,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

মাশরাফির ৪!

গেইল, ক্রিস গেইল, ক্রিস্টোফার হেনরি গেইল। যে নামেই তাকে ডাকা হোক না কেন তার একটাই পরিচয়। ব্যাটিং দানব। বিস্ফোরক ব্যাটসম্যান। টি–টোয়েন্টি ক্রিকেটের মাহারাজা। ব্যাট হাতে প্রতিপক্ষ বোলারদের কচু কাটা করাই তার কাজ। যেমনটি করলেন মঙ্গলবার। তার ব্যাটিং কতটা নির্দয় আর নির্মম হতে পারে গতকাল সেটা দেখালেন আরো একবার। গেইল যেদিন ঝড় তুলবেন আর সেদিন রানের পাহাড় হবে না বা তার দল জিতবে না সেটাতো হতে পারে না। আর ম্যাচটা যখন ফাইনাল তখন সেটা জেতা মানেই শিরোপা জেতা। যেমনটি জিতলেন গেইল এবং তার দল রংপুর রাইডার্স। সাকিব আল হাসানের দল ঢাকা ডাইনামাইটসের টানা দ্বিতীয়বার শিরোপা স্বপ্ন ধুলিস্যাত করে দিয়ে প্রথমবারের মত বিপিএলের শিরোপা জিতল রংপুর রাইডার্স। এবারের বিপিএলের মালিকানা পরিবর্তনের সাথে সাথে যেন ভাগ্যও পরিবর্তন হয়ে গেল রংপুরের। শুরু থেকেই উড়তে থাকা ঢাকা ডাইনামাইটসকে শেষ পর্যন্ত মাটিতে নামিয়ে আনল রংপুর। আর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে শুরু করা রংপুর রাইডার্স ওস্তাদের মার শেষ রাতের মত দারুণ এক মার দিল ফাইনালে। বিপিএলের মেগা ফাইনালে গত আসরের চ্যাম্পিয়ন ঢাকা ডাইনামাইটসকে ৫৭ রানে হারিয়ে প্রথম বারের মত শিরোপা জিতল মাশরাফির দল রংপুর। আর বিভিন্ন দলের হয়ে চারবার শিরোপা জিতলেন মাশরাফি। দুইবার ঢাকার হয়ে, তৃতীয়বার কুমিল্লার হয়ে আর এবারে রংপুরের হয়ে বিপিএলের শিরোপা জিতলেন মাশরাফি। গতকাল তারকা সমৃদ্ধ দু’দলই খেলতে নামে ফাইনালে। কিন্তু গেইল যেদিন তার মত খেলবেন সেদিন আর সব তারা নিভে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। যেমনটি তার ঝলকানিতে নিভে গেল লুইস–আফ্রিদি–ডেনলি–পোলার্ডরা। তার ঝলকানিতে হারিয়ে গেল এমনকি তার দলেই আরেক ব্যাটিং দানব ম্যাককালামও। তাইতো গেইলের দিনে গেইলই রাজা। আর সেটাই গতকাল দেখালেন গেইল। তার ঝড়ে রংপুরের রান পৌঁছে যায় হিমালয়ের চূড়ায়। আর সে চূড়ায় পৌঁছা সম্ভব হয়নি ঢাকার ব্যাটসম্যানদের। এমন ব্যাটিং করে দলকে যদি রানের পাহাড়ে তুলে দেওয়া যায় তখন বোলারদের আর কষ্ট করতে হয় না। ওই রানের চাপেই চ্যাপ্টা হয়ে যায়। যেমনটি গতকাল হয়ে যায় ঢাকা। তার সাথে যখন রংপুরের বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিং যোগ হয় তখন জয় ছাড়া আর কিছু ভাবাটাইতো বোকামি। আর বোকামি করতে চায়নি বা করেনি রংপুর। গেইলের গড়ে দেওয়া মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে একেবারে রোমাঞ্চকর নৃত্য করে গেলেন মাশরাফি–সোহাগ গাজি–রুবেল–নাজমুলরা। গেইল টনিকে উজ্জীবিত মাশরাফিরা ঢাকার দর্পচূর্ণ করে জিতে নিল প্রথম শিরোপা। যা এলো বিশ্বের টি–টোয়েন্টি ক্রিকেটের সবচাইতে বড় বিজ্ঞাপন ক্রিস গেইলের হাত ধরে। তিনি কেন এতবড় ব্যাটসম্যান সেটা আরো একবার প্রমাণ করলেন রংপুর রাইডার্সকে শিরোপা জিতিয়ে। ‘হাতি ঘোড়া গেল তল মশা বলে কত জল’ দলের দানবীয় ব্যাটসম্যানরা যেখানে ব্যর্থতার চোরাবালিতে হারিয়ে গেলেন সেখানে জহুরুল–নারাইন–রনি–খালেদদের কিই–বা করার থাকে। একটি কাজ করার ছিল। আর সেটি হচ্ছে পরাজয়ের ব্যবধানটা যদি কমানো যায়। আর সেটাই করেছেন তারা। ট্রফিতো আগেই হাতছাড়া হয়ে গেছে। এখন হারের লজ্জাটা যেন একটু সহনীয় হয়। আর সেটা করতে গিয়ে ঢাকার লেজের ব্যাটসম্যানরা চেষ্টা করেছেন। তারপরও পারেনি বিশাল হারের লজ্জা এড়াতে।

