,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

সন্দ্বীপের আকায়েদ যুক্তরাষ্ট্রে ট্যাক্সি চালক থেকে বোমা হামলাকারী!

নিউজ ডেস্ক, বিডিনিউজ রিভিউজ.কম::যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে হামলার ঘটনায় আটক যুবক আকায়েদ উল্লাহর বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে। গত সোমবার স্থানীয় সময় সকালে অফিস যাত্রার সময় অথরিটি বাস টার্মিনালে বিস্ফোরণের পর আহত অবস্থায় তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছে।

জানা যায়, তাঁর বাড়ি সন্দ্বীপ। খবর জানার পর দিনভর আলোচনায় ছিলেন আকায়েদ। সবার মনে প্রশ্ন, কেন, কীভাবে উগ্রপন্থায় জড়ালেন আকায়েদ। ২৭ বছর বয়সী আকায়েদের ডাক নাম সপু। তার বাবার বাড়ি সন্দ্বীপের মুছাপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের হায়াত মোহাম্মদের বাড়ি, প্রকাশ ভুটান তালুকদারের বাড়ি।

মঙ্গলবার ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আকায়েদের বাবার বাড়িতে কোনো বসতঘর নেই। প্রতিবেশী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাধীনতার পর আকায়েদের বাবা মো. ছানাউল্লাহ সপরিবারে ঢাকার হাজারীবাগে চলে যান। তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আকায়েদ মেজ। আকায়েদের মামা তার বড় ভাই আহসান উল্লাহ অপুকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান। আকায়েদের বড় ভাই প্রথমে মা ও বোনদের নিয়ে যান। পরে ২০১১ সালে নিয়ে যান আকায়েদকে। এরপর থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিনে বসবাস করে আসছিলেন।

আকায়েদের জেঠাত ভাই এমদাদ উল্লাহ বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের পর আমার চাচারা ঢাকায় চলে যান। চাচাত ভাই আকায়েদ উল্লাহ সপুর জন্ম হয়েছে ঢাকায়। সে কখনো সন্দ্বীপে আসেনি। বলতে গেলে আমাদের সাথে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। যেহেতু আমাদের চাচাত ভাই, তাই চাইলেও এড়িয়ে যেতে পারি না। যদি আকায়েদ কোনো অপরাধ করে থাকে, তাহলে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। তবে বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়ায় আমরা আতংকে আছি।

স্থানীয় চেয়ারম্যান আবুল খায়ের নাদিম বলেন, যেহেতু সে সন্দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেনি, তাকে সন্দ্বীপের লোক বলে উপস্থাপন করা বোধগম্য নয়।

সার্কেল এএসপি রেজাউর রহমান বলেন, আমি সরেজমিনে আকায়েদের বাড়ি দেখার জন্য সন্দ্বীপ এসেছি। সন্দ্বীপ থানার ওসিকে সঙ্গে নিয়ে তার বাড়ি পরিদর্শন করেছি। এখানে তাদের আত্মীয়–স্বজনদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল না। ঢাকায় তার স্ত্রীসহ পরিবারের লোকজনকে আটক করা হয়েছে।

সন্দ্বীপের সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা বলেন, বিষয়টি সন্দ্বীপবাসীর জন্য দুঃখজনক। কোনো সন্ত্রাসীকে আমরা সমর্থন করতে পারি না। প্রকৃত দোষী হলে তার শাস্তির বিষয়ে প্রশাসন ও সরকারকে সর্বাত্মক সহোযোগিতা করব।

ট্যাক্সি চালক থেকে ‘বোমা হামলাকারী’

বিডিনিউজ জানায়, নিউ ইয়র্ক পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আকায়েদ প্রথমে ট্যাক্সি চালাতেন। পরে একটি আবাসন নির্মাতা কোম্পানির বৈদ্যুতিক মিস্ত্রির চাকরি নেন। ব্রুকলিনের অ্যাপার্টমেন্টে বসে ইন্টারনেট ঘেঁটে তিনি বোমা বানানো শেখেন এবং ইলেক্ট্রিশিয়ানের কাজের সূত্রে কর্মস্থলে বসেই বোমা তৈরি করেন বলে তদন্তকারীদের ধারণা।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমে আসা খবর অনুযায়ী, সোমবার সকালে অফিসগামী যাত্রীদের ব্যস্ততার মধ্যে টাইম স্কয়ার সাবওয়ে স্টেশন থেকে ম্যানহাটনের পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনালে যাওয়ার সংকীর্ণ ভূগর্ভস্থ পথে নিজের শরীরে বাঁধা ওই ‘পাইপ বোমায়’ বিস্ফোরণ ঘটান আকায়েদ। বোমাটি ঠিকমতো বিস্ফোরিত না হওয়ায় প্রাণে বেঁচে গেলেও গুরুতর আহত হন তিনি। তার বিস্ফোরণে আহত হন তিন পুলিশ সদস্য।

