,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

রাউজান বোটানিক্যাল গার্ডেন রাতের অন্ধকারে আলোর ফোয়ারা

এম বেলাল উদ্দিন, রাউজান,২২ ডিসেম্বর,বিডিনিউজ রিভিউজ.কম:: “বাতাস শুধায়, বলতো কমল তব, রহস্য কী যে, কমল কহিল, আমার মাঝেরে আমি রহস্য নিজে” বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কবিতায় লুকায়িত রহস্য খোঁজার পরস্পরের চেষ্টা। কবি এযুগে বেঁচে থাকলে নোয়াপাড়ার রাজার দিঘীর একাল সেকাল দেখে তার নেপথ্যে কী রহস্য তা জানতে হয়ত অন্যভাবে লিখে রহস্য জট খুলে দিতেন।
প্রাচীন কালে কোনো এক রাজার নামকরণে সৃষ্টি হয়েছিল দক্ষিণ রাউজানের নোয়াপাড়ার রাজার দিঘি। এই দিঘীর পাড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নোয়াপাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ,দক্ষিণ রাউজান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, দৃষ্টিনন্দন বোটানিক্যাল গার্ডেন। সেকালের ঝোপঝাড়পূর্ণ গোটা রাজার দির্ঘী এখন পরিস্কার, পরিছন্ন আর পরিবেশ বান্ধব। কলেজ কর্তৃপক্ষ কলেজটির বুকের ভিতর আগলে রেখে লালন করছে প্রাচীণ ঐতিহ্যের সাক্ষী রাজার দীঘিটিকে। স্বাধীনতাপূর্ব সময়ের অন্ধকারাচ্ছন্ন রাজার দীঘির বিশাল অঙ্গন ঝোপঝাড়পূর্ণ ছিল। এখন এটি রাতের আলোর ফোয়ারা। দীঘির চতুরদিকে বোটানিক্যাল গার্ডেনের রূপ। এখানে শত প্রজাতির ফলজ,বনজ আর ঔষধী গাছের সাথে দৃষ্টিনন্দন ফুলের বাগান। অনুপম সুন্দর্য্যরে এই দীঘির পাড় নোয়াপাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর প্রাণের উচ্ছ্বাস। শিক্ষার্থীদের সারা দিনের কোলাহল আর রাতে আলোর ফোয়ারায় হরেক রকম পতঙ্গের খেলায় যেন এক রহস্য ঘেরা এই রাজার দিঘীর অঙ্গন।
কাপ্তাই সড়ক পথে হালদার ব্রিজ মদুনাঘাট থেকে দুই কিলোমিটার পূর্ব দিকে রাস্তার ডান পাশে বিশাল এলাকা জুড়ে এই রাজার দিঘীর অবস্থান। প্রবীণদের মতে স্বাধীণতা পূর্ব সময়ে এই দীঘির পাড়ের ঝোড় ঝাড়ে বসবাস ছিল ভুত পেতনির। এক সময় রাজার দিঘীর পাড় দিয়ে দিনের বেলায় মানুষ হাঁতেও ভয় পেতো। দীঘির উত্তর পাশের একটি বড় পুকুর পাড়ে রয়েছে একটি শিব মন্দির। এই মন্দিরের বিশেষ দিনের পূজাকে ঘিরে বসতো বিশাল মেলা। স্বীকৃতি ছিল ধনঞ্জয় মহাজনের মেলা হিসাবে। এই মেলাটি পরিণত হতো সকল ধর্মবর্ণের মানুষের মিলন মেলায়। এখনও ওই মন্দিরটি ঠিকে থাকলে মেলা বসে ছোট পরিসরে, তেমন থাকে না কোলাহল।
১৯৬৯ সালের দিকে দীঘির দক্ষিণ পাড়ে ছোট পরিসরে উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ এর কার্যক্রম শুরু হলে রাজার দিঘীর পাড়ের ঝোপঝাড় মুক্ত হয়। এখানে আলোজ্বলতে শুরু করে। এরপর কলেজটি এগুতে থাকে অনেক ঘাত প্রতিঘাতের মাধ্যমে। অর্থনৈতিক সংকটের মাঝে প্রতিষ্ঠাতারা স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের সাহার্য্য সহযোগিতা নিয়ে কলেজটিকে নিয়ে যায় ডিগ্রী কলেজের মর্যদায়। এই পর্যন্ত কলেজটি এগিয়ে দিতে অবদান রেখেছেন সেকালের শিক্ষকরা। যারা সামান্য সম্মানীতে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিয়ে এটি ঠিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেন। প্রতিষ্ঠার পরবর্তী প্রায় দুযুগ ধরে কলেজটির কার্যক্রম চলে অনেকটা খোড়িয়ে খোড়িয়ে দন্যদশার মধ্যদিয়ে। এই অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে বিগত প্রায় দেড় দশক থেকে। রাজার দিঘীর দিকে দৃষ্টি পড়ে রাউজানের সাংসদ এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর। তার হাতের ছোঁয়ায় সেই থেকে রাজার দিঘীর রূপ বদলাতে থাকে প্রতিদিন। দিঘীটি সংস্কারের কাজের সাথে কলেজটির সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন সাংসদ। এই উদ্যোগের অংশ হিসাবে কলেজ সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষা কার্যক্রমে পরিবর্তন আনেন নিজের মত