টসে হেরে ব্যাট করতে নামা রংপুর রাইডার্সকে শুরুতেই ধাক্কা দেন সাকিব আল হাসান। নিজের প্রথম এবং ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে আগের দিনের সেঞ্চুরিয়ান জনসন চার্লসকে যখন ফেরান সাকিব তখন রংপুরের খাতায় জমা পড়েছে মাত্র ৫ রান। এরপর ক্রিস গেইলের সাথে জুটি বাঁধেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। বিপিএলের শুরু থেকেই এই দুই ব্যাটিং দানবের জুটি দেখতে উন্মুখ ছিল দর্শকরা। কিন্তু সেটা হয়নি আগের কোন ম্যাচেই। তবে এতদিন হয়নি বলে আর হবে না তাতো হতে পারে না। সত্যিকারের ব্যাটিং তাণ্ডব দেখালেণ এই দুই ব্যাটসম্যান। সাকিবের ঐ উইকেটটাই যে ঢাকা ডাইনামাইটসের বোলারদের জন্য প্রথম এবং শেষ উইকেট হয়ে থাকবে কে জানতো। কারণ এরপর থেকে যে ঢাকার বোলারদের সময় কেটেছে কেবলই বল কুড়িয়ে আনাতে। একের পর এক বল গিয়ে পড়েছে মাঠের বাইরে। কখনো উড়িয়ে আবার কখনো গড়িয়ে। তবে গড়িয়ে যাওয়ার চাইতে উড়িয়ে বল মাঠের বাইরে গেছে বেশি। পুরো ইনিংসে ৯টি চারের বিপরীতে ২১টি ছক্কা মেরেছেন রংপুর রাইডার্সের দুই ব্যাটিং দানব গেইল এবং ম্যাককালাম। যার মধ্যে গেইল একাই মেরেছেন ১৮টি ছক্কা। একদিন আগে মেরেছিলেন ১৪টি ছক্কা। একদিনের ব্যবধানে সেটাকে টপকে গেলেন ক্যারিবীয়ান হ্যারিক্যান গেইল। একদিন আগে তুলে নিয়েছিলেন আরেকটি সেঞ্চুরি। সেটি ছিল ১২৬ রানের ইনিংস। আর গতকাল সেটাকেও টপকে গেলেন গেইল। গতকাল করলেন ১৪৬ রান। ঝড়ো, টর্নেডো, দানবীয়, হ্যারিক্যান যে নামেই বলা হোকনা কেন টি–টোয়েন্টির ব্যাটিংটা কেমন হওয়া উচিত সেটা যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন গেইল। ব্যাটিংটা যে তার কাছে একেবারে ডালভাত সেটা দেখালেন গতকাল। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে প্রথম উইকেট হারানোর পর গেইল এবং ম্যাককালাম বেশ ধীর গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সময় যতই গড়িয়েছে ততই একেবারে বিধ্বংসী রূপ ধারন করেন এই ক্যারিবীয়ান ব্যাটিং দানব। প্রথম ৫ ওভারে মাত্র ২২ রান সংগ্রহ করেন এই দুজন। এরপর শুরু ঝড়। একপ্রান্তে ম্যাককালামকে দর্শক বানিয়ে অপরপ্রান্তে কেবলই চার আর ছক্কা মেরেছেন গেইল। আর তাতেই দিশেহারা হয়ে পড়ে ঢাকার বোলাররা। সাকিব–আফ্রিদি–নারাইন–পোলার্ড–রনিরা–মোসাদ্দেকরা বল ফেলার জায়গা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। গেইল–ম্যাককালাম জুটি অবেশেষ ঝড় তুললেন। আর সে ঝড়ে রংপুর রাইডার্স পৌছে যায় রানের পাহাড়ে। রংপুরের ২০৬ রানের ইনিংসে গেইল একাই করলেন ১৪৬ রান। ৬৯ বলের ইনিংসটিতে ৫টি চারের সঙ্গে তিনি হাঁকিয়েছেন ১৮টি ছক্কা। ম্যাককালাম করেন ৪৩ বলে ৫১ রান। দ্বিতীয় উইকেটে এ দুজনের ব্যাট থেকে আসে ২০১ রানের জুটি। যা বিপিএলের সর্বোচ্চ। আগের ম্যাচে জ্বলে উঠতে না পারা গেইল ফাইনালের মঞ্চে ঠিকই স্বরূপে ফিরেছেন। ৩৩ বলে হাফসেঞ্চুরি আর ৫৭ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ক্যারিবিয় এই ব্যাটিং দানব। বিপিএলে গেইলের পঞ্চম সেঞ্চুরি এটি। এবারের আসরে দ্বিতীয়। সব মিলিয়ে বিপিএলের ১২তম সেঞ্চুরি এটি আর এবারের আসরের তৃতীয় সেঞ্চুরি। পুরোটা সময় অপর প্রান্তে দর্শক হয়ে থাকা ম্যাককালাম শেষ পর্যন্ত হাত খোলেন। শেষ পর্যন্ত ৪৩ বলে ৫১ রান করে অপরাজিত থাকেন ম্যাককালাম। তার ইনিংসে ৪টি চারের পাশাপাশি ৩টি ছক্কার মার ছিল। এবারের বিপিএলে এটি টানা দ্বিতীয় হাফ সেঞ্চুরি ম্যাককালামের।

