,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

মিয়ানমারে বিপন্ন মানবতা, দিশেহারা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী

rআন্তর্জাতিক ডেস্ক, বিডিনিউজ রিভিউজ.কম :: মিয়ানমারের (রোহিঙ্গা) মুসলমানদের ওপর গত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সময়ে জান্তা সরকার নির্যাতন চালালেও গত মার্চ মাসে ‘গণতান্ত্রিক’ সরকার নির্বাচিত হওয়ায় তারা এই নির্যাতন থেকে মুক্তি পাবেন বলে আশা করেছিলেন। কিন্তু তাদের ওপর চলমান নির্যাতনের মাত্রা দিনদিন আরো বাড়তে থাকে। সর্বশেষ গত ৯ অক্টোবর সীমান্তের তিনটি নিরাপত্তা চৌকিতে সংঘবদ্ধ হামলায় দেশটির ৯ পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুর পর তাদের উপর নির্যাতন আরো বেড়ে যায়। এই হামলার পেছনে মুসলমানদের হাত রয়েছে উল্লেখ করে দেশটির সেনাবাহিনী-বিজিপি গত কয়েকদিনে রাখাইন প্রদেশের গ্রামগুলোতে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ এর নামে তাদের (মুসলমানদের) শত শত বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেয়। নারী-শিশুসহ শত শত রোহিঙ্গাকে হেলিকপ্টার থেকে গানশিপ দিয়ে গুলি ও নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে নাফ নদীতে লাশ ভাসিয়ে দিয়েছে। তবে সরকারি হিসাবে তারা মৃতের সংখ্যা ৬৯ বললেও প্রকৃত সংখ্যা কয়েকশ’র উপরে বলে ধারণা করছে বিবিসি, রয়টার্স ও আল-জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম। অনেক নারীকে সংঘবদ্ধ হয়ে ধর্ষণের অভিযোগও উঠেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে।
গত কয়েকদিনের পরিস্থিতি: এদিকে সহিংসতা থেকে রক্ষা পেতে অনেকে নিরাপদ আশ্রয় লাভের আশায় বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করলেও তাদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে বলে জানা যায়। গত সোমবার মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশের টেকনাফ শরণার্থী শিবিরে পালিয়ে আসা ১৯ বছর বয়সি রোহিঙ্গা তরুণ মোহাম্মদ তৌহিদ ফোনে এএফপিকে জানায়, ‘তারা (সেনাবাহিনী) আমার চোখের সামনে আমার বোনকে গুলি করে হত্যা করেছে। হামলা চালানোর সময় আমি গোবরের নিচে লুকিয়ে ছিলাম। রাত গভীর হওয়ার পর আমি সেখান থেকে সীমান্তে পালিয়ে আসি।’ ওই তরুণ আরও বলেন, ‘আমি আমার মাকে বাড়িতে একা ফেলে এসেছি। তিনি বেঁচে আছেন কিনা, আমি তাও জানি না।’ তিনি আরও জানান, সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের শতশত ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। টেকনাফ শরণার্থী শিবিরে এক রোহিঙ্গা শরণার্থী আলজাজিরা-কে বলেন, ‘সেনাবাহিনী গ্রামে হামলা চালালে পুরুষরা সেখান থেকে পালিয়ে যায়। আর যে নারীরা পালাতে পারেনি, তাদের সেনাসদস্যরা সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে।’ ২০১২ সালে ওই রাজ্যের জাতিগত দাঙ্গায় শতাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম নিহত হওয়ার পর সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সেখানে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এদিকে রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদে স্থানীয় রাখাইন জনগোষ্ঠীকেও ব্যবহার করা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের যেসব জায়গা থেকে উচ্ছেদ করা হয়, সেখানে পুনর্বাসন করা হয় অন্য স্থান থেকে আনা হয় রাখাইনদের। কি কান পিন গ্রামের ঘরহারা এক রোহিঙ্গা আলজাজিরাকে বলেন, ‘সেনাবাহিনী গ্রামে হামলা করার পর রাখাইন প্রতিবেশীরাই আমাকে এবং আমার পরিবারকে নিজবাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। তারা জানান, আমরা সেখান থেকে চলে না গেলে আমাদের হত্যা করা হবে।’
সীমান্তে ভিড় করছে রোহিঙ্গারা : রোহিঙ্গারা হত্যা-নির্যাতনের মুখে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থান নিচ্ছেন। বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করে তাদের কেউ কেউ আটক হয়ে পুশব্যাকের শিকার হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, রাখাইন প্রদেশ থেকে পালিয়ে আসা অন্তত ২০০ রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তে আটকা পড়েছে। গত মঙ্গলবার টেকনাফের নাফ নদী দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টাকালে মিয়ানমারের ৮৬ জন রোহিঙ্গা নাগরিককে আটক করে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি। আটকের পর তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়। এদের মধ্যে ২৫ জন শিশু, ৪০ জন নারী ও ২১ জন পুরুষ রয়েছেন। তারা যে দু’টি নৌকায় করে এসেছিলেন তাও জব্দ করা হয়। টেকনাফ ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর আবু রাসেল ছিদ্দিকী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, মিয়ানমারের নাগরিকরা মঙ্গলবার নাফ নদীর সীমান্ত অতিক্রম করে টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের নয়াপাড়া ও ওয়াব্রাং এলাকা দিয়ে নৌকাযোগে অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেন। যে ৮৬ জন মিয়ানমারের নাগরিককে আটক করে ফেরৎ পাঠানো হয় তারা সবাই মিয়ানমারের আকিয়াবের খৈয়ারচর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি আরো জানান, সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি সতর্ক রয়েছে। তবে যারা অনুপ্রবেশ করেছিল তাদের প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা দিয়ে ফেরত পঠানো হয়।