দুই বছর আগে নিউ ইয়র্কে মারা যান আকায়েদের বাবা ছানাউল্লাহ। তার এক ভাই, বোন ও মা রয়েছেন নিউ ইয়র্কে। বিস্ফোরণের ঘটনার পর তদন্ত কর্মকর্তারা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।

ওই পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একজন বলেছেন, বাংলাদেশে থাকার সময় ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাংগঠনিক তৎপরতায় জড়িত ছিলেন আকায়েদ। তবে যুক্তরাষ্ট্রে জামায়াত–শিবিরের সমর্থকদের নিয়ে গঠিত সংগঠনগুলোর সঙ্গে আকায়েদকে তেমনভাবে দেখা যায়নি। ব্রুকলিনে বাংলাদেশি অধ্যুষিত চার্চ–ম্যাকডোনাল্ডে সন্দ্বীপ প্রবাসীদের কোনো অনুষ্ঠানেও তার যাতায়াত ছিল না।

আকায়েদকে চিনতেন এমন একজন বলেছেন, বরাবরই নিজের মধ্যে নিবিষ্ট হয়ে থাকতেন ওই তরুণ। মসজিদে গেলেও কারো সঙ্গে তেমন আলাপ করতেন না।

নিউ ইয়র্ক প্রবাসী এক বাংলাদেশি ঠিকাদারের অধীনে ইলেক্ট্রিশিয়ানের কাজ করতেন আকায়েদ। একসময় ট্যাক্সি চালানোর লাইসেন্সও তার ছিল। পেশাগত কারণে আকায়েদের সঙ্গে মেলামেশা ছিল এমন লোকজনও তার আত্মঘাতী হামলা চেষ্টার খবরে অবাক হওয়ার কথা বলেছেন। স্থানীয় এক বাসিন্দার বরাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংবাদমাধ্যম লিখেছে, আকায়েদদের পরিবারকে ইসলামী রীতিনীতি মেনে চলা একটি শান্তশিষ্ট পরিবার হিসেবেই তিনি জানতেন। উগ্রপন্থিদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকতে পারেণ্ডএমন সন্দেহ কখনো তার হয়নি। তবে গত কয়েক মাস আকায়েদের সঙ্গে তার দেখা হয়নি।

আলিন যোগরাজ নামের এক স্কুলশিক্ষক জানান, আসা–যাওয়ার পথে আকায়েদের সঙ্গে তার দেখা হত। রোজার পর আকায়েদদের বাসায় দাওয়াত খেতেও গেছেন তিনি। প্রতিবেশী সবার সঙ্গেই ওই পরিবারের সদ্ভাব ছিল। সোমবারের ঘটনায় তিনিও বিস্মিত হয়েছেন।

নিউ ইয়র্ক সিটি ট্যাক্সি অ্যান্ড লিমোজিন কমিশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ২০১২ সালের মার্চ থেকে ২০১৫ সালের মার্চ পর্যন্ত লিমোজিন বা ব্ল্যাক ক্যাব চালানোর লাইসেন্স ছিল আকায়েদের। পরে তিনি আর তা নবায়ন করেননি।

আকায়েদের চাকরিদাতা সেই বাংলাদেশি ঠিকাদার বর্তমানে দুবাইয়ে আছেন। তার সঙ্গে কথা বলা গেলে হয়ত ওই তরুণের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে।

আহত আকায়েদকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে ম্যানহাটনের বেলভিউ হাসপাতালে। সেখানে তার বক্তব্য থেকে উদ্ধৃত করে নিউ ইয়র্ক পুলিশের কমিশনার জেমস ও’নিল সাংবাদিকদের বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে জেরুজালেমকে স্বীকৃতি দেওয়ায় ক্ষোভ থেকে সে ওই ঘটনা ঘটায়।

বাংলাদেশের পুলিশ প্রধান এ কে এম শহীদুল হককে উদ্ধৃত করে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত সেপ্টেম্বরে সর্বশেষ দেশে এসেছিলেন আকায়েদ। তবে বাংলাদেশে তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো রেকর্ড নেই।

তদন্তের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা রয়টার্সকে বলেছেন, কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে আকায়েদের যোগাযোগের নিশ্চিত কোনো তথ্য তারা এখনো পাননি। তবে তার জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা পুলিশ এখনই নাকচ করছে না।

অক্টোবরে নিউ ইয়র্কের রাস্তায় পথচারীদের ওপর ট্রাক উঠিয়ে আটজন হত্যার ঘটনায় যে উজবেক অভিবাসীকে দায়ী করা হয়। আকায়েদও তার মতো জিহাদি কোনো গোষ্ঠীর প্রভাবে একাকী হামলা চালানোর পথ বেছে নিয়ে থাকতে পারেন বলে মনে করছেন নিউ ইয়র্কের মেয়র অ্যান্ড্রু কুমো। তিনি বলেন, তারা দুজনেই ইন্টারনেট থেকে তথ্য নিয়েছে। আকায়েদ ওইভাবেই বোমা বানানো শিখেছে। তারা বিদেশ থেকে আসেনি, তারা এখানেই বসবাস করত।

মতামত...