২০৭ রানের পাহাড়ের পেছনে ছুটতে গিয়ে শুরুতেই ধাক্কা খায় ঢাকা ডাইনামাইটস। নিজের এবং ইনিংসের প্রথম ওভারেই মেহেদী মারুফকে যখন এরবিডবিহ্মউর ফাঁদে ফেলেন মাশরাফি তখন নিজেদের খাতায় কোন রান জমা হয়নি ঢাকার। দ্বিতীয় ওভারে ডেনলিকে ফেরান সোহাগ গাজি। দুই ওভারে দুই ব্যাটসম্যান ফিরলেন রানের খাতা খোলার আগে। এরপর লুইসকেও ভয়ংকর হয়ে উঠতে দেননি সোহাগ গাজি। নিজের দ্বিতীয় ওভারেই তাকে ফেরান গাজি। ১৯ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়া ঢাকাকে উদ্ধার করতে পারেননি সাকিব–পোলার্ড জুটি। মাত্র ১০ রান স্থায়ী ছিল এ দুজনের পথ চলা। রুবেল হোসেন ফেরালেন পোলার্ডকে। এরপর কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা সাকিব এবং জহুরুলের। কিন্তু না হলো না সেটাও। ৪২ রান যোগ করতে পেরেছিলেন দুজনে মিলে। ২৬ রান করা সাকিব ফিরেন নামজুলের বলে বোল্ড হয়ে। তিন রান পর ফিরলেন পুরো বিপিএলে ব্যাট হাতে ব্যর্থ মোসাদ্দেক। প্রয়োজনের মুহূর্তে খাদের কিনারায় চলে যাওয়া দলকে টেনে তুলতে পারলেন না মোসাদ্দেক। ৭৪ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর ঢাকার লক্ষ্য পরিণত হয় হারের ব্যবধান কমানো। তারপরও যেহেতু খেলাটা টি–টোয়েন্টি। আর তখনো টি–টোয়েন্টির আরেক দানব আফ্রিদি যে ব্যাট হাতে নামেননি। কিন্তু তিনি নামলেন, খেললেন আর অন্যদের পথ ধরে ব্যর্থ হয়ে চলে গেলেন। অন্যরা যেখানে ব্যাট হাতে ব্যর্থতার জঘন্য প্রমাণ রেখেছেন সেখানে একা আফ্রিদিই বা কি করবেন। তাই তিনিও মনে করলেন তারও চলে যাওয়া উচিত। তাই তিনিও চলে গেলেন ৮ রান করে। ৮৭ রানে ৭ উইকেট হারানোর ঢাকার ঘাড়ে তখন নিশ্বাস ফেলছিল পরাজয়। শেষ দিকে জহুরুলের ৫০ রানের সুবাধে ১৪৯ রানে থামে ঢাকা ডাইনামাইটস। তার ৩৮ বলের ইনিংসটা কিছুটা হলেও মান বাঁচিয়েছে ঢাকার। রংপুরের পক্ষে ২টি করে উইকেট নিয়েছেন সোহাগ গাজি, উদানা এবং নাজমুল ইসলাম। ম্যাচের সেরা গেইলই।

মতামত...