করে। এখানে কলেজের অধ্যক্ষ হিসাবে যোগদান করেন এক সময়ের বঙ্গবন্ধুর আদর্শের উজ্জীবিত রাজনীতিক সরকারি কলেজের প্রাক্তন শিক্ষক অধ্যাপক কফিল উদ্দিন চৌধুরী। নতুন অধ্যক্ষ কলেজে যোগদান করে সাংসদের সব নিদ্দেশনা মেনে কলেজটি সাজানোর উদ্যোগ নেন। স্থানীয় সংশ্লিষ্টদের অনুরোধে গভনিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন সাংসদ ফজলে করিম। এরপর থেকে কলেজ সভাপতি ও অধ্যক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এই কলেজসহ রাজার দিঘীতে আসে অন্যরকম এক পরিবেশ। প্রতি বছর এখানে উন্নয়ন কাজের পরধি বাড়তে থাকে। দিঘীর পূর্ব-দক্ষিণ আর পশ্চিম পাড়ের আংশিক এলাকা জুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় কলেজের দৃষ্টিনন্দন একাধিক ভবন। সামনে রাখা হয় খেলার মাঠ। আর কলেজ এর বুকের ভিতর আগলে রাখা হয় প্রচীণ রাজার দিঘীটি। সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, দিঘীর পাড়ে অবস্থিত এই কলেজ ক্যাম্পাসটির এখন বোটানিক্যাল গার্ডেনের রূপ। ক্যাম্পাসের বিশাল এলাকা জুড়ে লাগানো হয়েছে ফলজ,বনজ আর ঔষধী গাছে চারা। কলেজ কর্তৃপক্ষ এসব গাছের চারা পরিচর্যা করছে অনেকটা মাতৃ স্নেহে। নিয়মিত পরিচর্যায় বেড়ে উঠা এসব গাছ এখন গোটা ক্যাম্পাসকে পরিণত করেছে দৃষ্ঠিনন্দন বোটানিক্যাল গার্ডেনে। শিক্ষার্থীদের কাছে গাছে পরিচিতি তুলে ধরতে গাছে ঝুলানো আছে নামে ষ্টিকার। দিঘীর পূর্বপাড় জুড়ে কলেজ অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের এর কার্যালয়। পাশে রয়েছে প্রশাসনিক দপ্তর ও বিশাল হল রুম। সামনের প্রসস্থ রাস্তা রেখে দিঘীর পাড়ে লাগানো হয়েছে আজ,জাম,লিচু,কাঁঠাল,পেয়ারা, লেবু, আমড়া, পেঁপের মত হরেক রকম ফলজ গাছ। সাথে আছে বনজ শ্রেণির মেহগনি,সেগুন,আকাশমনির চারা। কলেজ এর প্রশাসনিক ভবন,হলরুম ও অধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে লাগানো হয়েছে নানা জাতের ফুল। ফুলের সুবাস আর গাছের ছায়াঘেরা মনোরম পরিবেশে এখানে শিক্ষার্থীরা স্বাচ্ছন্দে ক্লাস শেষে সময় কাটায়। দিঘীর পশ্চিম পাড়ের রাস্তার দুইধারে সারি সারি বৃক্ষ আর লাগানো ফুলের সুবাসের মধ্যদিকে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। পূর্ব পার্শ্বে রাস্তায় একই ধরণে পরিবেশে প্রশাসনিক ভবন ও কলেজ মসজিদে প্রবেশ করা যায়। দিঘীর উত্তর পাড়টি কাপ্তাই সড়কের সাথে সংযুক্ত। এই পাড়ে রয়েছে দক্ষিণ রাউজানের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, পুলিশ ক্যাম্প আর ইউনিয়ন পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয়। এখানে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে আর্ন্তজাতিক মানের একটি রেষ্টহাউস। নামকরণ করা হয়েছে শেখ কামাল কমপে¬ক্স। এটির স্বল্প দুরুত্বে করা হচ্ছে দক্ষিণ রাউজান থানা ভবন। কলেজ অধ্যক্ষ কফিল উদ্দিন চৌধুরী বলেছেন নোয়াপাড়ার এই রাজার দিঘীর প্রাচীণ ঐতিহ্যে নিদর্শন। ইতিমধ্যে রাউজানের অনেক প্রাচীণ দিঘী হারিয়ে গেছে। এখন রাজার দীঘিকে বুকের মাঝে সযতেœ রেখেছি। কলেজ গভর্নিং কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী এমপি’র পরিকল্পনা ও দিক নিদ্দেশনায় দিঘীর পাড়ের গাছের চারা লাগানো হয়েছে। এখানে সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। একাজে অন্যান্যদের মধ্যে সার্বিক সহার্য্য সহযোগিতা দিয়েছেন গভনিং কমিটির সদস্য,শিক্ষক, অভিভাবক, এলাকার শিক্ষানুরাগী ও শিক্ষার্থীরা। সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় নোয়াপাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এই পর্যায়ে এসেছে। এই প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রচীন রাজার দিঘী এখন আর হারাবে না। ঠিকে থাকবে আগামী প্রজন্মের জন্য প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে।

মতামত...