,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

মৃত্যুর মুখে ভৈরব নদ

বেকার হয়েছে অর্ধলক্ষ জেলে ও কৃষক, অনাবাদি হাজার হাজার হেক্টর জমির চাষাবাদ

aআনোয়ার হোসেন লিখন,যশোর সংবাদদাতা, বিডিনিউজ রিভিউজঃ ভৈরব নদ। দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের প্রধান নদ। এই ভৈরব নদীর তীরে এক সময় আর্য সভ্যতা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। মেহেরপুর, দামুড়হুদা, চুয়াডাঙ্গা, কোটচাঁদপুর, চৌগাছা, বারবাজার, যশোর, বসুন্দিয়া, নওয়াপাড়া, ফুলতলা, দৌলতপুর, খুলনা ও বাগেরহাট এলাকার বুক দিয়ে বয়ে যাওয়া ভৈরব। ভৈরব এক স্বতন্ত্র নদ। ভৈরবের নামে অন্য কোন নদের নাম নেই কোন দেশে। দক্ষিণ বঙ্গের বড় নদীগুলো দক্ষিণ মুখী, কিন্তু ভৈরব দক্ষীনমুখী নয়।
ভৈরব দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অন্যতম প্রধান ও বড় নদ। এ নদ গঙ্গানদী থেকে উৎপন্ন হয়ে বৃহত্তর যশোরের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে খুলনার বালেশ্বর নদীতে পতিত হয়েছে। নদটি মালদহের মধ্য দিয়ে এসে শ্রুতকীর্তি মহানদী যেখানে পদ্মায় পড়েছে তার অপরদিকের নদই ভৈরব নাম ধারণ করে পদ্মার দক্ষিণবাহী শাখা মাথাভাঙ্গার সাথে মিশে। ভৈরব মাথাভাঙ্গা হতে বিচ্যুত হয়ে যশোরে প্রবেশ করে কোটচাঁদপুর এসে দক্ষিণমুখী হয়েছে। ১০ কি. মি. এসে চৌগাছার উত্তরে তাহিরপুর নামক স্থানে ভৈরব দক্ষিণ দিকে কপোতাক্ষ নদের শাখা ত্যাগ করে নিজে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়েছে। কোটচাঁদপুর কালীগঞ্জ, যশোর ও অভয়নগর অংশে এই নদ ভৈরব নাম ধারণ করলেও খুলনা অংশে রূপসা নাম ধারণ করেছে এবং বঙ্গোপসাগরে মিলিত হবার আগে এর নাম হয়েছে শিবসা। ২৪৯ কিলোমিটার ভৈরব নদের অধিকাংশ স্থানই মৃতপ্রায়। স্থানভেদে ভৈরব নদীর প্রশস্ততা কোথাও এক থেকে দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তবে বর্তমানে তা মাত্র ২০/২৫ ফুট। বৃহত্তর যশোরের প্রধান নদী হিসাবে এককালে নাম থাকলে এখন পরিণত হয়েছে ভাগাড়ে।
জানা যায়, তৎকালীন বৃটিশ সরকার ১৮৭২ সালে ভৈরব নদীর উৎস মুখ তাহিরপুরে চিনির কল নির্মাণ করে বর্জ্য ফেলত। ভৈরবের উৎসমুখে বাঁধ নির্মাণের ফলে ভৈরব ক্রমে একটি মরানদীতে পরিণত হয়। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে তাহিরপুর থেকে যশোর শহর পর্যন্ত নদীতে পলি জমে মুখ বন্ধ হতে থাকে। ভৈরব নদের দৈর্ঘ প্রায় ২৪৯ কিলোমিটার তার মধ্যে যশোর অংশের ২৫ কিলোমিটার এলাকা মরে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভৈরবকে মানুষ ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করছে। ১৯৭১ সালের পর থেকে অবৈধভাবে নদ দখল, স্থানীয় সরকার অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বিভিন্ন সময়ে ভৈরব নদে অপরিকল্পিতভাবে ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণের ফলে নদীর নাব্যতা হ্রাস পায়। বেকার হয়ে পড়ে যশোরের নওদাগা, নীলগঞ্জ, তাঁতী পাড়া, ঝুমঝুমপুর, বারান্দিপাড়া, ডাকাতিয়া, চুড়ামনকাটি, সাতমাইল ও হৈবতপুরসহ প্রায় ১০০টি গ্রামের ৫০ হাজারেরও বেশী জেলে পরিবার। ১৯৯৫ সালের দিকে সরকার ভৈরব নদের ওপর নির্মিত সবগুলো বেড়ি বাঁধ উচ্ছেদ ও হাইব্রিড মাছ চাষ বন্ধ করে দেয়। নদের ১৫০ কিলোমিটার ড্রেজিং এর জন্য ১৫ কোটি টাকার খসড়া প্রকল্প তৈরি করে জেলা প্রশাসন। যা এখন ফাইলেই বস্তাবন্ধি।
প্রলয়ংকারী এই নদের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। দীর্ঘদিন সংস্কার বা পুনঃখনন না করায় ঐতিহ্যবাহী ভৈরব তার স্বকীয়তা হারিয়ে পরিণত হয়েছে শহর ও শহরতলীর মানুষের ভাগাড়ে। নাব্যতাহীন বন্ধ্যা ভৈরব সর্পিল আকারে প্রবাহিত। কিছু অসাধু জমি দখলের প্রতিযোগিতায়নেমেছে। ভৈরবের বুকে পানিবিহীন অংশে ঘর-বাড়ি তৈরি করে বসতি স্থাপন করেছে। বিশেষ করে যশোর শহর এলাকার ভরাট অংশে স্থায়ী পাকা স্থাপনা গড়ে তুলে ভৈরবের প্রবাহকে চিরতরে রুদ্ধ করে দিচ্ছে। এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মহল নদীটির যে অংশে পানি আছে সব অংশে বাঁশ ও বাঁশের পাটা দিয়ে দখল করছে মাছ চাষের জন্য। শিল্পশহর নওয়াপাড়ায় নদীর তীরবর্তী সরকারী খাসজমি দখল করে পণ্যের গুদাম, ঘাট, আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। এই তীরে প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৩টি সিমেন্ট ফ্যাক্টরি।
নদের এই করুন দশার কারণে ৫০ হাজার জেলে পরিবার বেকার হয়ে গেছে। ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বছরে ৪৪ হাজার মেট্রিক টনের বেশি খাদ্যশস্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। এসব কারণে ভৈরব পুনঃখননের জন্য দাবি তোলা হয়। ভৈরবের বুকে এখন আর নৌকা চলে না কচুরিপানায় ভরে গেছে এ নদ। পৌর এলাকায় ভৈরব নদের ৫৪৬ ও ৩২২ দাগে মোট ১৫ একর জমি আছে। এর মধ্যে বেদখল হয়েছে পৌনে ৪ একর।
এলাকাবাসী জানান, গত সরকারের আমলে ইজারা বাতিল করে নদী সংস্কারের জন্য ৮৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হয়। এর আওতায় ছিল বসুন্দিয়া থেকে রাজারহাট পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার ড্রেজার দিয়ে খনন, রাজারহাট থেকে কালিগঞ্জের তাহিরপুর পর্যন্ত ৭৮.৫ কিলোমিটার শ্রমিক দিয়ে খনন, ৫০ কিলোমিটার খাল খনন, ২০টি ব্রিজ নির্মাণ ও পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণ। আলোর মুখ দেখেনি এখন পর্যন্ত সেসব প্রকল্প। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৈরব নদকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার খনন করলে আবার যৌবন ফিরে পাবে এবং সেটা করা হলে যশোরের চেহারা পাল্টে যাবে।

মতামত...