সিদ্ধান্তে বলা হয়, সরকারের অনুশাসন ছাড়া পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিবিহীন আবেদনের বিষয়ে রাজউক কর্তৃক প্লট বরাদ্দ প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনিয়মের পর্যায়ভুক্ত। আবেদনকারীকে হলফনামা দাখিল করতে বলা হলে তিনি স্বাক্ষরবিহীন (স্বাক্ষরিত লেখা) হলফনামার ফটোকপি দাখিল করেন। হলফনামা দাখিল না করা সত্ত্বেও প্লট প্রদানের লক্ষ্যে গৃহীত সকল কার্যক্রম গুরুতর অনিয়ম। সরকারের ১৩এ ধারার অনুশাসন কর্তৃপক্ষের সাধারণ সভায় উপস্থাপন না করে প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত গৃহীত অন্যান্য কার্যক্রম যথাযথ হয়নি, যা অনিয়মের শামিল।

রাজউকের সিদ্ধান্তে বলা হয়, বনানী আবাসিক এলাকার ১৮ নম্বর সড়কের ৬০ নম্বর প্লটের বরাদ্দ গ্রহীতা কর্তৃক প্লটটিতে ভবন নির্মাণের জন্য মিশন ডেভেলপারকে রেজিস্টার্ড মূলে আমমোক্তার নিয়োগ করা হলেও রাজউকের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এ ধরণের ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভবন নির্মাণ ও পরবর্তীতে নিজ নামে নকশা অনুমোদন করা যথাযথ হয়নি। প্লটটি আবাসিক হিসেবে বরাদ্দ প্রদান করা হলেও অ-আবাসিক/বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাই সর্বসম্মতিক্রমে প্লটের বরাদ্দ বাতিল করা হল।

রাজউকের চেয়ারম্যান এম. বজলুল করিম চৌধুরী সাধারণ সভায় সভাপতিত্ব করেন। উপস্থিত ছিলেন রাজউক পরিচালনা পর্ষদের সদস্য উন্নয়ন মো. আবদুল রহমান, সদস্য প্রশাসন ও অর্থ মো. আকতার উজ জামান, সদস্য উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ মো. আসমাউল হোসেন, সদস্য এস্টেট ও ভূমি মো. আবদুল হাই প্রমুখ।

প্রসঙ্গত একই সাধারণ সভায় জামায়াতের অপর নেতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর প্লটের বরাদ্দও বাতিল করা হয়েছে কিস্তির টাকা পরিশোধ না করার কারণে। গত মাসে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন মানবতাবিরোধী সব অপরাধীর প্লট বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

  • বাংলা ট্রিবিউন’র প্রতিবেদন।

মতামত...