,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

শিক্ষা আইনের খসড়া:কোচিং ও ‘সহায়িকা’র বৈধতা, টিউশন ও ভর্তি ফি নির্ধারিন ও ৩ স্তরের শিক্ষার প্রস্তাব

Govermentদিলরুবা খানম, বিডিনিউজ রিভিউজঃ  দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য সবধরনের কোচিং ও ‘সহায়িকা’ নামে সেই বিতর্কিত নোট-গাইডকে বৈধতা, টিউশন ও ভর্তিসহ সবধরনের ফি সরকার নির্ধারণ ও তিনস্তরের শিক্ষা ব্যবস্থার কথা প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি আইনে রূপ নিলে সবধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসবে।

দীর্ঘ পাঁচ বছর ঘসা-মাজার পর তৈরি ৪৯টি ধারাসংবলিত এই খসড়া থেকে বাদ যায়নি প্রশ্ন ফাঁসের বিধানও।  নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত বা ইচ্ছামতো ফি আদায় করলে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে শিক্ষা আইনের খসড়া চূড়ান্ত করেছে সরকার।

এমনকি ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশকিছু বিষয় প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ‘ও’ লেভেল এবং ‘এ’ লেভেল বা সমপর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা, বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও বাংলাদেশ স্টাডিজ বাধ্যতামূলক করতে হবে। তবে মাদরাসা শিক্ষার ব্যাপারে খসড়ায় কিছু বলা হয়নি। এরআগে গত জুলাইয়ে বিভিন্ন মহলের মতামত নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে খসড়াটি দেওয়া হলেও তা একদিনের মধ্যেই সরিয়ে ফেলা হয়। পরে অবশ্য মতামত নিতে আর খসড়াটি ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়নি। যদিও তখন শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন যে, পরিবর্তন শেষে আবার ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে; কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, বিভিন্নভাবে নেওয়া মতামত খসড়ায় সংযোজন করা হয়েছে। নতুন করে মতামত নেওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে শিক্ষা আইনের খসড়া সম্পর্কে এসব তথ্য জানা গেছে। মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনের জন্য আগামী সপ্তাহে খসড়াটি পাঠানোর কথা রয়েছে।

তবে খসড়ায় কোচিংকে বৈধ করায়, ‘সহায়িকা’ নামে নতুন বই চালু ও প্রশ্ন ফাঁসের বিধান না রাখাসহ খসড়ায় বিভিন্ন দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শিক্ষাবিদরা। তারা এসব বিষয়ে আবার বিবেচনা করার আহ্বান জানান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যামিরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আইন তৈরি করতে বিশেষ কিছু ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিতে হয়। এ জন্য দূরদর্শিতা, গবেষণা-পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ ছাড়া কোনো আইন বাস্তবধর্মী হয় না। অথচ আমাদের দেশে আইন তৈরি হয় সরকারের একক রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনার আলোকে। তাই সেটি বাস্তবধর্মী হয় না।

নোট-গাইড অবৈধ করে সহায়িকা বইকে বৈধ করার বিষয়টি হাস্যকর মন্তব্য করে এই শিক্ষাবিদ বলেন, পাঠ্যপুস্তক থাকলে সহায়িকা বই থাকার কোনো কারণ নেই। বাণিজ্যিক কারণে এমন আইন করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের যদি সহায়িকা বইয়ের ওপর নির্ভর করতে হয় তবে পাঠ্যপুস্তকের দরকার কেন? পাঠ্যপুস্তকের বাইরের বইগুলো নিম্নমানের হয়। সেগুলো পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে সাংঘর্ষিকও। ইউরোপ, আমেরিকা, চীনসহ উন্নত অনেক দেশের মানুষ নোট-গাইড বা সহায়িকা বই কী, তা বোঝেন না। অথচ আমাদের দেশে মানসম্মত শিক্ষার বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও একে বাণিজ্যিক করা হচ্ছে।

কোচিং সেন্টারকে বৈধতা দেওয়ার বিষয়ে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, শিক্ষকদের ক্লাসে পাঠদান করার কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে কোচিং সেন্টারে যাচ্ছে। ক্লাসের শিক্ষক ও কোচিং সেন্টারের শিক্ষক ভিন্ন হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। সরকার সেটি বন্ধ না করে উল্টো কোচিং সেন্টারকে বৈধ করতে চাইছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের দেশে জাতীয় শিক্ষানীতি রয়েছে। তার আলোকে একটি শিক্ষা আইন তৈরির কাজ চলছে। শিক্ষানীতির সঙ্গে কোনো বিষয় সাংঘর্ষিক হয় এমন বিষয় পরিহার করা দরকার। পাঠ্যপুস্তক থাকলে নোট-গাইড বা সহায়িকা বইয়ের দরকার হয় না। তাই সেগুলো বর্জন করা দরকার। এ ছাড়া ক্লাসে শিক্ষকদের মনোযোগী করতে কোচিং সেন্টারকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।

