,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

রাউজানে ভন্ড ফকিরের প্রতারণা ফাঁস

রাউজান সংবাদদাতা, ২২ সেপ্টেম্বর, বিডিনিউজ রিভিউজ.কম::নিজের নাড়িভুঁড়ি কেটে বের করার পর তা পুুকুরে পরিষ্কার (ধুয়ে) করে আবার পেটের ভেতর ঢুকিয়েছে-হঠাৎ এমন অলৌকিক কথা প্রচার হওয়ার পর ওই আধ্যত্মিক ফকিরের দোয়া ও পানিপড়া নিতে হাজার হাজার নারী পুরুষ জমায়েত হয়েছিল। তাকে কেউ দিচ্ছিল টাকা, কেউ দিচ্ছিল তাকে ঘিরে সিজদা। ভক্তদের ভিড়ের মধ্যে বসে সেই আজব ফকির টানছিল হুক্কা (ধূমপান)। কেউ তাকে হাতপাকা দিয়ে বাতাস দিচ্ছিল গায়ে। আবার কেউ সেবা-যত্ন করছিল তার।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে এমন এক উদ্ভট ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্নভাবে ছড়িয়ে পড়ে রাউজানের সর্বত্র। জনমনে সৃষ্টি হয় ব্যাপক চাঞ্চল্য। এনিয়ে হৈচৈ পড়ে যায় এলাকায়। তবে সাজানো নাটক করে বড় ফকির সাজতে গিয়ে বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারেনি রাউজানের এই ভন্ড ফকির। শেষ পর্যন্ত থানা পুলিশ তাকে আটক করেছে। বুধবার দিবাগত রাত ৩টা থেকে বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের ঊনসত্তরপাড়া গ্রামের শাহাদুল্লাহ কাজী বাড়িতে। এই ঘটনায় এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। আটক ভন্ড ফকিরের নাম সৈয়দ মো. ছোটন প্রকাশ শাহ (২২)। সে উপজেলা কদলপুর ইউনিয়নের আবু শাহ ফকির বাড়ির মো. শফির ছেলে।

রাউজান থানার সেকেন্ড অফিসার মো. নুরুন্নবী, পুলিশের এস.আই মুরাদ জানান, ছোটন বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে পাহাড়তলী ইউনিয়নের ঊনসত্তপাড়া গ্রামের শাহদুল্লাহ পাড়া এলাকার বশির মোহাম্মদ শাহ (র.) মাজারের পুকুরে নেমে তার নাড়িভুঁড়ি বের করে পরিষ্কার করে (ধুয়ে) তা আবার পেটের মধ্যে ঢুকায়। বিষয়টি নাকি স্থানীয় বশির মোহাম্মদ শাহ (র.) মসজিদের মুয়াজ্জিম আবদুস ছালামসহ তার কয়েকজন ভক্ত দেখেছে। এরপর তাকে ধরাধরি করে তারা পার্শ্ববর্তী হযরত আশরাফ শাহ (র.)’র আস্তানায় নিয়ে যায়। এমন খবরটি ওই মসজিদের মুয়াজ্জিম আবদুস ছালাসহ কয়েকজন কথিত ভক্তের মাধ্যমে সকাল হতেই মোবাইলসহ নানাভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ওই আস্তানায় হাজার হাজার নারী পুরুষ ভিড় করে। বড় আধ্যত্মিক আউলিয়া ভেবে নানা মানত করে কেউ কেউ থালায় টাকা পয়সাও দিচ্ছিলেন। খবর পেয়ে পাশ্ববর্তী চুয়েট ফাঁড়ির পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে উৎসুক মানুষের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেয়ে থানার ওসি কেপায়েত উল্লাহ কে খবর দেন।

এসআই মুরাদ বলেন, ‘বেলা ১১টায় সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখি বিপুল সংখ্যক মানুষ ওই ছোটনকে ঘিরে বসে আছে। তাকে দেখতে ৮-১০ হাজার মানুষ ওই এলাকায় ভিড় করে। ওই সময় ছোটনের পেটে একটি বড় ব্যান্ডেজ বাধা অবস্থায় ছিল। এরপর তাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসতে চাইলে তার কয়েকজন ভক্ত তাকে থানায় আনতে বাধা দেয়। একপর্যায়ে ছোটনসহ দুই ভক্তকে নিয়ে আসি। বেলা ১২টায় ছোটনকে শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাই। হাসপাতালে চিকিৎসকরা ছোটনের ব্যান্ডেজ খুলে ও শারীরিক পরীক্ষা করে কোন ক্ষত চিহ্ন পাননি’।

রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত মেডিকেল অফিসার ডা. সোনম বড়ুয়া বলেন, ‘ছোটনের ব্যান্ডেজ খুলে এবং পরীক্ষা করে তার শরীরে কোন ক্ষত পাইনি। সে স্বাভাবিক রয়েছে। তার শরীরে কোন কাটাছেড়া নেই’।