কোথাও ঠাঁই নেই : আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২০০ জন রোহিঙ্গা রাখাইন প্রদেশ থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশ সীমান্তে আটকা পড়েছে। তাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। তারা বলছেন, তারা নিরাপদে বাঁচার একখণ্ড জায়গা চান। এদিকে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান এবং হেলিকপ্টার গানশিপ থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের গ্রামে গুলিবর্ষণ করার ঘটনা স্বীকার করেছে। সেখানকার মানুষজন নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাচ্ছে। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের তাদের দেশের নাগরিক বলেই স্বীকার করে না। বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নূর খান বলেন, মিয়ানমারের ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব আছে। কিন্তু আমরাও নির্যাতিত মানুষকে ফিরিয়ে দিতে পারি না। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের উচিত হবে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেয়া এবং একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে মিয়ানমার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কথা বলা। বাংলাদেশের রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিচার্স ইউনিট’র গবেষক রেজাউর রহমান লেনিন ডয়চে ভেলেকে বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের ব্যবসা বাণিজ্য এবং যোগাযোগ বাড়ছে, তারপরও বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশকে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কথা বলতে হবে। এদিকে গত তিন দিন ধরে নাফ নদী দিয়ে নৌকা ভরে বাংলাদেশে আশ্রয়ের জন্য আসা শত শত রোহিঙ্গাকে ‘পুশব্যাক’ করার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যম দিলেও, টেকনাফে বিজিবির একজন কর্মকর্তা একদিন আগেই বিবিসির কাছে ‘কিছু কিছু অনুপ্রবেশের চেষ্টা প্রতিহত’ করার কথা স্বীকার করেন। কিন্তু সেটা কী পরিমাণ, তাদের সংখ্যা কত- তা স্পষ্ট নয়।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার একজন কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সাথে যে সীমান্ত আছে তার পুরোটা বন্ধ করে রাখার মত জনবল বাংলাদেশের নেই। ফলে প্রাণভয়ে ভীত বহু সংখ্যক রোহিঙ্গাই বাংলাদেশে ঢুকতে পারছে এবং তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যককে এই সংস্থাটি দেখভাল করছে বলেও উল্লেখ করছিলেন ওই কর্মকর্তা। তবে প্রাণ বাঁচাতে রাখাইন থেকে পালিয়ে আসাদের বেশীরভাগই বাংলাদেশে ঢুকতে ব্যর্থ হচ্ছে, যাদের সংখ্যা হাজার হাজারও হতে পারে, বলছিলেন টেকনাফের একজন ব্যবসায়ী দিদার হোসেন। এদিকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, রাখাইনে সেনাবাহিনীর ’হত্যাযজ্ঞ’ এবং বহু রোহিঙ্গার বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান। তার নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কমিশন এখন মিয়ানমারে আছে। দলটির আজ সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি গ্রামে যাবার কথা রয়েছে। বাংলাদেশের এমন একজন পদস্থ কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, সেনাবাহিনী ওখানে ’নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ’ চালাচ্ছে। কোন সাহায্যকারী সংস্থাকে ত্রাণ নিয়ে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না বলেও উল্লেখ করেন ওই কর্মকর্তা। এ নিয়ে একেবারেই মুখ খুলছে না বাংলাদেশের সরকার। তবে বাংলাদেশ এসব নির্যাতিত রোহিঙ্গাকে আগে আশ্রয় দিয়েছে। কক্সবাজারের তিনটি রিফিউজি ক্যাম্পে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ৩৩ হাজার। তবে অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা তিন লাখেরও বেশি হতে পারে।
নদীতে ভাসছে রোহিঙ্গাদের মরদেহ : মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের রাখাইন প্রদেশের চার রোহিঙ্গা টেলিফোনে বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে বলেন, শত শত মানুষ পালানোর চেষ্টা করছেন এবং নদী পাড়ি দিয়ে তারা বাংলাদেশের দিকে যাচ্ছেন। এদের অনেককেই ওপাড় (মিয়ানমার) থেকে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক রোহিঙ্গা নেতা বলেছেন, নদীর তীরে অন্তত ৭২ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা তাকে জানিয়েছেন। গুলি চালিয়ে হত্যার পর সেনাবাহিনী এসব রোহিঙ্গার মরদেহ নদীর তীরে ফেলছেন। অপর এক রোহিঙ্গা নেতা বলেন, নদীতে অনেক রোহিঙ্গার মরদেহ ভাসছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও মানবাধিকার কর্মীরা দেশটির নিরাপত্তাবাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ ও রোহিঙ্গাদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ এনেছেন। একই সঙ্গে তারা এ ঘটনায় নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে দেশটির সরকার এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায় নি। এদিকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা এবং তাদের পুশব্যাক করা নিয়ে মানবাধিকার কর্মীদের নানা অভিযোগ আর উদ্বেগ প্রসঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, মানবিক দিক কেন শুধু বাংলাদেশ দেখবে। মিয়ানমারের কি কোন দায়িত্ব নেই? তাদেরকে কেন কেউ বলছে না?

-আলজাজিরা ও বিবিসি।

মতামত...