আইনের খসড়া অনুযায়ী, প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তর, নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তর এবং স্নাতক বা তদূর্ধ্বকে উচ্চশিক্ষা স্তর নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃ-গোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রাথমিক স্তরে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি চালু করা হবে। প্রাথমিক স্তরের ভর্তির ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করলে দুই লাখ টাকা জরিমানা বা ছয় মাসের কারাদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত করা হবে।

খসড়ায় আরো বলা হয়েছে, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল ও কিন্ডারগার্টেনসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠানকে সরকারের নিবন্ধন নিতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বেতন ও অন্যান্য ফি শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক অনুমোদন নিতে হবে। অমান্য করলে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা এক বছর কারাদন্ড অথবা উভয়দন্ডে দন্ডিত করা হবে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের জন্য একটি স্থায়ী বেসরকারি শিক্ষক নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে।

জনসংখ্যার ঘনত্ব, ভৌগোলিক অবস্থান ও গুরুত্ব, অনগ্রসরতা, দূরত্ব, প্রতিকূল যোগাযোগ ব্যবস্থা, নদীভাঙন ইত্যাদি বিবেচনা করে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার স্তর পর্যন্ত একীভূত, একত্রীকরণ, স্থানান্তর ও বিলুপ্ত করা যাবে বলেও খসড়ায় বলা হয়েছে। সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যাবে না। আইন ভঙ্গ করলে তিন লাখ টাকা জরিমানা বা ছয় মাসের কারাদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত করা হবে। তবে প্রবাসী বাংলাদেশিরা জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) শিক্ষাক্রম ও সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বাংলাদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে পারবে।

প্রস্তাবিত আইনে কোনো প্রকার নোটবই বা গাইড প্রকাশ করা যাবে না বলা হলেও একই আদলে ‘সহায়িকা’ নামে নতুন বই চালু করার বিধান রাখা হয়েছে। সে সঙ্গে ডিজিটাল শিখন-শেখানো সামগ্রী প্রকাশ করতে পারবে। কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াতে পারবে না। আইনে কোচিং সেন্টার নিষিদ্ধ করা হয়নি; বরং শিক্ষার মানোন্নয়নের সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে কোচিং সেন্টারগুলোয় শিক্ষা (সহায়ক) কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিং করার জন্য নীতিমালা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পেলে কোচিং সেন্টার সরকার বন্ধ করতে পারবে।

খসড়ায় শিশুবান্ধব শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ, শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি, ভর্তি, ধর্ম শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং ১৫ বছর ও তদূর্ধ্বদের বয়স্ক শিক্ষার বিধান রাখা হয়েছে। স্কুলের পাশাপাশি মাদরাসায় অভিন্ন পাঠ্যবই থাকবে। কওমি মাদরাসার শিক্ষার উন্নয়নে সরকার গুরুত্ব দেবে। সকল প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থাপনা কমিটি ও শিক্ষক-অভিভাবক পরিষদ গঠন করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব আয়-ব্যয় ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে। অনিয়ম, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, রাষ্ট্র বা শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে শিক্ষকদের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য ‘স্থায়ী শিক্ষা কমিশন’ গঠন করা হবে। শিক্ষার্থীদের কোনো প্রকার শারীরিক শাস্তি বা মানসিক নির্যাতন করা যাবে না।

খসড়া আইন অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা স্তরের সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বেতন ও অন্যান্য ফি সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হবে। এ জন্য একটি ‘রেগুলেটরি কমিশন’ গঠন করা হবে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মূল্যায়ন অভিন্ন গ্রেডিং পদ্ধতিতে হবে। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনুমোদন নিয়ে দূর শিক্ষণ এবং ই-লার্নিং পদ্ধতিতে কোর্স বা প্রোগ্রাম চালাতে পারবে। ‘অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল’ সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ণয় ও উন্নয়ন করবে।

প্রসঙ্গত, ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’-এর আলোকে ২০১১ সালে ‘শিক্ষা আইন’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিবকে (আইন ও অডিট) আহ্বায়ক করে শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির কয়েকজন সদস্যকে শিক্ষা আইনের খসড়া তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। কমিটি ২০১২ সালে খসড়া তৈরি করে। পরে সংযোজন-বিয়োজন শেষে ২০১৩ সালের ৫ আগস্ট জনমত যাচাইয়ের জন্য আইনের খসড়া মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এ নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা বিতর্ক দেখা দিলে আইনপ্রণয়নের কাজ থমকে থাকে। এ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ও সাবেক এক শিক্ষাসচিব নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। গত বছর খসড়া আইন ফের মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দিয়েও কয়েক দিনের মধ্যে তুলে নেওয়া হয়।

মতামত...