,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

রাউজানের ‘আশীষের পেরা’র কদর দেশ-বিদেশে

এম বেলাল উদ্দিন ,রাউজান,৬ ফেব্রুয়ারী বিডিনিউজ রিভিউজ.কম::  মিষ্টি জাতীয় খাবারে বাঙ্গালীর রয়েছে বেশ ঐতিহ্য। খাবার শেষ একটু মিষ্টি খেয়ে অনেকেই খাবারে পরিপূর্ণতা পান। মিষ্টির নানা ধরণ এবং রূপ আমাদের দেশে ভরপুর রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম দুধের তৈরি ‘পেরা’।
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয় এই পেরা। তবে উপজেলার ফকিরহাট হাটের আশীষের পেরা খ্যতি রয়েছে দেশ-বিদেশ জুড়ে। থানা রোড সংলগ্ন একটি ঝুপড়ি ঘরে তৈরি করা হয় খাঁটি দুধের সুস্বাদু এই মিষ্টান্নের পেরা। এবং সেখান থেকে বিক্রিও করা হয়।
উপজেলা সদরের পালিত পাড়ার কালি পদের পুত্র আশীষ পদ (৪২) এই ঝুপড়ি দোকান ঘরে নেত্রকোনার সুজিত (২৬) নামের এক সহকারীকে নিয়ে তৈরিকৃত পেরা, মাখন ও ঘি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
সাম্প্রতি ঐ ঝুপড়ি দোকানে পেরা তৈরিকালে আশীষের সাথে দৈনিক সংবাদের প্রতিনিধির কথা হয়। আশীষ জানান, ১৯৮৬ সাল থেকে শৈশব বয়সে সে তার বাবার সাথে এই পেশায় পদার্পন করেন। ১৯৯২ সাথে রাউজান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাশ করা পর পুরোধমে এই পেশায় নিয়োজিত হন। মিষ্টান্ন দ্রব্য তৈরি করা পেশাটি তার বাপ-দাদার পারিবারিক পেশা। এই স্থানে তার জেঠা তেজন্দ্র পদ প্রায় অর্ধশত বছরেরও অধিক সময় পূর্ব থেকে এই ব্যবসা শুরু করেন। তার জেঠার হাত ধরে তার বাবা কালি পদ পরবর্তী তার বড় ভাই শিবু পদ এই ব্যবসা পরিচালনা করেন। তৎসময়ে শিবুর পেরা বলে যথেষ্ঠ খ্যাতি ছিল। তার বড় ভাই শিবুর মৃত্যুর এই ব্যবসায়ের হাল ধরেন আশীষ নিজে।
আশিষ জানান, নিজের হাতে দোহন করে নিয়ে আসা গরুর খাঁটি দুধ আর চিনি দিয়ে তৈরি হয় এই পেরা। একটি পাত্রে দুধ আর চিনি মিশ্রণ করে চুলার আগুণে তাপ দিয়ে আটালো করা হয়। এই আটালো উপকরণ হতে তৈরি করা হয় সুস্বাদু পেরা। সে প্রতিদিন দশ থেকে বার কেজি পেরা তৈরি ও বিক্রি করেন। প্রতি কেজি পেরা দাম ৩০০ টাকা। প্রতি কেজি ওজনে ৬০ থেকে ৬৫ টি পেরা হয়। খুচরাও বিক্রি হয় অহরহ। খুচরা প্রতিটি পেরার দাম ৫ টাকা। সে যখন এই এসেছিল তখন প্রতিকেজি পেরার দাম ছিল ৩০ টাকা। সে আরো জানান, তার পেরা রাউজান ছাড়াও পার্শ্ববর্তী উপজেলার ফটিকছড়ি, হাটহাজারি ও রাঙ্গুনিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে মিষ্টির দোকানে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় অগ্রিম অর্ডার হয়ে যায়।অনেক সময় চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা যায় না।তার পেরার ব্যাপক চাহিদা থাকলেও পুঁজি, লোকবল ও সময়ের অভাবে তা পুরান করা সম্ভবপর হয়ে উঠে না।
স্থানীয় বিভিন্ন লোকজন ও পাশ্ববর্তী দোকানদারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিয়ে-শাদী, পুঁজা-পার্বন সহ নানা অনুষ্টানের এই পেরার কদর সবচেয়ে বেশি। প্রায় সময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বেড়াতে আসা লোকজন ও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে চাকুরিরত বিভিন্ন জেলার লোকজন বাড়ি ফেরারকালে এখানে এসে পেরা নিয়ে যায়। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য, মালয়শিয়া, ইউরোপসহ দেশের বাইরে অবস্থানরত প্রবাসীদের স্বজনরা এখান থেকে পেরা নিয়ে বিদেশে প্রেরণ করেন।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আশীদের দোকানে আসে মলি¬কা দে (৩৫) মহিলা দুই কেজি পেরা অর্ডার দিয়ে বলেন, ভালো করে তৈরি করুন, বিদেশে চালানি (প্রেরণ) দিব। তার কাছে জানতে চাইলে মহিলাটি বলেন, তার স্বামী ওমানে থাকে। তিনি বলেছেন আশীষ দা’র পেরার কথা। তাই স্বামীর কাছে পাঠানো জন্য পেরা নিতে এসেছি।
পেরা ছাড়াও আশীষ, মাখন আর ঘি তৈরি করেন। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর তার মাখন খাওয়ার জন্য যুবক ও মধ্য বয়সীরা লাইন ধরেন। তিনি কলা পাতা করে মাখন পরিবেশন করেন। প্রতিটি পিচ মাখনের জন্য ১০ টাকা করে নেন। দৈনিক ১ কেজি করে মাখন বিক্রি হয় তার। সে জানাই প্রতি কেজি মাখনের দাম ১৫০০ টাকা আর ঘিয়ের দাম ১৬০০ টাকা। তবে পেরা তৈরির পর বেচে যাওয়া অবশিষ্ট দুধ দিয়ে মাখন আর ঘি তৈরি করেন বলে জানান আশীষ। পেরা বিক্রি করে স্ত্রী,ছেলে,মেয়ে ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে স্বাচ্ছন্দে চলে আশীষের সংসার। তবে এই খ্যাত পেরা তৈরির ঝুপড়ি দোকানটির ভবিষৎ অনিশ্চিত। পুজিঁ ও লোকবলের অভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে এই এই সুস্বাদু পেরা তৈরির দোকান। তবে সরকারী বা বেসরকারী উদ্যোগে যথাযত পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসলে প্রতিষ্ঠানটির স্থায়িত্ব ও দেশ ব্যাপী প্রসারতা বাড়ানো সম্ভব। সে সাথে হবে অনেকের কর্মসংস্থানও।

মতামত...