শাহাদুল্লাহ কাজী বাড়ির গ্রামের বাসিন্দা প্রত্যক্ষদর্শী এসকান্দর বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে হযরত আশরাফ শাহ (র.) আস্তানায় গিয়ে দেখি বিপুল সংখ্যক মানুষের মাঝে ছোটন বসে আছে। ভক্তরা তার নাড়িভুঁড়ি পেট থেকে বের করে দেখাতে বললে সে তার কয়েকজন ভক্ত দিয়ে তার পড়নের গেঞ্জি কাটে। এরপর সে নিজের হাতে পেটের বাম পাশে গামছার ভেতর থেকে (পেটের ভিতর থেকে বের করার ভাণ করে) নাড়িভুঁড়িগুলো বের করে দেখায়। এরপর ওই নাড়িভুঁড়ি তার ভক্তরা আস্তানার পাশে মাটিচাপা দেয়। তবে কেউ কেউ তার পেটে কোন আঘাতের চিহ্ন না থাকায় এ নিয়ে সন্দেহ করেন’।

বশির মোহাম্মদ শাহ (র.) মসজিদের ইমাম মাওলানা আবদুস ছালাম বলেন, এ ঘটনা নিয়ে আমার নামে কিছু অপপ্রচার করা হয়েছে। ছোটনের পেট থেকে নাড়িভুঁড়ি বের হওয়া বা তা পুকুরে পরিষ্কারের ঘটনা আমি দেখিনি। আমি তাকে রাত তিনটার মসজিদের বাইরে শরীরে রক্তমাখা অবস্থায় একটি ছুরি ও সিগারেট হাতে দেখি। তা দেখে আমি মসজিদ থেকে আর বের হইনি।

আটক ভন্ড ফকির ছোটন তার নিজের প্রতারণার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমি অলি না, আমার নাড়িভুঁড়ি মাটি দেয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, কোন কিছুই কবর দেওয়া হয়নি, এমনকি নাড়িভুঁড়িও বের হয়নি’। পেটে ব্যান্ডেজ সম্পর্কে জানান, তার পেটে রক্ত দেখে ভক্তরা কিছু ক্ষতি হবে মনে করে ব্যান্ডেজ করিয়ে দেয়। তাবিক কবজ দেয়া সম্পর্কে ছোটন বলেন, ‘যারা আমার কাছে আসে তাদের চিকিৎসা করি। তাবিজ, পানিপড়া দিইনা। তার মা জয়নাব খাতুন ও বড় ভাই আজগর আলী বলেন, ‘তারা আশরাফ শাহ (র.) সূত্রে আবু শাহ’র বংশধর। ছোটন সেই সূত্রে কেরামতি পেয়েছে। এ কারণে সে দীর্ঘদিন থেকে চিকিৎসা দিয়ে মানুষকে ভালো করছে। জ্বীনের বাতাস লাগলে তার কাছে নিয়ে আসে ভক্তরা।

কদলপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান কমল চক্রবর্তী, স্থানীয় মেম্বার বেলালসহ অনেকে বলেন, ‘বুধবার রাত দু’ টার দিকে কদলপুর সমশেরপাড়া এলাকায় মেয়ে সংক্রান্ত ঘটনায় স্থানীয় কিছু ছেলে তাকে তাড়া করেছিল। সে ঘটনাটিকে ধামাচাপা দিতে ছাগল বা মুরগির নাড়িভুঁড়ি পেটে গামছা দিয়ে বেঁধে অলৌকিক ঘটনার গুজব ছড়ায়’।

আশরাফ শাহ (র.)’র মাজারের খাদেমগণ বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে পাঁচটায় তার বিরুদ্ধে রাউজান থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, ভন্ড ছোটন আশরাফ শাহ’র গায়েবি খেলাফত পেয়েছে বলে প্রচারণা চালিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অপকর্ম করে আসছিল। তারা তার শাস্তির দাবি জানান।

স্থানীয়রা জানায়, ছোটন শাহ কদলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে। পাহাড় থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করে বিক্রি করত। গত পাঁচবছর ধরে অলৌকিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়েছে বলে প্রচার করে নিজের বাড়িতে আস্তানা গড়ে তোলে সর্বরোগের চিকিৎসা করার নামে হাজার হাজার নারী পুরুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিল প্রতিদিন।

থানা পুলিশ জানায়, বড় ফকির সেজে বিপুল টাকা হাতিয়ে নিতে ছোটন এই মিথ্যা অলৌকিক ঘটনা সাজায় এবং ভক্তদের মাঝে তা ছড়িয়ে এলাকায় প্রতারণা করছে ভন্ড ছোটন। তার বিরুদ্ধে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নিবে।

এলাকার লোকজন জানান, গত প্রায় ৫ বছর ধরে ছোটন ভন্ড ফকির সেজে এলাকায় একটি মাস্তান বাহিনী গঠন করে তার অপকর্ম ও সরল নিরীহ জনগণকে প্রতারণা করে অনেক অর্থ লুটে নিয়েছে। তারা এসব প্রতারণা বন্ধ ও তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবী জানান।

মতামত...