,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর কেন বার বার হিংসাত্মক আক্রমণ ?

নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ রিভিউজ.কম:ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বলেছেন, মানুষের অধিকার আদায়ের একমাত্র শাসন ব্যবস্থা সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এটা বিশ্বস্বীকৃত। এর মাধ্যমেই দেশের জনগণ ভোট প্রদান করে তাদের নেতৃত্ব নির্বাচন করে। এর থেকে জনপ্রিয় শাসনব্যবস্থা আর নেই। তারপরও বার বার এই শাসন ব্যবস্থা ব্যাহত করার চেষ্টা করেছে কেউ কেউ। কোন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সৈন্যরা ব্যারাক থেকে বের হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল? গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁকে দেয়া সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি গ্রহণ করে এসব কথা বলেন।

উপমহাদেশে রাজনৈতিক হত্যার কথা উল্লেখ করে অধ্যাপকদের উদ্দেশে প্রণব মুখার্জি বলেন, এক সময় এই উপমহাদেশে যেসব নেতৃত্ব ছিল তা নিশ্চিহ্ন করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। এই ভূখন্ডে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর বারবার হিংসাত্মক আক্রমণ কেন? এই রাজনৈতিক অস্থিরতা বা নেতৃত্বকে নষ্ট করার পিছনে কোন সামাজকি অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত কাজ করছে তা এই অঞ্চলের মানুষকে জানতে হবে। আর এই বিষয়টি নিয়ে যথাযথ গবেষণা করা দরকার আপনাদের। উপমহাদেশের রাজনৈতিক হত্যাকা-ের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সপরিবারে নিহত হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান। এটি বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি বড় আঘাত। এ রকম আঘাত আমরা ভারতের স্বাধীনতা লাভের কয়েক মাসের মাথায় পেয়েছিলাম ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীকে হারানোর মাধ্যমে। একটা নতুন দেশ সবে স্বাধীনতা পেয়েছে। অসংখ্য সমস্যা, দেশ গড়ার সমস্যা, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সমস্যা, দারিদ্র্য দূর করার সমস্যা, বেকারত্ব দূর করার সমস্যা। সেই সমস্যার সঙ্গে সঙ্গেই একটা জাতিকে তার জন্মলগ্নের মুহূর্তেই প্রায় সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হলো। শুধু বাংলাদেশ নয় ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি আততায়ীর গুলিতে ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধিকে ঘাতক নৃশংস আক্রমণে হত্যা করে। আমেরিকা স্বাধীনতা লাভের বহুবছর পর আব্রাহাম লিংকন নিহত হয়েছিলেন। তৎকালীন ব্রহ্মদেশে (মিয়ানমার) অংসান সু চি’র পিতা জেনারেল অংসানকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। ১৯৬০ সালে শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী প্রেমাদাসা নিহত হন। পাকিস্তানে জিয়াউল হক নিহত হন। জুলফিকার আলী ভুট্টোকে আইন করে ফাঁসি দেওয়া হলো। এই যে বিপুলসংখ্যক রাজনৈতিক হত্যা এর কারণ কী?

বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার বিষয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রটি সবচেয়ে বড় মাইনের চাকুরির জন্য না ছুটে, উপাচার্যকে এসে বলবে আমি গবেষণা করতে চাই। সরকারের দায়িত্ব একজন গবেষককে উপযুক্ত সম্মানি দেওয়া। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা এই পরিবেশটা তৈরি করতে পারবো না, ততক্ষণ পর্যন্ত শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা যাবে না। শিক্ষার্থীদের মোটা মাইনের চাকরি দিয়ে পরিবার উপকৃত হতে পারে কিন্তু সার্বিকভাবে দেশ কতটা উপকৃত হচ্ছে সেদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নজর দিতে হবে। তিনি বাংলা ভাষা ও মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বলেন, পৃথিবীর একটি বৃহৎ জনসংখ্যা এই ভাষায় কথা বলে। পৃথিবীতে খুব বেশি দেশে এমন কোন নজির নেই যে ভাষার জন্য বা সংস্কৃতির জন্য প্রাণ ত্যাগ করছেন। একটি স্বাধীন স্বত্তার মূল ভিত্তিগুলো হচ্ছে ভাষা, সংস্কৃতি, তার ইতিহাস, তার ঐতিহ্য। আর এই সামগ্রিক ও মানবিক পরিপ্রেক্ষিতের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে একটি নতুন জাতি। তারা নয় মাস সংগ্রাম করে বিশ্ব মানচিত্রে একটি স্থান দখল করে নিয়েছে।

বর্তমানে দেশের উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ আগে ইন্টারনেশনাল বোর্ড অফ রিকনস্ট্রাকশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইজউ) তাদের রিপোর্টে বাংলাদেশকে অন্যতম এগিয়ে যাওয়া দেশ বলেছে। যাদের জাতীয় আয় কয়েক বছরে ৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। সামাজিক খাতে অপুষ্টি দূরীকরণ, নারী শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ সম্ভব হয়েছে। এই মাঠিতে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করছি গণতন্ত্রের মাধ্যমে একটি দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।

ডি.লিট ডিগ্রি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি আপনাদের প্রদত্ত এই সম্মান গ্রহণ করে নিজেকে ধন্য মনে করছি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আগামীদিনে তৈরি করবে বিজ্ঞানী, তৈরি করবে অর্থনীতিবিদ, তৈরি করবে সেই মানুষ যে সারা পৃথিবীর মানুষের কথা ভেবে এমন কিছু করবে বা এমন কোনো তত্ত্ব আবিষ্কার করবে যার মাধ্যমে মানব সমাজ উপকৃত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কোন সংকীর্ণ স্থান নয়। সেখানে আবদ্ধ থাকবে না কোন সামাজিক সংকীর্ণতা।

এর আগে দুপুর দুপুর একটায় প্রণব মুখার্জি বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে শহীদ আবদুর রব হলের মাঠে আয়োজিত বিশেষ সমাবর্তনে অংশগ্রহণ করে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী সভাপতিত্বে উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার ধন্যবাদসূচক বক্তব্য রাখেন। এ সময় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

মতামত...